প্রিন্ট এর তারিখঃ সেপ্টেম্বর ৩০, ২০২৬, ৩:৫১ পি.এম || প্রকাশের তারিখঃ সেপ্টেম্বর ১২, ২০২৬, ১০:১২ পি.এম

সাইদ হাসান আফরান: ‘মাদককে না বলুন, সুস্থ-সুন্দর জীবন গড়ুন’, ‘সুস্থ দেহ, সুন্দর মন’ এবং ‘মাদকমুক্ত হোক প্রতিটি জীবন’—এই স্লোগানকে সামনে রেখে নারায়ণগঞ্জের ফতুল্লায় জে.আর মাদকাসক্তি নিরাময় কেন্দ্রে রিকভারি বর্ষপূর্তি, কোর্স সমাপনী সনদ বিতরণ ও সম্মাননা অনুষ্ঠান অনুষ্ঠিত হয়েছে।
শনিবার (১২ সেপ্টেম্বর) দুপুরে ফতুল্লার শিবু মার্কেটে অবস্থিত জে.আর মাদকাসক্তি নিরাময় কেন্দ্রে এ অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়। এতে মাদকাসক্তি থেকে চিকিৎসা ও পুনর্বাসনের মাধ্যমে সুস্থ হয়ে স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসা ব্যক্তিদের সাফল্য উদযাপন করা হয়। একই সঙ্গে তাদের নতুন জীবনের পথচলাকে উৎসাহিত করতে বিভিন্ন ক্যাটাগরিতে কোর্স সমাপনী বা গ্র্যাজুয়েশন সনদ ও সম্মাননা স্মারক প্রদান করা হয়।
অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন জে.আর মাদকাসক্তি নিরাময় কেন্দ্রের চেয়ারম্যান মো. মনির হোসেন। সভাপতিত্ব করেন ফারুক আহমেদ কচি। বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন জে.আর মাদকাসক্তি নিরাময় কেন্দ্রের পরিচালক অর্নব আহমেদ, জে.আর ক্যামিকেলের চেয়ারম্যান মো. সেলিম হোসেন এবং জে.আর ইমপ্যাক্টের মো. আসিফুল হোসাইন রাব্বি। অনুষ্ঠান সঞ্চালনা করেন সাব্বির হোসেন। এছাড়াও কেন্দ্রের স্টাফ ও ভলান্টিয়াররা উপস্থিত ছিলেন।
অনুষ্ঠানের শুরুতে মাদকাসক্তি থেকে সুস্থ হয়ে রিকভারি সম্পন্ন করা ব্যক্তিদের সাফল্য তুলে ধরা হয়। পরে তাদের হাতে কোর্স সমাপনী সনদ ও সম্মাননা স্মারক তুলে দেন অতিথিরা। এ সময় রিকভারি সম্পন্ন ব্যক্তিদের নতুন জীবনের পথচলায় শুভকামনা জানানো হয়।
প্রধান অতিথির বক্তব্যে মো. মনির হোসেন বলেন, মাদকাসক্তি একজন মানুষের জীবনকে যেমন ক্ষতিগ্রস্ত করে, তেমনি তার পরিবার ও সামাজিক সম্পর্কেও নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। তবে সঠিক চিকিৎসা, নিয়ম-শৃঙ্খলা, পরিবারের সহযোগিতা এবং নিজের দৃঢ় ইচ্ছাশক্তির মাধ্যমে একজন মানুষ মাদকাসক্তি থেকে ফিরে এসে স্বাভাবিক জীবনে ফিরতে পারেন।
তিনি কেন্দ্রে চিকিৎসাধীন ব্যক্তিদের উদ্দেশে হতাশ না হয়ে ধৈর্য ও আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে চিকিৎসা চালিয়ে যাওয়ার আহ্বান জানান। তিনি বলেন, অতীতের কোনো ভুল একজন মানুষের পুরো জীবনকে নির্ধারণ করে না। মাদক ছেড়ে সুস্থ জীবনে ফেরার সিদ্ধান্তই হতে পারে নতুন জীবনের প্রথম ধাপ। যারা ইতোমধ্যে রিকভারি সম্পন্ন করেছেন, তাদের নিজেদের ভবিষ্যৎ গড়ার পাশাপাশি অন্যদেরও মাদক থেকে দূরে থাকার বিষয়ে সচেতন করার আহ্বান জানান তিনি।
সভাপতির বক্তব্যে ফারুক আহমেদ কচি বলেন, একজন মানুষ মাদকাসক্তি থেকে সুস্থ হয়ে স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসা শুধু তার ব্যক্তিগত অর্জন নয়, এটি তার পরিবার ও সমাজের জন্যও বড় একটি সাফল্য। রিকভারি সম্পন্ন ব্যক্তিদের নতুন জীবন ধরে রাখতে পরিবারের ভালোবাসা, সহযোগিতা ও ইতিবাচক পরিবেশ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
তিনি মাদকমুক্ত সমাজ গঠনে পরিবার, সমাজ ও সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোকে নিজ নিজ জায়গা থেকে দায়িত্বশীল ভূমিকা পালনের আহ্বান জানান।
বিশেষ অতিথির বক্তব্যে অর্নব আহমেদ বলেন, মাদকাসক্ত ব্যক্তিদের চিকিৎসার পাশাপাশি তাদের মানসিকভাবে শক্ত করে তোলা এবং সমাজের মূলধারায় পুনর্বাসন করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। একজন মানুষ যখন মাদককে পরাজিত করে স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসেন, তখন শুধু ওই ব্যক্তিই নয়, তার পরিবারও নতুন করে আশার আলো দেখতে পায়।
তিনি মাদকাসক্ত ব্যক্তিদের অবহেলা বা ঘৃণা না করে প্রয়োজনীয় চিকিৎসা, মানসিক সহায়তা ও পারিবারিক সহযোগিতা দেওয়ার আহ্বান জানান।
অনুষ্ঠানে বক্তারা বলেন, মাদক শুধু একজন ব্যক্তির জীবন নষ্ট করে না, এর নেতিবাচক প্রভাব পড়ে পুরো পরিবার ও সমাজের ওপর। বিশেষ করে তরুণ প্রজন্মকে মাদকের ভয়াবহতা সম্পর্কে সচেতন করতে পরিবার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, সামাজিক সংগঠন ও বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন।
বক্তারা আরও বলেন, মাদকাসক্তি থেকে ফিরে আসা কোনো লজ্জার বিষয় নয়। বরং আসক্তিকে জয় করে সুস্থ জীবনে ফিরে আসা একজন মানুষের সাহস, ধৈর্য ও আত্মবিশ্বাসের পরিচয়। যারা রিকভারি সম্পন্ন করেছেন, তাদের প্রত্যেকেই অন্যদের জন্য অনুপ্রেরণার উদাহরণ হতে পারেন।
রিকভারি সম্পন্ন ব্যক্তিদের উদ্দেশে বক্তারা বলেন, হাতে পাওয়া এই সনদ শুধু একটি কাগজ নয়, এটি তাদের সংগ্রাম, ধৈর্য এবং নতুন করে বাঁচার প্রত্যয়ের স্বীকৃতি। এই অর্জনকে ধরে রেখে জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে ইতিবাচক ভূমিকা রাখতে হবে। অতীতকে পেছনে ফেলে পরিবার, কর্মজীবন ও সমাজের জন্য নিজেকে একজন দায়িত্বশীল মানুষ হিসেবে গড়ে তুলতে হবে।
আয়োজকদের পক্ষ থেকে বলা হয়, একটি মাদকমুক্ত সমাজ গড়ে তুলতে শুধু নিরাময় কেন্দ্রের উদ্যোগ যথেষ্ট নয়। পরিবারকে আরও সচেতন হতে হবে, সন্তানদের সঙ্গে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক গড়ে তুলতে হবে এবং তরুণদের সুস্থ বিনোদন ও ইতিবাচক কর্মকাণ্ডের সঙ্গে যুক্ত রাখতে হবে। একই সঙ্গে মাদকাসক্ত ব্যক্তিদের চিকিৎসা ও পুনর্বাসনের সুযোগ তৈরি করে তাদের সমাজের মূলধারায় ফিরিয়ে আনতে হবে।
অনুষ্ঠানের শেষপর্বে রিকভারি সম্পন্ন ব্যক্তিদের হাতে সনদ ও সম্মাননা স্মারক তুলে দেওয়া হয়। সনদ গ্রহণের সময় তাদের মধ্যে নতুন করে জীবন গড়ার প্রত্যয় দেখা যায়। আয়োজকরা আশা প্রকাশ করেন, চিকিৎসা ও পুনর্বাসনের মাধ্যমে সুস্থ হয়ে ওঠা এসব ব্যক্তি ভবিষ্যতে নিজের জীবনকে সুন্দরভাবে গড়ে তোলার পাশাপাশি অন্যদেরও মাদকমুক্ত জীবনে ফিরতে অনুপ্রাণিত করবেন।
‘মাদক নয়, জীবনকে বেছে নিতে হবে। অতীতকে পেছনে ফেলে আজ থেকেই শুরু হোক নতুন পথচলা’—এই প্রত্যয়ের মধ্য দিয়ে অনুষ্ঠানের সমাপ্তি ঘটে।