আজ (২ নভেম্বর, ২০২৫ সাল) ভারতীয় সিনেমার 'বাদশাহ' কিং খান শাহরুখ খানের ৬০তম জন্মদিন। দিল্লির এক সাধারণ মধ্যবিত্ত পরিবার থেকে উঠে এসে কীভাবে তিনি বিশ্বব্যাপী বিনোদন সাম্রাজ্যের একচ্ছত্র অধিপতি হলেন, তার এই পথচলা সত্যিই দুর্দান্ত। আজকের ফিচারে থাকছে এসবেরই কিছু ঝলক।
জন্ম ও প্রাথমিক জীবন- সাধারণ থেকে অসাধারণের শুরু
শাহরুখ খান ১৯৬৫ সালের ২ নভেম্বর নয়াদিল্লিতে জন্মগ্রহণ করেন। তার বাবা মীর তাজ মোহাম্মদ ছিলেন পাঠান বংশীয় এবং মা লতিফ ফাতিমা একজন সরকারি প্রকৌশলীর মেয়ে। ছেলেবেলায় অভিনয় ও নাচের প্রতি তার প্রবল আগ্রহ ছিল।
শিক্ষা জীবন- তিনি দিল্লির হংসরাজ কলেজ থেকে অর্থনীতিতে অনার্স পাস করেন। কৈশোরে তিনি খেলাধুলার দিকে ঝুঁকেছিলেন, কিন্তু পিঠের ব্যথা সেই স্বপ্নকে স্তব্ধ করে দেয়।
ট্র্যাজেডি ও অনুপ্রেরণা- বাবা-মায়ের অকাল প্রয়াণ তাকে আরো দৃঢ়প্রতিজ্ঞ করে তোলে। সামান্য কিছু কাপড় আর মায়ের স্মৃতি নিয়ে তিনি মুম্বাই এসেছিলেন, চোখে ছিল কেবল অভিনেতা হওয়ার স্বপ্ন।
টেলিভিশনে যাত্রা ও বলিউডে অভিষেক
তার অভিনয় জীবনের শুরু হয়েছিল ছোট পর্দায়।
টেলিভিশন ধারাবাহিক- ১৯৮০'র দশকের শেষদিকে রাজ কুমার কাপুর পরিচালিত দূরদর্শন টেলিভিশনের ধারাবাহিক 'ফৌজি'তে একজন সৈনিকের চরিত্রে অভিনয়ের মাধ্যমে তার অভিনয় জীবন শুরু। এরপর 'সার্কাস' ধারাবাহিকে তাকে দেখা যায়।
চলচ্চিত্রে প্রবেশ (১৯৯২)- ১৯৯২ সালে 'দিওয়ানা' চলচ্চিত্রের মাধ্যমে বলিউডে তার পথচলা শুরু হয়, যা তাকে রাতারাতি পরিচিতি এনে দেয় এবং তিনি শ্রেষ্ঠ নবাগত অভিনেতা বিভাগে ফিল্মফেয়ার পুরস্কার জয় করেন।
খলনায়ক থেকে রোম্যান্স কিং
ক্যারিয়ারের শুরুর দিকে শাহরুখ খান খল চরিত্রে অভিনয় করে পরিচিতি লাভ করেন এবং বলিউডের প্রচলিত নায়কের ধারণা ভেঙে দেন।
খলনায়ক হিসেবে চলচ্চিত্র- 'ডর' (১৯৯৩), 'বাজীগর' (১৯৯৩), 'আঞ্জাম' (১৯৯৪), 'বাজীগর' ও 'আঞ্জাম' এর জন্য ফিল্মফেয়ার শ্রেষ্ঠ অভিনেতা ও খলনায়ক পুরস্কার জয় করেন।
রোমান্টিক আইকন (কিং অফ রোমান্স)- 'দিলওয়ালে দুলহানিয়া লে যায়েঙ্গে' (১৯৯৫), 'দিল তো পাগল হ্যায়' (১৯৯৭), 'কুছ কুছ হোতা হ্যায়' (১৯৯৮), 'মোহব্বতে' (২০০০), 'কাভি খুশি কাভি গাম...' (২০০১), 'ডিডিএলজে' তাকে স্থায়ীভাবে রোম্যান্সের রাজা করে তোলে। এই চলচ্চিত্রগুলোর জন্য তিনি বহুবার ফিল্মফেয়ার শ্রেষ্ঠ অভিনেতা পুরস্কার পান।
সমালোচক-প্রশংসিত কাজ- 'দেবদাস' (২০০২), 'স্বদেশ' (২০০৪), 'চাক দে! ইন্ডিয়া' (২০০৭), 'মাই নেম ইজ খান' (২০১০)। 'দেবদাস', 'স্বদেশ', 'চাক দে! ইন্ডিয়া' ও 'মাই নেম ইজ খান' ছবিতে অভিনয় করে তিনি সমালোচকদের প্রশংসা অর্জন করেন এবং আরও একাধিক শ্রেষ্ঠ অভিনেতা পুরস্কার লাভ করেন।
রেকর্ড ভাঙা প্রত্যাবর্তন (২০২৩)- 'পাঠান' ও 'জাওয়ান'। স্বল্প বিরতির পর এই দুটি অ্যাকশনধর্মী চলচ্চিত্র দিয়ে তার প্রত্যাবর্তন বক্স অফিসে বিশাল সাফল্য এনে দেয় এবং তার বয়স কেবল একটি সংখ্যা মাত্র এটা তা ই প্রমাণ করে।
পুরস্কার ও সম্মাননা- বৈশ্বিক তারকা
শাহরুখ খান তার কর্মজীবনে অসংখ্য পুরস্কার ও সম্মাননায় ভূষিত হয়েছেন-
জাতীয় পুরস্কার- ২০০২ সালে ভারত সরকার তাকে পদ্মশ্রী পুরস্কারে ভূষিত করে।
আন্তর্জাতিক সম্মাননা- ফ্রান্স সরকার তাকে অর্দ্রে দে আর্ত এ দে লেত্র এবং লেজিও দনর সম্মাননায় ভূষিত করেছে।
ডক্টরেট- এডিনবরা বিশ্ববিদ্যালয় তাকে সম্মানসূচক ডক্টরেট উপাধি প্রদান করেছে।
ফিল্মফেয়ার- তিনি মোট চৌদ্দটি ফিল্মফেয়ার পুরস্কার অর্জন করেছেন, যার মধ্যে আটটিই শ্রেষ্ঠ অভিনেতার পুরস্কার।
ব্যক্তিগত জীবন ও ব্যবসা উদ্যোগ
পরিবার- তিনি ১৯৯১ সালে গৌরী খানকে বিয়ে করেন। তাদের তিন সন্তান- আরিয়ান খান, সুহানা খান এবং আবরাম খান।
প্রযোজনা সংস্থা- তিনি চলচ্চিত্র প্রযোজনা কোম্পানি রেড চিলিজ এন্টারটেইনমেন্ট এর কো-চেয়ারম্যান।
ক্রীড়া দল- তিনি ইন্ডিয়ান প্রিমিয়ার লীগের দল কলকাতা নাইট রাইডার্স ও ক্যারিবিয়ান প্রিমিয়ার লীগের দল ত্রিনবাগো নাইট রাইডার্সের কো-ওউনার।
মানবহিতৈষী কাজ ও প্রভাব
শাহরুখ খান কেবল একজন অভিনেতা নন, তিনি একজন সমাজসেবক।
নারী ও শিশুর অধিকার- ভারতে নারী ও শিশুদের অধিকার রক্ষার্থে তার নেতৃস্থানীয় ভূমিকার জন্য ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরাম তাকে ২০১৮ সালে ক্রিস্টাল পুরস্কার প্রদান করে।
শিক্ষায় সহায়তা- শিশুদের শিক্ষায় সহায়তার জন্য ইউনেস্কো তাকে পিরামিড কন মার্নি পুরস্কার প্রদান করে।
এসআরকে- তার ক্যারিশমা, জনপ্রিয়তা ও ব্যবসায়িক সফলতার কারণে গণমাধ্যম প্রায়শই তাকে 'এসআরকে' বলে উল্লেখ করে। তিনি এশিয়া ও বিশ্বব্যাপী প্রায় ৪.২ বিলিয়ন ভক্তের অধিকারী এবং ভারতের সবচেয়ে ধনী তারকাদের মধ্যে অন্যতম।
৬০ বছর বয়সেও কেন তিনি 'বাদশাহ'?
শাহরুখ খানের নিজ জীবনই একটি সিনেমার মতো, যেখানে সংগ্রাম, সাফল্য, ব্যর্থতা ও ঘুরে দাঁড়ানোর গল্প মিশে আছে। ৬০ বছর বয়সে এসেও তিনি তার আকর্ষণ, রসবোধ, আর নতুন কিছু করার নিরন্তর প্রচেষ্টা দিয়ে দর্শকদের মুগ্ধ করে চলেছেন। তিনি প্রমাণ করেছেন, সফলতা একজন ভালো শিক্ষক নাও হতে পারে, কিন্তু ব্যর্থতা থেকে উঠে আসার সাহস আর শেখার আগ্রহই একজন মানুষকে কিংবদন্তী করে তোলে।
তার এই জন্মদিনে আমরা শুধু তার দীর্ঘ ও সুস্থ জীবনই কামনা করি না, বরং আশা করি তার এই পথচলা আগামী প্রজন্মের জন্য এক অনুপ্রেরণা হয়ে থাকবে।
লেখক- ত্বাইরান আবির
লেখক, অনুবাদক, সম্পাদক
সম্পাদক - আশরাফ ইকবাল, নির্বাহী সম্পাদক - বর্ষন মোহাম্মদ
© স্বত্ব সংরক্ষিত © ২০২৬ দৈনিক মুন্সিগঞ্জের বার্তা