প্রায় ২ শত ৫০ ধরনের ভাইরাস খাদ্যজনিত রোগের সঙ্গে সম্পর্কিত
বর্ষন মোহাম্মদ:
মুখরোচক আর সস্তা হওয়ায় বেশ জনপ্রিয় ফুটপাতের খাবার। কিন্তু এসব খাবার বিষে ভরা - বলছেন কৃষি গবেষণা কাউন্সিল। গবেষণা তথ্য মতে, ফুটপাতের শতভাগ খাবারে আছে মলের জীবাণু। তবে এমন অভিযোগে দোকান বন্ধ করে না দিয়ে, বরং উদ্যোক্তাদের প্রশিক্ষণ দেয়ার পরামর্শ, অর্থনীতিবিদদের। কিরণে কিরণে সারাদিন কাটিয়ে, সূয্যিমামার বিশ্রামে, খোলা আকাশে উকি দেয় নিয়ন আলো। প্রতিদিনের এই সাঁঝের মায়ায় উদাম হয়, হাজারো দোকান। পশরা বসে বাহারি খাবারের।
আলো আঁধারের এমন আয়োজনে পরিবার-বন্ধু-আপনজন নিয়ে পথের খাবার উপভোগ করেন অনেকেই। তৃপ্তির ডেকুর তোলেন পছন্দের ফুচকা, চটপটি আর গ্রিল-চপ-শিকে। ভোক্তাদের আড্ডার ফাঁকে মুখরোচক খাবার পরিবেশন করে তাই সমৃদ্ধি খুঁজে পান, খাবার দোকানিরাও।
ফুটপাতের খাবারে ক্ষতিকর জীবাণু:
গবেষণা তথ্য মতে, ফুটপাতের শতভাগ খাবারে আছে মলের জীবাণু। তবে এমন অভিযোগে দোকান বন্ধ করে না দিয়ে, বরং উদ্যোক্তাদের প্রশিক্ষণ দেওয়ার পরামর্শ অর্থনীতিবিদদের।
গবেষণা বলছে, আখসহ বিভিন্ন ফলের রস, ভেলপুরি, পানিপুরি, ঝালমুড়ি, নুডলস ও জাম্বুরা মাখার শতবাগ নমুনায় মলের জীবাণু কলিফর্ম ও ইকোলাই আছে ক্ষতিকর মাত্রার অনেক উপরেই। তবে লেবুর রস ও তেঁতুল পানিতে তা ছিল সহনীয় মাত্রায়।
উদ্যোক্তা অর্থনীতিবিদরা বলছেন, ফুটপাতের খাবারে জীবাণু মিলেছে এমন অভিযোগে দোকান বন্ধ না করে, বরং প্রশিক্ষণ দিতে হবে ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের।
যানবাহন চলাচলে বাতাসের ধূলিকণা :
এসব খাবারগুলো যেভাবে উন্মুক্ত স্থানে পরিবেশন ও তৈরি করা হয় তাতে করে এর পাশ দিয়েই যানবাহন চলাচল করলে বাতাসের ময়লা ধূলিকণাগুলো সেইসব খাবারে পড়বে এটাই স্বাভাবিক।
কর্মজীবীরা বাধ্য হয়ে খান স্ট্রিট ফুড/পথের খাবারে স্বাস্থ্যঝুঁকি: মিরকাদিম পৌর রিকাবী বাজার মোরে সোনালী ব্যাংকের চাকরিজীবী আলমগীর হোসেন প্রতিদিনই দুপুরে পথের খাবার (স্ট্রিট ফুড) খান। তার খাদ্য তালিকায় রয়েছে ভাজি পরোটা, পিঠা, বিরিয়ানী, ভাত-সবজি কিংবা ভাজাপোড়া। এসব খাবার স্বাস্থ্যকর কিনা তিনি তা জানেন না। রাস্তায় বসে এসব খাবার তৈরি করা হয়। দীর্ঘদিন থেকে খেয়ে খেয়ে অভ্যাস হয়ে গেছে।
জেলা সদরের সিপাহীপারা মোড়ের ফুটপাথে ব্যবসা করেন সুজন বনিক। তার খাদ্য তালিকায় রয়েছে বিরিয়ানি, পিঠা। আলমীর হোসেন ও সুরুজ বনিকের মতো হাজারো কর্মজীবী রয়েছেন যারা প্রতিনিয়ত পথের খাবারের প্রতি বেশি নির্ভরশীল। অথচ করোনাভাইরাসের মধ্যেও তাদের স্বাস্থ্য সচেতনতা নেই। এসব খাবারের বিক্রেতাদের মধ্যেও নেই স্বাস্থ্য সচেতনতার কোনও লক্ষণ। ফলে পথের খাবারে স্বাস্থ্যঝুঁকি বাড়ছে।
খবরের কাগজে মোড়ানো খাবারে স্বাস্থ্যঝুঁকিঃ “খবরের কাগজে খাবার মোড়ানো একটি অস্বাস্থ্যকর অভ্যাস এবং এ ধরনের খাবার খাওয়া স্বাস্থ্যের জন্যও ক্ষতিকর। এমনকি যদি স্বাস্থ্যকরভাবেও খাবারটি রান্না করা হয়, তারপরও খবরের কাগজে মোড়ানো হলে তা দূষিত হয়ে পড়ে।”
বিভিন্ন রোগের সংক্রমণ :
প্রায় ২ শত ৫০টি ভিন্ন ধরনের ভাইরাস, ব্যাকটেরিয়া, প্যারাসাইট, টক্সিন ইত্যাদি মানবদেহের খাদ্যজনিত রোগের সঙ্গে সম্পর্কিত। এর মধ্যে ভাইরাসই ৫০ ভাগ খাদ্যজনিত রোগ সৃষ্টিতে ভূমিকা রাখে। আর ৯০ ভাগ খাদ্যজনিত সমস্যার সঙ্গে সম্পর্কিত ব্যাকটেরিয়াগুলোর মধ্যে রয়েছে, ঝঃধঢ়যুষড়পড়পপঁং, ঝধষসড়হবষষধ, ঈষড়ংঃৎরফরঁস, ঈধসঢ়ুষড়নধপঃবৎ, খরংঃবৎরধ, ঠরনৎরড়, ইধপরষষঁং, এবং ঊহঃবৎড়ঢ়ধঃযড়মবহরপ ঊংপযবৎরপযরধ পড়ষর প্রজাতির ক্ষতিকর জীবাণু। এসব ক্ষতিকর জীবাণুর ফলে খাদ্যে বিষক্রিয়া, ডায়েরিয়া, আমাশা, চর্মের সংক্রমণ, শ্বাস-প্রশ্বাস ও পরিপাকতন্ত্রের সমস্যাসহ প্রাণঘাতী রোগ মেনিনজাইটিস ও সেপ্টেসেমিয়া হতে পারে।
ফুটপাতে হোটেল-রেস্তোরায় অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে খাবার:
জেলা শহরের অন্যতম ব্যস্ত এলাকা সুপারমার্কেট। হাসপাতাল আর ক্লিনিক, ওষুধের দোকান, চিকিৎসকদের চেম্বার আর ডায়াগনস্টিকের কারণে ভীড় লেগেই থাকে এ এলাকায়। তবে এ এলাকার বেশিভাগ খাবারের হোটেল রেস্তোরায় খাবার বিক্রি হয় সম্পূর্ণ নোংরা ও অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে। খাবার উন্মুক্ত রেখেই চলে ব্যবসা। হোটেল ওয়ালাদের হাকডাক।
সদর উপজেলার বিভিন্ন এলাকায় ফুটপাত ও ভ্যানগাড়িতে করে শুরু হয় এসব ঠাণ্ডা পানীয় বিক্রির প্রতিযোগিতা। একটি পানির ফিল্টারের মধ্যে বরফ, কয়েক শ লেবু ও ‘ড্রিংক পাউডার’ নিয়েই চলে এই পানীয় তৈরির প্রক্রিয়া। শুধু লেবুর পানি এক গ্লাস ৫ টাকা এবং ড্রিংক পাউডার বা অন্যান্য বিভিন্ন উপাদান দিয়ে মেশানোর লেবুর পানি প্রতি গ্লাস ১০ টাকা থেকে ৩০ টাকা পর্যন্তও বিক্রি হচ্ছে।
এছাড়াও যে কোনো পরিবেশে তৈরি এসব শরবত পানে কিডনি বিকল, পানিবাহিত রোগ, গ্যাস্ট্রিক, হেপাটাইটিস বি-ভাইরাস, লিভারের জটিলতা, পাকস্থলীতে প্রদাহ, খাদ্যনালিতে সমস্যা, পেপটিক আলসারসহ মারাত্মক জটিল রোগে আক্রান্ত হতে পারেন। আর ডায়রিয়ার মতো পানিবাহিত রোগের অন্যতম কারণ জীবানুযুক্ত পানি। বিশেষ করে বরফমিশ্রিত শরবত এ জন্য বিশেষভাবে দায়ী বলেও জানান তারা।
শরীরের জন্য মারাত্মক ক্ষতিকর ঝালমুড়ি, ফুচকা আর ভেলপুরি:
অনেকের কাছেই খুব প্রিয় খাবার ফুচকা। বিভিন্ন স্থান থেকে সংগ্রহ করা ফুচকা পরীক্ষায় তাতে মলের জীবাণু পাওয়া গেছে বলে জানিয়েছেন বাংলাদেশ নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান অতিরিক্ত সচিব মো. মাহবুব কবীর। সাধারণত ভ্রাম্যমাণ এসব দোকান। সেখানে ঝালমুড়ি, ফুচকা, ভেলপুরি বা বাহারি আচার থরে থরে সাজানো। বাইরের খাবার খাওয়া ঠিক নয়—এমন সাবধানবাণী মা-বাবা বা অন্য অভিভাবক বরাবরই শোনান। তবে ফুচকাওয়ালার দুই চাকার ঠেলা স্টলটিতে ফুলে থাকা ঠাসা ফুচকাগুলো দেখলে মন কি মানে! তাই নিষেধের বাণী তখন মন থেকে হাওয়া।
গবেষণায় জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা জানিয়েছেন, ঝালমুড়ি, ফুচকা, ভেলপুরি ও আচারের নমুনা সংগ্রহ করে সেগুলোয় কৃত্রিম রং, ইস্ট, ই-কোলাই, কলিফর্ম, মাইকোটক্সিন, সালমোলিনার মতো শরীরের জন্য মারাত্মক ক্ষতিকর সব উপাদান পেয়েছে।
এসব খাদ্যদ্রব্যে পাওয়া গেছে, তাতে খুব সহজেই মানুষ ডায়রিয়া, আমাশয়, টাইফয়েড, জন্ডিসে আক্রান্ত হতে পারে। এখানে আমাশয়ের মতো অসুখের বাইরে মূত্রপথের মারাত্মক সংক্রমণ হতে পারে। সালমোনিলা টাইফয়েডের জীবাণু। মাইকোটক্সিনের কারণে হতে পারে চরম ডায়রিয়া। পচা গম, পচা চালে ফাঙাস জন্মে। এটাই মাইকোটক্সিন। নষ্ট হয়ে যাওয়া মুড়ি থেকে বা পচা ময়দার ভেলপুরি বা ফুচকার পুরি থেকে এটা তৈরি হতে পারে।
সম্পাদক - আশরাফ ইকবাল, নির্বাহী সম্পাদক - বর্ষন মোহাম্মদ
© স্বত্ব সংরক্ষিত © ২০২৬ দৈনিক মুন্সিগঞ্জের বার্তা