বিশ্ব রাজনীতি দ্রুত বদলাচ্ছে। অর্থনীতি, প্রযুক্তি, নীতি, ভূ-রাজনৈতিক প্রভাব প্রতিটি ক্ষেত্রে এখন চলছে চরম প্রতিযোগিতা। এ প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে হলে শুধু সম্ভাবনা থাকলেই হবে না, প্রয়োজন শক্ত ভিত্তির উপর দাঁড়ানো সুদৃঢ় রাজনৈতিক কাঠামো। বাংলাদেশ তার ৫৪ বছরের যাত্রায় বহু বাধা অতিক্রম করে এগিয়েছে। কিন্তু আগামী দশকে এটি কি সত্যিই শক্তিশালী, মর্যাদাবান রাষ্ট্রে পরিণত হতে পারবে? এই উত্তর খুঁজতে হলে আগে দেখতে হবে বাংলাদেশের রাজনীতি কোন পথে এগোতে হবে।
১। নেতৃত্বে দূরদর্শিতা ও নীতিগত ধারাবাহিকতা
বাংলাদেশে এক্সপেরিমেন্টাল পলিটিক্সের সময় শেষ। উন্নত নেতৃত্ব মানে শুধু ক্ষমতায় থাকা নয়, বরং জাতিকে দীর্ঘমেয়াদি লক্ষ্যের দিকে পরিচালিত করা। সিঙ্গাপুর, কোরিয়া, মালয়েশিয়ার সাফল্য এসেছে 'পলিসি স্ট্যাবিলিটি' থেকে। বাংলাদেশেও প্রয়োজন-
ক। শিক্ষা, প্রযুক্তি, রপ্তানি, স্বাস্থ্য, প্রশাসন এই পাঁচটি খাতে কমপক্ষে ২০ বছরের নীতিগত ধারাবাহিকতা।
খ। জাতীয় উন্নয়নে রাজনৈতিক সরকারের পরিবর্তনের সঙ্গে নীতির আমূল পরিবর্তন নয়।
গ। দক্ষ, দেশপ্রেমিক ও পেশাদার নেতৃত্ব গড়ে তোলার উদ্যোগ।
জাতির ভবিষ্যৎ নির্ভর করে এমন নেতৃত্বের উপর আমাদের আস্থা রাখতে হবে, যারা দলীয় সংকীর্ণতা ছাড়িয়ে রাষ্ট্রের কথা ভাবতে পারে।
২। সংঘাত নয়, সমঝোতার সংস্কৃতি
বাংলাদেশের রাজনীতির সবচেয়ে বড় সমস্যা প্রতিদ্বন্দ্বীকে শত্রু ভাবা। বিরোধী দলকে দমন নয়, রাষ্ট্র পরিচালনায় গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার হিসেবে দেখতে হবে। অতএব এখানেও জরুরী-
ক। সংসদকে বিতর্ক ও আইনের প্ল্যাটফর্মে পরিণত করা।
খ। বিরোধী মতকে শত্রু নয়, রাষ্ট্রগঠনে সহায়ক মত হিসেবে গ্রহণ।
গ। নির্বাচনকে ক্ষমতা দখলের লড়াই নয়, জনগণের রায়ে ক্ষমতা হস্তান্তরের উৎসব হিসেবে গড়ে তোলা।
সংঘাতের রাজনীতি আমাদের দশকের পর দশক পিছিয়ে দিয়েছে। সমঝোতার রাজনীতি আমাদের সামনে এগিয়ে নেবে।
৩। সুশাসন ও জবাবদিহিতা- উন্নয়নের মূল ভিত্তি
একটি রাষ্ট্র তখনই শক্তিশালী হয় যখন রাষ্ট্রের প্রধান স্তম্ভগুলো (বিচার বিভাগ, নির্বাচন কমিশন, প্রশাসন, দুর্নীতি দমন কমিশন) স্বাধীনভাবে কাজ করতে পারে। বাংলাদেশকে আরও শক্তিশালী করতে হলে দরকার-
ক। দুর্নীতির বিরুদ্ধে রাজনৈতিক সদিচ্ছা ও কঠোর শাস্তির নিশ্চয়তা।
খ। সরকারি কোটি কোটি টাকার প্রকল্পে স্বচ্ছতা।
গ। আইন প্রয়োগকারী সংস্থার রাজনৈতিক নিরপেক্ষতা।
ঘ। গোয়েন্দা সংস্থা ও প্রশাসনের পেশাদারিত্ব।
যেখানে জবাবদিহিতা নেই, সেখানে উন্নয়ন টেকসই হয় না। জবাবদিহিতার রাজনীতি উল্টো সংকটকে সুযোগে পরিণত করে।
৪। যুবশক্তিকে রাজনীতির কেন্দ্রবিন্দুতে আনা
দেশের ৪০% এর বেশি মানুষ তরুণ। তাদের মেধা, উদ্ভাবন, শক্তি এই তিনটি জিনিস রাষ্ট্রের সবচেয়ে বড় সম্পদ। কিন্তু বাস্তবতা হচ্ছে, রাজনীতিতে তরুণদের অংশগ্রহণ এখনও সীমিত।
আগামীর রাজনীতিতে দরকার-
ক। দলীয় কাঠামোর মধ্যে তরুণ নেতৃত্ব তৈরির স্পষ্ট রোডম্যাপ।
খ। স্টুডেন্ট পলিটিক্সে সহিংসতা ও দখলদারিত্বের অবসান।
গ। রাজনৈতিক শিক্ষা, বিতর্ক, নীতি-গবেষণা তরুণদের জন্য উন্মুক্ত করা।
ঘ। ডিজিটাল দক্ষতা রাজনৈতিক প্রশাসনে যুক্ত করা।
যে দেশ তরুণদের ক্ষমতায় আনে, সে দেশ বিশ্বে মাথা উঁচু করে দাঁড়ায়।
৫। প্রযুক্তিনির্ভর স্মার্ট প্রশাসন
২১ শতকের রাজনীতি হলো টেকনোলজি-ড্রিভেন পলিটিক্স। দক্ষিণ কোরিয়া, এস্তোনিয়া, সিঙ্গাপুর দেখিয়েছে ডিজিটাল প্রশাসন দুর্নীতি কমায়, কর্মক্ষমতা বাড়ায় এবং বিশ্বে প্রতিযোগিতা সক্ষম করে। বাংলাদেশকে এগোতে হলে লাগবে-
ক। ই-গভর্নেন্স ও স্বয়ংক্রিয় প্রশাসন।
খ। ডিজিটাল ভোটিং ও ডেটা-ভিত্তিক নীতিনির্ধারণ।
গ। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও সাইবার সিকিউরিটির জাতীয় কাঠামো।
ঘ। শিক্ষায় ও শিল্পে প্রযুক্তি-উদ্ভাবনে উৎসাহ।
এসব শুধু উন্নয়ন নয়, ভবিষ্যৎ প্রজন্মের নিরাপত্তা।
৬। আদর্শিক রাজনীতির পুনর্জন্ম
আজকের রাজনীতি ব্যক্তিকেন্দ্রিক বেশি, আদর্শিক কম। অথচ উন্নত রাষ্ট্র গড়তে হলে দলের প্রয়োজন স্পষ্ট রাজনৈতিক দর্শন। যেখানে থাকবে-
ক। রাষ্ট্রচিন্তা
খ। ন্যায়বিচার
গ। নাগরিক স্বাধীনতা
ঘ। সমান সুযোগ
ঙ। মানবিক মূল্যবোধ
একটি রাষ্ট্র তখনই শক্তিশালী হয় যখন রাজনীতি জনগণের ন্যূনতম চাহিদা নয়, ভবিষ্যতের দৃষ্টিভঙ্গির উপর দাঁড়ায়।
৭। দেশপ্রেম ও সামাজিক সম্প্রীতি- শক্তির ভিত্তি
বাংলাদেশ পৃথিবীর অন্যতম সম্ভাবনাময় দেশ। কিন্তু সাম্প্রদায়িক বিভাজন, সংঘাত, ঘৃণা, অসহিষ্ণুতা কোনো জাতিকে কখনো সামনের দিকে নিতে পারে না। তাই আগামীর রাজনীতির প্রধান লক্ষ্য হতে হবে-
ক। ধর্ম, মত, ভাষা, সংস্কৃতি নির্বিশেষে সমঅধিকার।
খ। ঘৃণার রাজনীতি বাদ দিয়ে ঐক্যের রাজনীতি।
গ। সামাজিক সম্প্রীতির উপর ভিত্তি করে জাতীয় পরিচয় গঠন।
একটি ঐক্যবদ্ধ জাতি বিশ্বে সর্বদাই শক্তিশালী।
পরিশেষে বলতে চাই, শক্তিশালী রাষ্ট্র হওয়ার প্রথম শর্ত হলো শক্তিশালী রাজনীতি, যেখানে নেতৃত্ব সৎ, নীতিগুলো দীর্ঘমেয়াদি, জনগণের স্বাধীনতা সুরক্ষিত, দুর্নীতি নিয়ন্ত্রিত, আর তরুণরা রাষ্ট্রের সম্ভাবনাকে বাস্তবে রূপ দেয়। বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ উজ্জ্বল, যদি আমরা আজ থেকেই এমন রাজনীতি গড়ে তুলতে পারি, যেখানে ক্ষমতা নয়, দেশ বড়। ব্যক্তি নয়, রাষ্ট্র বড়। দল নয়, জনগণ বড়।
এই পরিবর্তন একদিনে সম্ভব নয়। কিন্তু প্রতিটি পদক্ষেপ আমাদের নিয়ে যেতে পারে একটি শক্তিশালী, মর্যাদাবান ও সম্ভাবনায় ভরপুর বাংলাদেশে।
লেখক: ত্বাইরান আবির- অনুবাদক, লেখক, কলামিস্ট।
সম্পাদক - আশরাফ ইকবাল, নির্বাহী সম্পাদক - বর্ষন মোহাম্মদ
© স্বত্ব সংরক্ষিত © ২০২৬ দৈনিক মুন্সিগঞ্জের বার্তা