প্রবহমান খালগুলোর করুণ মৃত্যুর গল্প এখন পুরনো মানুষের মুখে মুখে
বর্ষন মোহাম্মদ:
খালের উপর ছোট্ট নাও, ছোট্ট নাওয়ে পাড়ি দাও। খালের উপর এখন আর নাও বা নৌকা থাকে না। থাকবেই বা কোথা থেকে? খালই তো নেই। ভরাট, দখল আর দূষণে নিঃস্ব হয়ে গেছে জালের মতো ছড়িয়ে থাকা আবহমান গ্রাম-বাংলার সেচকাজে ব্যবহৃত খালগুলো। দখল ও খননের অভাবে খালগুলো এখন। এতে প্রাকৃতিকভাবে প্রবাহমান জলাশয় কমে যাচ্ছে। ভারসাম্যহীন হয়ে পড়ছে পরিবেশ। কৃষি আবাদ ও মাছ উৎপাদন হ্রাস পেয়ে সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে কৃষকরা।
জেলা জুড়ে প্রবহমান খালগুলোর করুণ মৃত্যুর গল্প এখন পুরনো মানুষের মুখে মুখে। যেখানে এখন আর খালের কোনো অস্তিত্ব নেই কিন্তু মন থেকে সরে যায়নি সেই স্মৃতিচিহ্ন।
টঙ্গীবাড়ি উপজেলার শরিষাব গ্রামে কৃষক নাসির উদ্দিন বয়স ৭০ ছুঁয়েছে। বয়সের ভারে চাষাবাদ করার ক্ষমতা অনেকটা হারিয়ে ফেলেছেন। কিন্তু তাতে কী? তাঁর নির্দেশনায় সাত সদস্যের সংসার চলে উৎপাদিত কৃষির আয় থেকে। জীবনের বেশির ভাগ সময় কৃষিকাজের অভিজ্ঞতা তাঁর। তিনি বলেন, ‘পানির অভাবে জমিতে ফসল ফলাইতে পারি না। খালডায় (কাজলরেখা) পানি থাকলে আমার মতো অনেক কৃষক আমনের পর ইরি লাগাইতে পাড়তো। একসময় ওই খালের পানি দিয়া এলাকার কৃষকরা ইরি ধান লাগাইতো। এ্যাহন পানি না থাহনে কেউ ইরি চাষ করত পারে না। এই লইগ্গা খালের পারের অনেক চাষির ধান-চাউলের অভাব পড়ে চৈত্র-বৈশাখ মাসে। পানি লাগে এমন কোনো ফসল এ্যাহন লাগাইন্না যায় না এই খালের পারের জমিতে।’
সরেজমিন পরিদর্শনে জানানা যায় , উপজেলার কাঠাদিয়া আলদী এলাকার বিস্তৃর্ণ ফসলি জমি থেকে পানি নিষ্কাশন ব্যাহত হচ্ছে। বর্ষার পানি জমিতে প্রবেশ করতে পারে না। এতে করে জমি উর্বর শক্তি হারাচ্ছে। কাঠাদিয়া আলদী গ্রামের ফসলি জমির পানি ওই খাল দিয়ে কাজলরেখা নদীতে প্রবাহিত হয়। খাল দিয়ে পানি নিষ্কাশন না হওয়ায় নির্ধারিত সময়ের পরে ওই অঞ্চলের কৃষকদের জমিত ফসল চাষ করতে হচ্ছে। ফলে ফসল উৎপাদন কমে যাওয়ায় ব্যাপক ক্ষতির শিকার হচ্ছেন ওই অঞ্চলের কৃষক। এমনিই গত কয়েক বছর ধরে আলু উৎপাদনে লোকসান গুনে আসছেন কৃষক। তার ওপর চেয়ারম্যানের ব্যবসার কারণে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে ওই অঞ্চলের চাষীরা। এছাড়া একটু ভারী বর্ষণ হলে পয়ঃনিষ্কাশনের অভাবে পানিতে তলিয়ে যেতে পারে কৃষি জমি। এতে ব্যাপক ক্ষতি হতে পারে ওই অঞ্চলের কৃষকদের।
অন্যদিকে, মুন্সীগঞ্জ শহরের পাশ দিয়ে প্রবাহমান ছিল “জুবলী” খাল যা বতর্মানে “জুবলী” রোড হয়েছে। শহর উন্নয়নের জন্য ১৯৮৯ সালে তৎকালীন প্রেসিডেন্ট হোসেইন মোহাম্মদ এরশাদ মুন্সিগঞ্জ শহরে সফরে এসে খাল ভরাট করে সড়ক তৈরির ঘোষণা দেন। এরপর জোট সরকার ক্ষমতায় এসে তা বাস্তবায়ন করে। ২০০৪ সালে শহর উন্নয়নের নামে আরেকটি (ইসলামপুর-মুন্সীরহাট) খালকে ভরাট করা হয় যা এখন দিন দিন দখল হয়ে যাচ্ছে। আর তা দখল করে নিচ্ছে নামে-বেনামে মসজিদ-মাদ্রাসা, মার্কেট, স্কুল নির্মাণের নাম করে। অথচ সরেজমিনে সেখানে এসব কোন প্রতিষ্ঠানই চোখে পরে নাই।
মুন্সিগঞ্জের অতিপ্রাচীন একটি হাট “মুন্সীরহাট” যেখানে এক সময় হাটের মতোই প্রতিদিন বাজার বসত। কারণ সদর উপজেলার পাঁচটি চরের হাজার হাজার মানুষ বাজার-হাটের জন্য এখানে আসতো। আর ওই এলাকার মানুষদের একমাত্র যোগাযোগের বাহন ছিলো নৌকা। কালিদাস সাগর নামের খালটির ধলেশ্বরী থেকে শুরু মুন্সীরহাট হয়ে বাংলাবাজারের পদ্মায় গিয়ে শেষ হতো
এদিকে, জেলার শ্রীনগর উপজেলার একাধিক খাল ভরাট করে ফেলছে সিন্ডিকেট। শ্রীনগর-ষোলঘর রাস্তার দেউলভোগ এলাকার খালের ওপর নির্মিত প্রায় চল্লিশ ফুট দীর্ঘ বেইলী ব্রিজের মুখটি ভরাট করে ফেলছে স্থানীয় প্রভাবশালী সিন্ডিকেট। এরফলে দেউলভোগ, হরপাড়া, ভূইছিদ্র ও ষোলঘর এলাকার প্রায় শতাধিক একর ধানি জমি স্থায়ী ভাবে জলাবদ্ধতার সৃষ্টি হবে। এ জমি থেকে প্রতিবছর প্রায় সাত থেকে আট হাজার মণ বোরো ধান উৎপাদন থেকে বঞ্চিত হয় স্থানীয় কৃষকরা। চরম বিপাকে পড়বে তারা। এ খালটি উপজেলার গোয়ালীমাদ্রা খালের সঙ্গে যুক্ত হয়ে পদ্মায় গিয়ে ঠেকেছে।
স্থানীয় কৃষক আব্দুল খালেক আকন বলেন, ‘খালডা মইরগা যাওনের লইগ্গা আমাগো এলাকায় অ্যাহন আর সেচ দিয়া ইরি বোরো লাগানো হয় না।’
প্রশাসনের একটি সূত্র নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানায়, নদী শাসন করে বাঁধ দেওয়ার ক্ষেত্রে এলাকার মানুষের মূলত কোনো দাবি নেই। প্রভাবশালী নেতারা অর্থ কামানোর ধান্ধায় সব সময় সংশ্লিষ্ট এলাকার মানুষের দোহাই দিয়ে তদবির করে বাঁধের প্রকল্প অনুমোদন করায়। নেতাদের তদবিরে অসহায় থাকে প্রশাসনের কর্মকর্তারা। আর এতেই মরছে একের পর খাল নদী।
এতে একদিকে নদী মরে গিয়ে জলজ প্রাণী বিলুপ্ত হচ্ছে, ফসল উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে, বিভিন্ন এলাকার সঙ্গে নৌপথ বন্ধ হয়ে গেছে, পেশা হারাচ্ছে নদীর ওপর নির্ভরশীল খেটে খাওয়া মানুষ; অন্যদিকে মারাত্মক পরিবেশ বিপর্যয়ের আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।
অন্যদিকে মিরকাদিম পৌরসভার ঐতিহ্যবাহী রিকাবীবাজার খাল। কালের বিবর্তনে নদীটি হারিয়ে ফেলেছে তার চিতরাচরিত রূপ। খালে নেই পানি, নেই কোন স্রোতের তীব্রতা। দখলদারিত্বের আগ্রাসনে খালটি এখন ময়লার ভাগাঢ়ে পরিণত হয়েছে। খালটির পূর্বাংশে কাঠপট্টি এলাকার ধলেশ্বরী নদীর মুখে ভরাট। পশ্চিমাংশে রিকাবাবাজার উচ্চ বিদ্যালয় সংলগ্ন ইছামতি নদীর প্রবেশ মুখে খালটির চিহ্ন আছে কিছুটা। শুধু তাই নয় এই খালের দু”পাশে যাতায়াতের জন্য চারটি ব্রিজ, ৬ টি কাঠের পুল এখনও ব্যবহার করা হচ্ছে। খালে পানি সঞ্চালনের ব্যবস্থা না থাকায় খালটি এখন পরিত্যাক্ত জঙ্গলে পরিণত হয়েছে। রিকাবীবাজারের সকল ময়লা আবর্জনার ভাগার হলো মিরকাদিমের খাল। খালটির পুরো অংশ জুড়ে ময়লা আবর্জনার স্থুপ। কচুরি পানাসহ বিভিন্ন ধরনের গাছগাছালিতে খালটি এখন পরিত্যাক্ত শুকনো ডোবাতে পরিণত হয়ছে। খালটি খননের দীর্ঘদিনের দাবি পৌরবাসীর
এছাড়াও সদর উপজেলার পঞ্চসার ইউনিয়নের ঐতিহ্যবাহী ফিরিঙ্গবাজার খাল। খালটির প্রবেশ মুখ ধলেশ্বরী নদীর ফিরিঙ্গিবাজার এলাকায়। সেখান থেকে শুরু করে প্রায় ২ কিলোমিটার দক্ষিনে মাদবরবাড়ী এবং চৌধুরীবাড়ী ব্রিজ পর্যন্ত খালটি খনন করে পানি নিস্কাশনের ব্যবস্থা করা হয়েছিলো। স্থানীয়দের অভিযোগ, দখল, দূষণ আর ময়লা ফেলে যে যার মত করে খালটিকে দখল করে নিচ্ছে। খালটির প্রবেশ মুখের দু”পাশে বালু ভরাট করে খালে পানি প্রবাহ বন্ধ করে দিয়েছে স্থানীয়রা। পাশাপাশি ফিরিঙ্গবাজার থেকে শুরু করে মুক্তারপুর বিসিক মাঠের পিছনে চৌধুরীবাড়ী ব্রিজ পর্যন্ত খালটির বিভিন্ন স্থানে গড়ে উঠেছে প্রায় ২০টিরও অধিক অবৈধ স্থাপনা।
অন্যদিকে, সদর উপজেলার ফিরিঙ্গিবাজার এলাকার ধলেশ্বরী নদীর সাথে সংযুক্ত ইছামতি খাল। এই খালটি পঞ্চসার ইউনিয়নের সীমানা রামগোপালপুর জোড়া ব্রিজ পর্যন্ত। খালটির প্রবেশ মুখে ভরাট হয়ে যাওয়ায় বেশ কয়েক বছর ধরে খালটিতে আর জোয়ার ভাটার আগমন নেই।
এমনি ভাবেই দখল হয়ে যাচ্ছে গজারিয়া উপজেলার বেশ কিছু চলমান খাল। উপজেলার ভবেরচর বাসস্ট্যান্ড থেকে বাজার হয়ে কালিতলা হয়ে মেঘনার সাথে সংযুক্ত খালটি বিভিন্ন জায়গায় বাঁধ দিয়ে বালু ভরাট করছে। তবে বলার যেন কেউই নেই। উপজেলার ইমামপুর ইউনিয়নের দৌলতপুর খাল, বাউশিয়া ইউনিয়নের বড়কান্দি খাল, তেতুইতলা খালসহ বিভিন্ন খাল প্রভাবশালী সিন্ডিকেট ছাড়াও মোনায়েম কোম্পানি, আনোয়ার সিমেন্ট কোম্পানীর মতো বিভিন্ন কোম্পানী দখল করে নিয়েছে। মুছে দিয়েছে খালের চিহ্নটুকু।
মুন্সিগঞ্জ সিরাজদিখান উপজেলার মধ্যপাড়া ইউনিয়নের পূর্ব-কাকালদি এলাকার “কাকলদি খাল” ও ইছাপুরা ইউনিয়নের পূর্ব শিয়ালদি এলাকার “শিয়ালদি খাল” সহ লৌহজং উপজেলার কনকসার এলাকার “কনকসার খাল” উপজেলার বেশ কয়েকটি খাল এভাবেই দখল করে নিয়েছে প্রভাবশালী মহল থেকে শুরু করে বিভিন্ন সিন্ডিকেট।
মৃত্তিকা গবেষকদের মতে, ‘একদিকে খাল দখল, ভরাট, বাঁধ দেওয়া। এগুলো ভরাট কিংবা দখল পরিবেশের জন্য মারাত্মক বিপর্যয় ডেকে আনবে। প্রয়োজনে দখলমুক্ত করে খনন করতে হবে। এ ছাড়া মানুষের সৃষ্টি কিছু জলাশয় তৈরি করা হয়েছিল সেগুলো এখন ভরাট করা হচ্ছে। এসব কোনোটাই পরিবেশের জন্য সুখকর না। যৌবনকালে উপকূলীয় পাথরঘাটায় নদী-খাল নিবারণ করতো লাখো মানুষের তৃষ্ণা ও জীবন-জীবিকা। এ নদীর সুখ-দুঃখের সঙ্গে গাঁটছড়া বেঁধেছিলেন তীরের হাজারো পরিবারের সদস্যরা। একসময় নদী-খালের যৌবন আশপাশের বসতিদের ছিল সুখের ছোয়া, অর্থনৈতিক সমৃদ্ধির শিহরণ। এখন অনেকটাই মরতে বসেছে বরগুনার পাথরঘাটার ছোট ছোট খাল। সেইসঙ্গে মারছে তার ওপর ভর করা আশপাশের বসতি এবং প্রাকৃতিক পরিবেশ। কিছু খাল কাটা শুরু হলেও খননকৃত মাটি খালের পাশে রাখার কারণে বৃষ্টির মৌসুমে পানিতে ধেয়ে আবার পূর্বের অবস্থায় রূপান্তরিত হবে বিধায় খাল কাটার সুবিধা থেকে জনগণ বঞ্চিত হবে।
সম্পাদক - আশরাফ ইকবাল, নির্বাহী সম্পাদক - বর্ষন মোহাম্মদ
© স্বত্ব সংরক্ষিত © ২০২৬ দৈনিক মুন্সিগঞ্জের বার্তা