রাজনীতি কখনোই নিষ্পাপ ছিল না। ক্ষমতা, প্রতিদ্বন্দ্বিতা, আদর্শিক সংঘর্ষ সবমিলিয়ে রাজনীতি বরাবরই কঠিন, নির্মম এবং অনেক সময় নিষ্ঠুর। কিন্তু রাজনীতিরও কিছু অলিখিত সীমারেখা থাকে, থাকে কিছু নৈতিক রেখা, যেগুলো অতিক্রম করলে রাজনীতি আর রাজনীতি থাকে না, তা হয়ে ওঠে সামাজিক বিষবাষ্প। সাম্প্রতিক সময়ে সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও বাংলাদেশের ইতিহাসের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব বেগম খালেদা জিয়ার মৃত্যুকে ঘিরে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে যে নির্মম, অমানবিক এবং দায়িত্বজ্ঞানহীন প্রচারণা চালানো হয়েছে, তা সেই সীমারেখাকে নির্মমভাবে পদদলিত করেছে।
'খালেদা জিয়া আগেই মারা গেছেন, কিন্তু ঘোষণা করা হয়নি। রাজনৈতিক সুবিধার জন্য তারেক রহমান মায়ের লাশ নিয়ে নোংরা রাজনীতি করেছেন'- এই ধরনের বাক্য কেবল একটি দলের বিরুদ্ধে কুৎসা নয়, এটি একসঙ্গে ব্যক্তি, পরিবার, রাজনৈতিক দল এবং সমগ্র জাতির রাজনৈতিক সংস্কৃতির বিরুদ্ধে এক নিষ্ঠুর আঘাত। এমন বক্তব্য জামায়াত-শিবির সংশ্লিষ্ট কিছু অনলাইন প্ল্যাটফর্ম ও ব্যক্তির মাধ্যমে ছড়ানো হয়েছে। এটি বিএনপির লক্ষ লক্ষ নেতাকর্মী ও সমর্থকের মনে গভীর ক্ষত সৃষ্টি করেছে, হৃদয়ে রক্তক্ষরণ ঘটিয়েছে।
এই লেখায় আমরা শুধু একটি দলের আবেগের কথা বলবো না। বরং দেখবো এ ধরনের নোংরা অপপ্রচার রাজনীতির মাঠে কত বিপজ্জনক, কীভাবে এটি রাজনৈতিক ঐক্য ধ্বংস করে, সামাজিক মেরুকরণ তীব্র করে এবং দীর্ঘমেয়াদে রাষ্ট্রীয় স্থিতিশীলতাকে হুমকির মুখে ঠেলে দেয়।
১। মৃত্যু রাজনীতির ঊর্ধ্বে এক মানবিক বাস্তবতা
মৃত্যু এমন এক সত্য, যা রাজা-প্রজা, বন্ধু-শত্রু, ক্ষমতাসীন-বিরোধী কাউকেই আলাদা করে না। সভ্য সমাজে মৃত্যুকে ঘিরে ন্যূনতম শালীনতা ও সংবেদনশীলতা বজায় রাখাকে মানবিকতার মাপকাঠি হিসেবে দেখা হয়। রাজনৈতিক মতপার্থক্য থাকতেই পারে, থাকবে, কিন্তু মৃত্যুকে কেন্দ্র করে কুৎসা, ষড়যন্ত্রতত্ত্ব এবং কটূক্তি ছড়ানো মানে রাজনীতিকে পশুত্বের স্তরে নামিয়ে আনা।
খালেদা জিয়া শুধু বিএনপির চেয়ারপারসন ছিলেন না, তিনি বাংলাদেশের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী, একজন মুক্তিযুদ্ধ-পরবর্তী রাজনৈতিক ইতিহাসের কেন্দ্রীয় চরিত্র। তাকে ভালোবাসা বা বিরোধিতা দুটোরই রাজনৈতিক অধিকার আছে। কিন্তু তার মৃত্যু নিয়ে 'লাশের রাজনীতি'র অভিযোগ তোলা মানে শুধু একটি পরিবারকে অপমান করা নয়, এটি ঐতিহাসিক ব্যক্তিত্বের প্রতি জাতিগত অসম্মান।
২। অপপ্রচার ও গুজব আধুনিক রাজনীতির সবচেয়ে মারাত্মক অস্ত্র
বর্তমান রাজনৈতিক বাস্তবতায় ট্যাংক বা বন্দুক নয়, গুজব, মিথ্যা তথ্য এবং উদ্দেশ্যপ্রণোদিত অপপ্রচারই সবচেয়ে শক্তিশালী অস্ত্র। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এই অস্ত্রকে আরও ভয়ংকর করে তুলেছে। একটি মিথ্যা পোস্ট, একটি বিকৃত বাক্য, একটি উদ্দেশ্যমূলক ভিডিও কয়েক মিনিটেই লাখো মানুষের কাছে পৌঁছে যায়।
খালেদা জিয়ার মৃত্যু নিয়ে ছড়ানো এই প্রচারণা তারই একটি ভয়াবহ উদাহরণ। এখানে কোনো প্রমাণ নেই, কোনো দায়িত্বশীল সূত্র নেই, আছে কেবল রাজনৈতিক বিদ্বেষ এবং প্রতিপক্ষকে ঘৃণিত করার অশুভ বাসনা। এ ধরনের অপপ্রচার তিনটি মারাত্মক কাজ করে-
ক। রাজনৈতিক আস্থাহীনতা সৃষ্টি করে।
খ। মানুষের আবেগকে উসকে দিয়ে সংঘাতের বীজ বপন করে।
গ। রাজনীতিকে যুক্তি ও নীতির জায়গা থেকে সরিয়ে ঘৃণার খেলায় পরিণত করে।
৩। এটি একটি দলের কষ্ট নয়, বরং রাজনৈতিক সংস্কৃতির অবক্ষয়
অনেকে হয়তো বলবেন এতে বিএনপির নেতাকর্মীরাই কষ্ট পেয়েছে, অন্যদের কী? এই ভাবনাই সবচেয়ে বড় ভুল। বাস্তবে এই ধরনের নোংরামি কোনো একটি দলের ক্ষতির মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না।
আজ খালেদা জিয়াকে নিয়ে এমন অপপ্রচার হচ্ছে, কাল অন্য কোনো রাজনৈতিক নেতাকে নিয়ে হবে। আজ বিএনপি টার্গেট, কাল অন্য দল। এই প্রবণতা একবার বৈধতা পেলে রাজনীতিতে আর কোনো নৈতিক দেয়াল অবশিষ্ট থাকে না।
রাজনৈতিক সংস্কৃতির এই অবক্ষয়-
ক। তরুণ প্রজন্মকে রাজনীতি থেকে বিমুখ করে।
খ। রাজনীতিকে গণমানুষের কল্যাণের হাতিয়ার না বানিয়ে ঘৃণার ব্যবসায় পরিণত করে।
গ। গণতান্ত্রিক সহাবস্থানের ধারণাকে ভেঙে ফেলে।
৪। রাজনৈতিক ঐক্য ভাঙনের নীরব প্রক্রিয়া
একটি দেশের রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার অন্যতম শর্ত হলো মৌলিক কিছু বিষয়ে ন্যূনতম ঐকমত্য। মৃত্যু, জাতীয় শোক, মানবিক বিপর্যয়- এসব বিষয়ে দলমত নির্বিশেষে সংযম দেখানোই সভ্যতার পরিচয়।
কিন্তু যখন মৃত্যুকেও রাজনৈতিক হাতিয়ার বানানো হয়, তখন-
ক। পারস্পরিক শ্রদ্ধার শেষ দেয়ালটুকুও ভেঙে পড়ে।
খ। বিরোধিতা শত্রুতায় রূপ নেয়।
গ। রাজনৈতিক সংলাপ অসম্ভব হয়ে ওঠে।
এই প্রক্রিয়া ধীরে ধীরে জাতিকে দুই বা ততোধিক শিবিরে ভাগ করে দেয়, যেখানে যুক্তি নয়, শুধু ঘৃণা কথা বলে।
৫। সহিংসতার বীজ ও রাষ্ট্রীয় ঝুঁকি
ইতিহাস সাক্ষ্য দেয় রাজনৈতিক গুজব ও অপপ্রচারই অনেক সময় সহিংসতার প্রথম ধাপ। যখন মানুষের আবেগে আগুন দেওয়া হয়, তখন তা নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যেতে সময় লাগে না।
এই ধরনের প্রচারণা-
ক। রাজনৈতিক কর্মীদের উসকে দেয়।
খ। রাজপথে সংঘর্ষের ঝুঁকি বাড়ায়।
গ। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতিকে অস্থিতিশীল করে তোলে।
একটি রাষ্ট্র যদি তার রাজনৈতিক পরিসরে এমন বিষাক্ত ভাষাকে নিয়ন্ত্রণ করতে না পারে, তবে তা ধীরে ধীরে একটি অকার্যকর ও ভঙ্গুর রাষ্ট্রে পরিণত হওয়ার পথে হাঁটে।
৬। জামায়াত-শিবির ও রাজনৈতিক দায়িত্ববোধের প্রশ্ন
যেকোনো রাজনৈতিক দলেরই মত প্রকাশের অধিকার আছে। কিন্তু সেই অধিকার দায়িত্বশীলতার সঙ্গে ব্যবহার করতে হয়। জামায়াত-শিবির সংশ্লিষ্ট যে অংশ এ ধরনের প্রচারণায় জড়িত হয়েছে, তারা শুধু বিএনপিকেই আঘাত করেনি, নিজেদের রাজনৈতিক বিশ্বাসযোগ্যতাকেও প্রশ্নের মুখে ফেলেছে।
রাজনীতিতে টিকে থাকতে হলে কেবল বিরোধিতা নয়, নৈতিক অবস্থানও জরুরি। মৃত্যু নিয়ে কুৎসা রটানো কোনো আদর্শিক রাজনীতির পরিচয় হতে পারে না।
৭। মিডিয়া ও নাগরিক সমাজের ভূমিকা
এই সংকটে মিডিয়া ও নাগরিক সমাজের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। দায়িত্বশীল সাংবাদিকতা ছাড়া গুজবের আগুন নেভানো অসম্ভব। একইসঙ্গে নাগরিক সমাজকে স্পষ্টভাবে বলতে হবে মৃত্যু নিয়ে নোংরা রাজনীতি গ্রহণযোগ্য নয়।
নীরবতা এখানে নিরপেক্ষতা নয়, নীরবতা অনেক সময় অপরাধের সহযোগিতায় পরিণত হয়।
৮। কোন পথে উত্তরণ?
এই অন্ধকার থেকে বেরিয়ে আসতে হলে-
ক। রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে ন্যূনতম নৈতিক চুক্তি দরকার।
খ। গুজব ও অপপ্রচারের বিরুদ্ধে কঠোর সামাজিক ও আইনি অবস্থান প্রয়োজন।
গ। তরুণদের রাজনীতিতে যুক্ত করতে হলে রাজনীতিকে আবার মানবিক করতে হবে।
ঘ। মতভিন্নতা থাকবে, কিন্তু শালীনতার সীমা অতিক্রম করা যাবে না- এই বার্তা প্রতিষ্ঠা করতে হবে।
খালেদা জিয়ার মৃত্যু নিয়ে যে নোংরা প্রচারণা চালানো হয়েছে, তা কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়, এটি আমাদের রাজনৈতিক বাস্তবতার একটি ভয়ংকর প্রতিচ্ছবি। যদি আমরা এখানেই থেমে না যাই, যদি আমরা এখনই এই বিষাক্ত প্রবণতার বিরুদ্ধে না দাঁড়াই, তবে ভবিষ্যতে রাজনীতি আর মানুষের কল্যাণের বাহন থাকবে না, তা হয়ে উঠবে ঘৃণার স্থায়ী কারখানা।
মৃত্যু রাজনীতির হাতিয়ার হতে পারে না। যে সমাজ এই সত্য ভুলে যায়, সে সমাজ খুব দ্রুত তার মানবিক ভিত্তি হারায়। আজ প্রশ্নটি কোনো দল বা ব্যক্তির নয়, প্রশ্নটি আমাদের রাজনৈতিক সভ্যতা বাঁচানোর।
লেখক: অনুবাদক, লেখক ও কলামিস্ট।
সম্পাদক - আশরাফ ইকবাল, নির্বাহী সম্পাদক - বর্ষন মোহাম্মদ
© স্বত্ব সংরক্ষিত © ২০২৬ দৈনিক মুন্সিগঞ্জের বার্তা