প্রিন্ট এর তারিখঃ জুলাই ৭, ২০২৬, ৫:০৭ পি.এম || প্রকাশের তারিখঃ অগাস্ট ২৭, ২০২৫, ৯:৪১ এ.এম
একজন ক্যাপ্টেন আফতাব কাদের

মেজর মো. সিফাতুল আলম
মুর্শেদা বাহার জুলিয়ার চোখ দিয়ে টপ টপ করে পানি পড়ছে। খাগড়াছড়ির রামগরে একটা কবরস্থানের বাইরে দুই হাত উঁচু করে মোনাজাত করছেন ষাটোর্ধ্ব জুলিয়া। স্বামী ড. শামসুল হুদা কিছুটা পেছনে দাঁড়িয়ে ফাতিহা পাঠ করছেন। জুলিয়ার অশ্রুসিক্ত মুখ পেছন থেকে দেখার কোনো উপায় নেই। তবুও হুদা টের পেলেন। কারণ, তার স্ত্রী কেঁপে কেঁপে উঠছেন। হুদা সাহেব পরম মমতায় স্ত্রীর কাঁধে হাত রাখলেন। তেমন লাভ হলো না। এবারে জুলিয়া সশব্দে হু হু করে কেঁদে উঠলেন। যুক্তরাষ্ট্রের নিউ অর্লিন্সে জেভিয়ার ইউনিভার্সিটির ইতিহাস বিভাগের চেয়ারম্যান ডক্টর শামসুল হুদা। সস্ত্রীক ইউএসএতে সেটেল্ড। প্রতি বছর একবার দেশে আসা হয়। দেশে এলেই সবার আগে খাগড়াছড়ির রামগড়ে এক কবরস্থানে স্ত্রীকে নিয়ে চলে আসেন একটি কবর জিয়ারতের জন্য। এই কবরটি আর কারও নয়। জুলিয়ার প্রথম স্বামী আফতাব কাদেরের। ১৯৪৭ সালের ২৫ ডিসেম্বর রওশান আরা বেগমের কোল আলো করে এলো ফুটফুটে এক শিশু। বাবা চট্টগ্রামের ডেপুটি ম্যাজিস্ট্রেট আব্দুল কাদের। বাবার কর্মক্ষেত্রের সুবাদে আফতাবের শৈশব-কৈশোর একজায়গায় থিতু হয়নি কখনো। ময়মনসিংহের কেওয়াটখালি স্কুল থেকে এসএসসি পাস করেন; ১৯৬৫ সালে এইচএসসি পাস করেন আনন্দমোহন কলেজ থেকে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অনার্স প্রথম বর্ষে আফতাব; ইংরেজি বিভাগে। চোখে পড়ে সেনাবাহিনীতে অফিসার নিয়োগের বিজ্ঞপ্তি। সালটা তখন ১৯৬৬। ২০ হাজার প্রার্থীর মধ্যে পূর্ব পাকিস্তান থেকে নির্বাচিত হয় পঞ্চাশেরও কম প্রার্থী। ১৯৬৬ সালের নভেম্বরের ১৬ তারিখ পাকিস্তান মিলিটারি একাডেমিতে ৩৯ পিএমএ লং কোর্সের সাথে শুরু হলো আফতাবুল কাদেরের সামরিক জীবন। দু'বছর চললো কঠোর সামরিক প্রশিক্ষণ। অবশেষে ২০ অক্টোবর, ১৯৬৮ সালে পাকিস্তান আর্মিতে কমিশন পেলেন আফতাব। সেকেন্ড লেফটেন্যান্ট আফতাবুল কাদের, আর্টিলারি। প্রচন্ড স্মার্ট আফতাব চওড়া ছাতি আর সুন্দর স্বাস্থ্যের অধিকারী। সবসময়ই উন্নতশির ও দৃপ্তভঙ্গিতে হাঁটেন। চমৎকার ইংরেজি বলেন। তার গলায় ইংরেজি গান শুনে অন্যান্য অফিসাররা তাকে বিখ্যাত হলিউডের নায়ক রক হাডসনের নামে 'রকি' বলে সম্বোধন করেন। বহু অফিসারের মধ্যে তাঁকে আলাদা করে চেনা যায় সহজেই। বছর ঘুরতেই লেফটেন্যান্ট র্যংকে পদোন্নতি পান। সময় বয়ে যায়। ১৯৬৯ সালের ১৪ নভেম্বর ক্যাপ্টেন পদে পদোন্নতি হয় আফতাবের। বাৎসরিক ছুটি কাটাতে ৫ই ফেব্রুয়ারি ১৯৭১ সালে আফতাবের বিমানের চাকা ঢাকা স্পর্শ করে। এর মাসখানেকের মাথায় পরিস্থিতি হয়ে পড়ে বেসামাল। সময়টা তখন বড়ই টালমাটাল। বঙ্গবন্ধুর বাংলাদেশে স্বাধীনতা ঘোষণার কথা ২৬শে মার্চ রাতেই বিবিসি সম্প্রচার করে। রেডিওতে জানতে পেরে উজ্জীবিত হয়ে ওঠেন যোদ্ধা আফতাবুল কাদের। মাতৃভূমিকে রক্ষা করাই যদি হয় একজন সৈনিকের দায়িত্ব, তাহলে এই ক্রান্তিলগ্নে আফতাব বসে থাকবেন কেন? সিদ্ধান্ত নিলেন ক্যাপ্টেন আফতাব। ফিরে যাবেন না পশ্চিম পাকিস্তানে।
১৩ এপ্রিল, ১৯৭১; মঙ্গলবার। প্রায় দুপুর। রামগড় থানার ওসির অফিস। চট্টগ্রামের জেলা প্রশাসক এইচ টি ইমাম আর ৮ ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের অধিনায়ক মেজর জিয়াউর রহমান আলোচনায় ব্যস্ত। এমন সময় থানায় এলো ৫ ফুট ৭ ইঞ্চির সুঠামদেহী এক যুবক। এসেই মিলিটারি কায়দায় চেক মেরে সালাম ঠুকে এটেনশন হয়ে বললো, “ক্যাপ্টেন আফতাব কাদের, আর্টিলারি, রিপোর্টিং প্রেজেন্ট স্যার।” মেজর জিয়া পাকিস্তান মিলিটারি একাডেমিতে আফতাবের কোর্সের প্লাটুন কমান্ডার ছিলেন। ইতোমধ্যে যুদ্ধের দামামা বেজে উঠেছে। ক্যাপ্টেন আফতাব কাদের ৮ ইস্টবেঙ্গলের সাথে সম্মুখযুদ্ধে অংশ নিয়ে মহালছড়িতে ডিফেন্স নিলেন। হাতে আংটি। মুখে পৌরুষদীপ্ত গোঁফ। ২৭ এপ্রিল, ১৯৭১। সকাল ১০ টা। পাকিস্তান সেনাবাহিনীর ৩ কমান্ডো ব্যাটালিয়নের ১ কোম্পানি (প্রায় ১৩০ জন) ও ১৫০০ মিজো বিদ্রোহী আক্রমণ হানলো ক্যাপ্টেন আফতাব কাদের ও ক্যাপ্টেন চৌধুরী খালেকুজ্জামানের ডিফেন্সের ওপর। লেফটেন্যান্ট মাহফুজের রিজার্ভ ফোর্স তাদের সাহায্যে এগিয়ে এলো। নিজের স্টেন গানে অ্যামুনিশন শেষ হয়ে যায় আফতাবের। শত্রুর গুলি খাওয়া সহযোদ্ধা সৈনিকের এলএমজিটা হাতে নিয়ে ফায়ার করতে থাকেন ক্যাপ্টেন আফতাব। ডিফেন্সে ট্রেঞ্চ থেকে বের হওয়া মানে শত্রুর হাতে আস্ত করে নিজের জীবনটা সঁপে দেয়া। কোনো নিয়মনীতির তোয়াক্কা না করে ট্রেঞ্চ থেকে বেরিয়ে পড়েন তিনি। শত্রু থেকে তার দূরত্ব মাত্র ৫০ গজ! খোলা আকাশের নিচে তিন ম্যাগাজিন খালি করে কাভারিং ফায়ার দেয় এই তরুণ ক্যাপ্টেন। জীবন বাঁচায় শতাধিক গেরিলার! কিন্তু কথায় আছে, ‘কপালের লিখন না যায় খন্ডন'! এই আক্রমণের একপর্যায়ে শত্রুর একটি গুলি এসে হৃদপিন্ড ভেদ করে চলে যায়। সটান করে শরীরের সমস্ত শক্তি এক করে এলএমজি হাতে দাঁড়িয়ে পড়েন এবং বলেন 'আই হ্যাভ বিন হিট'। সবাই অবিশ্বাসের সঙ্গে তাঁর দিকে তাকায় এবং তিনি এলএমজি হাতেই মাটিতে লুটিয়ে পড়েন। হাতের এলএমজিটা তিনি জোরে ধরে ছিলেন তখনো। আশপাশের মুক্তিযোদ্ধারা শুনতে পান তার শেষ কথা, “মা”। বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর সদর দপ্তর থেকে বিএ ১০৫৬১ ক্যাপ্টেন আফতাব কাদের শহীদকে বীরউত্তম (বিউ) পদক প্রদানের অর্ডার ইস্যু করা হয়। সম্মুখসমরে আফতাব কাদের দ্বিতীয় শহীদ অফিসার। তার আগে ১৯৭১ সালের মার্চ মাসের ৩০ তারিখে যশোর সেনানিবাসে ১ম ইস্টবেঙ্গল রেজিমেন্টের সেকেন্ড লেফটেন্যান্ট আনোয়ার হোসেন সম্মুখসমরে শাহাদত বরণ করেন। মুক্তিযুদ্ধে সশস্ত্র বাহিনীর সর্বাধিনায়ক জেনারেল এম এ জি ওসমানী ক্যাপ্টেন আফতাব কাদেরের পত্নী মুর্শেদা বাহার জুলিয়াকে ডিও লেটার পাঠান। ক্যাপ্টেন আফতাব শহীদ হওয়ার পরে তার রক্তভেজা শার্ট আর আংটি সহযোদ্ধারা জেড ফোর্স হেডকোয়ার্টার্সে পাঠিয়ে দেয়। যুদ্ধের পরে ১৯৭২ সালের শেষের দিকে মায়ের হাত ঘুরে জুলিয়ায় হাতে আসে স্বামী আফতাবের শার্ট আর আংটি। সেই শার্ট হাতে নিয়ে কোথায় যেন হারিয়ে যায় জুলিয়া। চোখের অশ্রু গাল বেয়ে ঝরতে থাকে সময়ে অসময়ে। কিন্তু জীবন-ধারাপাতের নামতাটা বড়ই অদ্ভুত। এখানে পাটিগণিতের হিসাব বড়ই এলোমেলো। নদীর মতো প্রবহমান জীবনের হিসেবে তাই সুখ-দুঃখের সমীকরণটা কোনো নিয়ম মানে না। ১৯৭৫ এ আবার বিয়ে হয় জুলিয়ায়। এরপর মেঘে মেঘে অনেক বেলা হয়েছে। স্বামীর কাজের সূত্রে জুলিয়া থিতু হয়েছেন দূর প্রবাসে। তবে মাঝে মাঝে বড়ই আনমনা হয়ে যান জুলিয়া। মনটা ফুড়ুৎ করে উড়ে যায় নিউ অর্লিন্স থেকে চিটাগাংয়ের প্রবর্তক মোড়ে। কখনোবা রামগড়ের সাড়ে তিন হাত সীমানায়। প্রতি বছর জুলিয়া আর ডক্টর শামসুল দেশে বেড়াতে আসেন। চিটাগাং এয়ারপোর্টের বাইরে একটা কালো মরিস মাইনর দাঁড়িয়ে থাকে তাদের অপেক্ষায়। দেশে নেমেই সোজা চলে যান খাগড়াছড়ির রামগড়ে। গত ৪১ বছরে এই নিয়মের কোনো ব্যত্যয় ঘটেনি। যুগে যুগে ক্ষণজন্মা ক্যাপ্টেন আফতাব কাদেররা হুটহাট বেড়াতে আসেন আমাদের মাঝে। জুলিয়াদের ভালবাসায় সিক্ত হয়ে খুব তাড়াতাড়িই চলে যান ওপারে। মারা গিয়ে চিরদিন বেঁচে থাকেন আমাদের অন্তরে। আমরা ধুঁকে ধুঁকে বেঁচে থাকি মরার অপেক্ষায় ।
লেখক : মেজর, বাংলাদেশ সেনাবাহিনী ও উপদেষ্টা, ঝিকুট ফাউন্ডেশন।
সম্পাদক - আশরাফ ইকবাল, নির্বাহী সম্পাদক - বর্ষন মোহাম্মদ
© স্বত্ব সংরক্ষিত © ২০২৬ দৈনিক মুন্সিগঞ্জের বার্তা