
দীর্ঘদিনের মনোনয়ন নাটকের অবসান, ত্যাগী নেতৃত্বে নির্ভার বিএনপি
ত্বাইরান আবির
মুন্সিগঞ্জ-২ (লৌহজং-টংগীবাড়ী) আসনের নির্বাচনী রাজনীতিতে নাটকীয় মোড় ঘুরে এখন পুরোপুরি সুবিধাজনক অবস্থানে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)। দুঃসময়ের পরীক্ষিত ত্যাগী নেতা, বিএনপির যুগ্ম মহাসচিব এডভোকেট আব্দুস সালাম আজাদ চূড়ান্তভাবে দলীয় মনোনয়ন পাওয়ায় এই আসনে দলের দীর্ঘদিনের অনিশ্চয়তা, ক্ষোভ ও অন্তর্দ্বন্দ্ব কার্যত প্রশমিত হয়েছে। একইসাথে বিদ্রোহী প্রার্থী না থাকা এবং প্রতিদ্বন্দ্বী দলগুলোর দুর্বল সাংগঠনিক অবস্থান মুন্সিগঞ্জ-২ আসনকে বিএনপির জন্য প্রায় নিশ্চিত জয়ের পথে এগিয়ে দিয়েছে বলে মনে করছেন রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকরা।
এই আসনে এডভোকেট আব্দুস সালাম আজাদের রাজনৈতিক গ্রহণযোগ্যতা বহুদিনের। বিএনপির দুঃসময়ে রাজপথে সক্রিয় থাকা, একাধিক মামলা-মোকদ্দমা সামাল দেওয়া এবং দলীয় কর্মসূচিতে ধারাবাহিক উপস্থিতির কারণে তৃণমূল নেতাকর্মীদের কাছে তিনি একজন ‘ত্যাগী ও পরীক্ষিত’ নেতা হিসেবে পরিচিত। কিন্তু চলমান নির্বাচনে প্রাথমিকভাবে রাজনীতি থেকে ২০২০ সালে বিরতি নেওয়া মিজানুর রহমান সিনহাকে মনোনয়ন দেওয়ার খবরে স্থানীয় বিএনপির নেতাকর্মীদের মধ্যে তীব্র হতাশা ও ক্ষোভের সৃষ্টি হয়।
মনোনয়ন ঘোষণার পরপরই মাঠপর্যায়ে প্রশ্ন উঠতে শুরু করে দীর্ঘদিন রাজনীতির বাইরে থাকা একজন নেতার হাতে কেন এমন গুরুত্বপূর্ণ ও বিএনপি অধ্যুষিত আসনের দায়িত্ব দেওয়া হলো? অনেক ত্যাগী নেতা-কর্মী প্রকাশ্যে মুখ না খুললেও ভেতরে ভেতরে অসন্তোষ জমে ওঠে। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এই অসন্তোষ যদি দীর্ঘস্থায়ী হতো, তাহলে নির্বাচনের মাঠে তার নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারতো, এমনকি বিদ্রোহী প্রার্থীর সম্ভাবনাও উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছিল না।
কিন্তু সেই শঙ্কার অবসান ঘটে হঠাৎ করেই। মিজানুর রহমান সিনহা গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়ায় দলীয় সিদ্ধান্তে পরিবর্তন আসে এবং শেষ পর্যন্ত তার পরিবর্তে চূড়ান্ত মনোনয়ন পান এডভোকেট আব্দুস সালাম আজাদ। এই সিদ্ধান্তকে মুন্সিগঞ্জ-২ আসনের বিএনপি নেতাকর্মীরা দেখছেন দলীয় বাস্তবতা ও ত্যাগের স্বীকৃতি হিসেবে। মনোনয়ন ঘোষণার পরপরই এলাকায় সক্রিয় হয়ে ওঠে দলীয় কাঠামো, শুরু হয় ঘরোয়া বৈঠক, কর্মীসভা ও সাংগঠনিক প্রস্তুতি।
সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ বিষয় হলো- এই আসনে বিএনপির কোনো বিদ্রোহী স্বতন্ত্র প্রার্থী নেই। অতীত নির্বাচনে বিএনপির জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছিল বিদ্রোহী প্রার্থিতা, যা দলীয় ভোট ভাগ করে প্রতিপক্ষকে সুবিধা করে দিয়েছিল। এবার সেই আশঙ্কা না থাকায় দলীয় ভোটব্যাংক অক্ষুণ্ন থাকার সম্ভাবনা অত্যন্ত বেশি। স্থানীয় নেতারা বলছেন, মনোনয়ন ইস্যুতে যে বিভ্রান্তি তৈরি হয়েছিল তা এখন পুরোপুরি কেটে গেছে।
অন্যদিকে, মুন্সিগঞ্জ-২ আসনে প্রতিদ্বন্দ্বী রাজনৈতিক দলগুলোর অবস্থান অত্যন্ত দুর্বল। মাঠপর্যায়ে দৃশ্যমান কোনো শক্ত প্রতিদ্বন্দ্বী নেই। সাংগঠনিক ভিত্তি দুর্বল হওয়া, নেতাকর্মীদের নিষ্ক্রিয়তা এবং জনসম্পৃক্ততার ঘাটতির কারণে অন্যান্য দল এখনো নির্বাচনী উত্তাপ ছড়াতে পারেনি। ফলে এই আসনে কার্যত বিএনপিই একমাত্র প্রভাবশালী রাজনৈতিক শক্তি হিসেবে অবস্থান করছে।
স্থানীয় ভোটার ও রাজনৈতিক সচেতন মহলের মতে, মুন্সিগঞ্জ-২ ঐতিহাসিকভাবেই বিএনপির শক্ত ঘাঁটি হিসেবে পরিচিত। এখানকার ভোটারদের একটি বড় অংশ দলটির সঙ্গে আবেগিক ও রাজনৈতিকভাবে সম্পৃক্ত। বর্তমান রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে সেই সমর্থন আরও সুসংহত হয়েছে বলে মনে করা হচ্ছে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে এডভোকেট আব্দুস সালাম আজাদের ব্যক্তিগত ভাবমূর্তি, তৃণমূলের সঙ্গে তার দীর্ঘদিনের যোগাযোগ এবং কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক।
সবদিক বিবেচনায় মুন্সিগঞ্জ-২ আসনের নির্বাচনী লড়াই এখন অনেকটাই একমুখী হয়ে পড়েছে। বিএনপি ও এর সমর্থকদের মধ্যে বিপুল ভোটের ব্যবধানে জয় পাওয়ার প্রত্যাশা ক্রমেই দৃঢ় হচ্ছে। নির্বাচনের দিন যত ঘনিয়ে আসছে, ততই স্পষ্ট হয়ে উঠছে এবারের নির্বাচনে মুন্সিগঞ্জ-২ আসন বিএনপির জন্য শুধু একটি আসন নয়, বরং একটি শক্ত অবস্থান ও রাজনৈতিক আত্মবিশ্বাসের প্রতীক হিসেবেই বিবেচিত হতে যাচ্ছে।
সম্পাদক - আশরাফ ইকবাল, নির্বাহী সম্পাদক - বর্ষন মোহাম্মদ
© স্বত্ব সংরক্ষিত © ২০২৬ দৈনিক মুন্সিগঞ্জের বার্তা