ঐতিহ্যের পথ ধরে আগামীর রূপরেখা
দৈনিক মুন্সিগঞ্জের বার্তার বর্ষপূর্তি সংখ্যা
শোভন সারোয়ার
পদ্মা, মেঘনা আর ধলেশ্বরীর জলে ধোয়া প্রাচীন বিক্রমপুরই আজকের মুন্সিগঞ্জ। এই মাটিতে একসময় জ্ঞানের আলো জ্বলেছিল, সংস্কৃতির স্রোত বয়েছিল। অতীশ দীপঙ্কর, জগদীশচন্দ্র বসুর মতো মনীষীর স্মৃতি এই জনপদের গর্ব। কিন্তু সময়ের স্রোতে বিক্রমপুরের অনেক নিদর্শন আজ বিলুপ্তির পথে। এই বর্ষপূর্তির দিনে আমরা শুধু অতীতকে স্মরণ করব না, আগামীর মুন্সিগঞ্জের একটি রূপরেখাও ভাবতে চাই। এর জন্য সাতটি বিষয়কে আমি অগ্রাধিকার দিতে চাই।
প্রথমত, ঐতিহ্য সংরক্ষণ ও পর্যটন। নগর কসবা, নাটেশ্বর বৌদ্ধ মন্দির, অতীশ দীপঙ্করের বাস্তুভিটা এবং প্রায় অর্ধশত ধ্বংসপ্রাপ্ত মঠ-মন্দির আমাদের অমূল্য সম্পদ। এগুলো সংরক্ষণ করে একটি সমন্বিত পর্যটন নেটওয়ার্ক গড়ে তোলা সম্ভব। বিক্রমপুরের কৃতী সন্তান, বিখ্যাত মনীষীদের বাড়িগুলোও যথাযথভাবে সংরক্ষণ করা প্রয়োজন, যাতে নতুন প্রজন্ম তাঁদের জীবন ও কর্মের সঙ্গে পরিচিত হতে পারে। পদ্মা, মেঘনা ও ধলেশ্বরীর এই জনপদে নদীকেন্দ্রিক পর্যটনেরও অপার সম্ভাবনা রয়েছে। নৌভ্রমণ, নদীতীরের রিসোর্ট ও নৌপথে ঐতিহাসিক স্থানগুলোর সংযোগ পর্যটকদের নতুন অভিজ্ঞতা দেবে। নাটেশ্বর বৌদ্ধ বিহারকে কেন্দ্র করে, চীনের সহায়তায়, একে আন্তর্জাতিক মানের বিশ্ব ঐতিহ্যস্থল হিসেবে গড়ে তোলার উদ্যোগও নেওয়া যেতে পারে।
দ্বিতীয়ত, যোগাযোগ। মুন্সিগঞ্জ দেশের মধ্যাঞ্চলে অবস্থিত। যোগাযোগ উন্নত হলে সার্বিক অর্থনীতিতে বড় পরিবর্তন আসবে। মাওয়া থেকে টঙ্গীবাড়ী হয়ে মুন্সিগঞ্জ, শ্রীনগর থেকে মুন্সিগঞ্জ, খিদিরপাড়া থেকে ইছাপুরা হয়ে নিমতলা, হাসাইল থেকে টঙ্গীবাড়ী ও বালুচর হয়ে ঢাকা এবং শেখরনগর হয়ে খারশুর পর্যন্ত সড়কগুলোকে জাতীয় সড়কে উন্নীত করা দরকার। নারায়ণগঞ্জ ও মুন্সিগঞ্জ থেকে সিপাহীপাড়া, বেতকা, ইছাপুরা, শ্রীনগর, দোহার ও নবাবগঞ্জ পর্যন্ত সাবওয়ে রেললাইন নির্মাণের কথাও ভাবা যায়। ঢাকার চাপ কমাতে শ্রীনগরে পদ্মার চরে বিমানবন্দর এবং মাওয়া ও দিঘিরপাড়ে নদীবন্দর হলে পণ্য দ্রুত ও কম খরচে সারাদেশে পৌঁছানো যাবে। মুন্সিগঞ্জ থেকে গজারিয়া পর্যন্ত সংযোগ সেতুও জরুরি।
তৃতীয়ত, কৃষি। আলু আমাদের পরিচয়ের অংশ। মুন্সিগঞ্জের মাটিতে ফলা আলু দেশের চাহিদা মেটানোর পাশাপাশি বিদেশেও যায়। অথচ উন্নত জাত উদ্ভাবন, রোগবালাই দমন ও সংরক্ষণে আমরা এখনো পিছিয়ে। তাই উচ্চতর আলু গবেষণা ইনস্টিটিউট ও পর্যাপ্ত হিমাগার স্থাপন এখন সময়ের দাবি, যাতে ফলনের সময় দাম পড়ে গেলেও কৃষক ক্ষতির মুখে না পড়েন। আড়িয়াল বিলের উর্বর জমির সম্ভাবনা কাজে লাগাতে সেখানে বিশেষ কৃষি উন্নয়ন প্রকল্প নেওয়া প্রয়োজন। মিষ্টি কুমড়া ও রামপালের কলার আঞ্চলিক ও জাতীয় ব্র্যান্ডিং করা গেলে কৃষকের আয় বাড়বে, এই জনপদের পরিচিতিও ছড়াবে। মীরকাদিমের হাসা গরুর ঐতিহ্যবাহী বৈশিষ্ট্য রক্ষা করতে হবে, নইলে এই বিশেষ জাত হারিয়ে যেতে পারে। ইছামতী, ধলেশ্বরী ও পদ্মায় ভাসমান মাছ চাষের সমন্বিত নেটওয়ার্ক গড়ে তুললে নদীই হয়ে উঠবে কর্মসংস্থান ও পুষ্টির নতুন উৎস।
চতুর্থত, শিক্ষা। বিক্রমপুর একসময় জ্ঞানচর্চার তীর্থভূমি ছিল। বজ্রযোগিনীর মাটিতেই জন্মেছিলেন মহাপণ্ডিত অতীশ দীপঙ্কর, আর সুলতানি আমলের নগর কসবা এই জনপদের সমৃদ্ধির সাক্ষী। সেই গৌরব ফিরিয়ে আনতে তিনটি গবেষণাভিত্তিক বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রস্তাব করছি। জগৎবিখ্যাত বিজ্ঞানী জগদীশ চন্দ্র বসুর জন্মস্থান রাঢ়ীখালে তাঁর নামে ‘স্যার জে.সি বোস ইউনিভার্সিটি অব অ্যাপ্লাইড সায়েন্স’ হবে শুধু বিজ্ঞান গবেষণার জন্য, যেখানে স্নাতকোত্তর ও পিএইচডি পর্যায়ে পাঠদান চলবে। অতীশ দীপঙ্করের বাস্তুভিটা বজ্রযোগিনীতে বৌদ্ধ, ইতিহাস, দর্শন ও গবেষণার জন্য গড়ে উঠবে ‘অতীশ দীপঙ্কর ইউনিভার্সিটি অব ফিলসফি’। আর লৌহজংয়ে বিক্রমপুর গবেষণা, ইতিহাস, প্রত্নতত্ত্ব, সাহিত্য ও সৃজনকলাকে অগ্রাধিকার দিয়ে ‘বিক্রমপুর বিশ্ববিদ্যালয়’ প্রতিষ্ঠা করা প্রয়োজন। এতে আমাদের সন্তানেরা নিজের মাটিতেই বিশ্বমানের জ্ঞানচর্চার সুযোগ পাবে।
পঞ্চমত, প্রশাসনিক পুনর্গঠন। সিরাজদিখানের খারশুর থেকে চাইনপাড়া আসতে প্রায় ৩১ কিলোমিটার পথ পাড়ি দিতে হয়, আর বাড়ৈখালীর মানুষকে শ্রীনগর সদরে যেতে অতিক্রম করতে হয় বিশাল আরিয়ল বিল। তাই চিত্রকোট, রাজানগর, শেখরনগর, বাড়ৈখালী ও হাঁশারা ইউনিয়ন নিয়ে একটি নতুন উপজেলা ও থানা গঠনের সম্ভাবনা যাচাই করা যেতে পারে। একইভাবে দুর্গম চরাঞ্চলের জন্য সদরের আধারা, বাংলাবাজার, মহাকালী, শিলই এবং টঙ্গীবাড়ীর দিঘিরপাড়া ও হাসাইল নিয়ে আরেকটি থানা বা উপজেলা গঠন করলে সরকারি সেবা মানুষের আরও কাছে পৌঁছাবে। নগর প্রশাসনেও নতুন ভাবনা দরকার। মুন্সিগঞ্জ ও মীরকাদিম পৌরসভা এবং পঞ্চসার ও রামপালকে নিয়ে মুন্সিগঞ্জ সিটি করপোরেশন গঠন করা যায়। প্রায় অর্ধলক্ষ মানুষের বালুচর ও শ্রীনগরে নতুন পৌরসভা প্রতিষ্ঠাও সময়ের দাবি। কুকুটিয়া ও কোলাপাড়াকে লৌহজংয়ের সঙ্গে এবং কলমাকে টঙ্গীবাড়ীর সঙ্গে যুক্ত করার বিষয়টিও ভাবা দরকার। তবে সব সমস্যার সমাধান সীমানা বদল নয়। পোরাগঙ্গা খালে পর্যাপ্ত সেতু হলে খিদিরপাড়া ও মধ্যপাড়ার দূরত্ব ঘুচবে। সীমানা স্থির কিছু নয়; মানুষের বাস্তবতার সঙ্গে তাকেও বদলাতে হবে।
ষষ্ঠত, অবকাঠামো। আগামীর বাংলাদেশে এগিয়ে থাকতে মুন্সিগঞ্জের অবকাঠামোয় বৈপ্লবিক পরিবর্তন দরকার। পদ্মার তীরঘেঁষা মাওয়ায় গড়ে উঠতে পারে আন্তর্জাতিক মানের স্টেডিয়াম ও অলিম্পিক পার্ক, যেখানে তরুণ প্রতিভারা নিজের জেলাতেই বিকশিত হওয়ার সুযোগ পাবে। সঙ্গে চাই আধুনিক কনভেনশন সেন্টার, বিশ্বমানের জাদুঘর, সাংস্কৃতিক চর্চাকেন্দ্র, পরিবেশবান্ধব পার্ক ও আধুনিক শপিং মল। এসব মিলেই মুন্সিগঞ্জ হয়ে উঠবে বাসযোগ্য, প্রাণবন্ত ও পর্যটকবান্ধব একটি জনপদ।
সপ্তমত, নদী ও দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা। যে নদী আমাদের প্রাণ, সেই নদীই প্রতি বছর কেড়ে নেয় ঘরবাড়ি, ফসলি জমি। পদ্মা, মেঘনা ও ধলেশ্বরীর ভাঙন রোধে স্থায়ী টেকসই বাঁধ নির্মাণ ও নদী খনন নিশ্চিত করতে হবে। পাশাপাশি পদ্মা নদীতে মৎস্য অভয়াশ্রম ও শুশুক অভয়ারণ্য ঘোষণা করা জরুরি, যাতে নদীর জীববৈচিত্র্য রক্ষা পায় এবং দেশি মাছের ভান্ডার আবার সমৃদ্ধ হয়। নদীর ড্রেনেজ ব্যবস্থার উন্নয়নও একই সঙ্গে প্রয়োজন, এতে বন্যা নিয়ন্ত্রণ সহজ হবে, আর পানির স্বাভাবিক প্রবাহ ফিরলে দেশি মাছও বাড়বে। পরিবেশ রক্ষা, নদী দূষণ প্রতিরোধ ও প্রাকৃতিক দুর্যোগ মোকাবেলায় প্রয়োজন একটি সমন্বিত মাস্টারপ্ল্যান।
এই রূপরেখা কেবল কাগজের পরিকল্পনা নয়, এটি আমাদের সম্মিলিত স্বপ্ন। ঐতিহ্য ও আধুনিকতার সমন্বয়ে এ স্বপ্ন বাস্তবায়িত হলে মুন্সিগঞ্জ শুধু দেশের অন্যতম অর্থনৈতিক চালিকাশক্তিই হবে না, শিক্ষা, সংস্কৃতি ও উন্নত জীবনযাত্রার এক অনন্য দৃষ্টান্ত হয়ে উঠবে। লেখক: শিক্ষক ও বিক্রমপুর গবেষক
সম্পাদক - আশরাফ ইকবাল, নির্বাহী সম্পাদক - বর্ষন মোহাম্মদ
© স্বত্ব সংরক্ষিত © ২০২৬ দৈনিক মুন্সিগঞ্জের বার্তা