নানা অভিযোগের মধ্যেও ২১ কোটি টাকার এআই প্রকল্প পেল ই-লার্নিং অ্যান্ড আর্নিং
চার বিভাগে প্রশিক্ষণের দায়িত্ব মাসুদ আলমের প্রতিষ্ঠানের হাতে, দরপত্রের স্বচ্ছতা ও অতীতের কার্যক্রম নিয়ে প্রশ্ন
নিজস্ব প্রতিবেদক
যুব উন্নয়ন অধিদপ্তরের প্রায় ২১ কোটি টাকার কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) প্রশিক্ষণ প্রকল্পের বড় দুটি প্যাকেজের কার্যাদেশ পেয়েছে ই-লার্নিং অ্যান্ড আর্নিং লিমিটেড। প্রতিষ্ঠানটির ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) মাসুদ আলমের বিরুদ্ধে অতীতে প্রশিক্ষণার্থী তালিকায় অনিয়ম, ভুয়া প্রশিক্ষণার্থী দেখিয়ে অর্থ উত্তোলন এবং কমিশন-বাণিজ্যের অভিযোগ থাকলেও নতুন এই প্রকল্পের দায়িত্ব পাওয়ায় প্রশ্ন উঠেছে দরপত্র মূল্যায়ন, যোগ্যতা যাচাই ও প্রকল্প বাস্তবায়নের স্বচ্ছতা নিয়ে।
অভিযোগ রয়েছে, অতীতের বিভিন্ন বিতর্ক এবং আইনগত পদক্ষেপের তথ্য সামনে আসার পরও প্রতিষ্ঠানটি সরকারি প্রশিক্ষণ প্রকল্পে কাজ পেয়ে আসছে। তবে এসব অভিযোগের সত্যতা, সংশ্লিষ্ট মামলার বর্তমান অবস্থা এবং নতুন প্রকল্পে কোনো অনিয়ম হয়েছে কি না, তা স্বাধীনভাবে যাচাই করা জরুরি।
যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয়ের অধীন যুব উন্নয়ন অধিদপ্তরের ‘তথ্য-প্রযুক্তি জ্ঞানসম্পন্ন যুবদের কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) প্রযুক্তির মাধ্যমে দক্ষতা উন্নয়ন’ শীর্ষক প্রকল্পের আওতায় ঢাকা, ময়মনসিংহ, খুলনা ও বরিশাল অঞ্চলের প্রশিক্ষণ কার্যক্রমের দুটি বড় প্যাকেজ (প্যাকেজ ১ ও ৩) পেয়েছে প্রতিষ্ঠানটি। অধিদপ্তরের নথি অনুযায়ী, গত ১৯ জুলাই চূড়ান্ত কার্যাদেশ দেওয়া হয়।
৬৪ জেলায় ৩০০ ঘণ্টার প্রশিক্ষণ
প্রকল্পটির উদ্দেশ্য দেশের বেকার তরুণ-তরুণীদের আধুনিক প্রযুক্তি, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও জেনারেটিভ এআই বিষয়ে দক্ষ করে গড়ে তোলা। এর আওতায় ৬৪ জেলায় ৩০০ ঘণ্টার প্রশিক্ষণ দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে। প্রশিক্ষণার্থীদের প্রতিদিন ২০০ টাকা করে যাতায়াত ও খাবার ভাতা দেওয়ার কথাও রয়েছে।
এত বড় পরিসরের প্রকল্পে প্রশিক্ষণার্থী নির্বাচন, উপস্থিতি যাচাই, প্রশিক্ষকের যোগ্যতা, প্রশিক্ষণ উপকরণ সরবরাহ এবং ভাতা বিতরণে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষ করে অতীতে প্রশিক্ষণ কার্যক্রম নিয়ে অভিযোগ ওঠা কোনো প্রতিষ্ঠানের হাতে দায়িত্ব গেলে তদারকি আরও জোরদার করা প্রয়োজন বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
অতীতের অভিযোগ, এবারও কি যথাযথ যাচাই?
ই-লার্নিং অ্যান্ড আর্নিং লিমিটেডের বিরুদ্ধে অতীতের কয়েকটি প্রশিক্ষণ প্রকল্পে ভুয়া বা অস্তিত্বহীন প্রশিক্ষণার্থী দেখিয়ে অর্থ উত্তোলন, প্রশিক্ষণ কার্যক্রমে অনিয়ম এবং কমিশন-বাণিজ্যের অভিযোগ রয়েছে। এসব অভিযোগের বিষয়ে গোয়েন্দা সংস্থার প্রতিবেদন থাকার কথাও বিভিন্ন সূত্রে উল্লেখ করা হয়েছে।
এ ছাড়া প্রতিষ্ঠানটির ব্যবস্থাপনা পরিচালক মাসুদ আলমের বিরুদ্ধে ব্যাংক হিসাব জব্দ এবং বিদেশ ভ্রমণে নিষেধাজ্ঞার মতো আইনগত পদক্ষেপের তথ্য সামনে এসেছে বলে অভিযোগ রয়েছে। তবে এসব পদক্ষেপের সুনির্দিষ্ট কারণ, সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের আদেশ এবং বর্তমান আইনগত অবস্থান যাচাই করা প্রয়োজন।
এ অবস্থায় প্রশ্ন উঠেছে, নতুন প্রকল্পের কার্যাদেশ দেওয়ার আগে প্রতিষ্ঠানটির অতীতের কাজের মূল্যায়ন, আর্থিক সক্ষমতা, অভিজ্ঞতা এবং অভিযোগগুলোর বিষয়ে অধিদপ্তর কী ধরনের যাচাই করেছে?
রাজনৈতিক যোগাযোগ নিয়েও আলোচনা
বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে তৎকালীন যুব ও ক্রীড়া প্রতিমন্ত্রী জাহিদ আহসান রাসেলের সঙ্গে মাসুদ আলমের ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ ছিল বলে বিভিন্ন মহলে আলোচনা রয়েছে। ২০২২ সালে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রীর কাছ থেকে ‘শেখ হাসিনা ইয়ুথ ভলান্টিয়ার অ্যাওয়ার্ড’ গ্রহণের তথ্যও সামনে এসেছে।
তবে কোনো রাজনৈতিক ব্যক্তির সঙ্গে ছবি, যোগাযোগ বা পুরস্কার গ্রহণের বিষয়টি নিজে থেকে অনিয়মের প্রমাণ নয়। মূল প্রশ্ন হচ্ছে, সরকারি প্রকল্পের কাজ পাওয়ার ক্ষেত্রে রাজনৈতিক যোগাযোগের কোনো প্রভাব ছিল কি না এবং দরপত্র প্রক্রিয়ায় সব প্রতিযোগী প্রতিষ্ঠান সমান সুযোগ পেয়েছিল কি না।
দরপত্রের শর্ত নিয়ে প্রশ্ন
অভিযোগ রয়েছে, দরপত্রের কিছু শর্ত এমনভাবে নির্ধারণ করা হয়েছিল, যাতে নির্দিষ্ট প্রতিষ্ঠান সুবিধা পেতে পারে। যদিও এ অভিযোগের পক্ষে দরপত্রের শর্ত, মূল্যায়ন প্রতিবেদন কিংবা প্রতিযোগী প্রতিষ্ঠানের লিখিত আপত্তি প্রকাশ্যে পাওয়া যায়নি, তবু বিষয়টি নিরপেক্ষভাবে যাচাই করা প্রয়োজন।
বিশেষ করে দরপত্রে অংশ নেওয়া প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা, কারিগরি মূল্যায়নের নম্বর, আর্থিক প্রস্তাব, যোগ্যতার শর্ত এবং কার্যাদেশ দেওয়ার সুপারিশ পর্যালোচনা করলে প্রকৃত চিত্র বেরিয়ে আসতে পারে।
মাসুদ আলমের বক্তব্য
অভিযোগের বিষয়ে ই-লার্নিং অ্যান্ড আর্নিং লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মাসুদ আলম বলেন, তাঁর বিরুদ্ধে আনা অভিযোগগুলো ভিত্তিহীন এবং ব্যবসায়িক প্রতিপক্ষের সাজানো। সাবেক প্রতিমন্ত্রীর এলাকার লোক হওয়ায় সরকারি বিভিন্ন অনুষ্ঠানে ছবি থাকাটা অপরাধ নয়। দরপত্রের সব শর্ত পূরণ করেই উন্মুক্ত প্রক্রিয়ায় প্রতিষ্ঠানটি কাজ পেয়েছে। এতে কোনো রাজনৈতিক প্রভাব খাটানো হয়নি।
অধিদপ্তরের বক্তব্য
যুব উন্নয়ন অধিদপ্তরের একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, দরপত্র মূল্যায়ন কমিটির সুপারিশ অনুযায়ী নিয়ম মেনেই কার্যাদেশ দেওয়া হয়েছে। অতীতে কোনো অনিয়মের প্রমাণ পাওয়া গেলে অথবা বর্তমান প্রকল্পে সামান্যতম গাফিলতি দেখা গেলে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে কঠোর প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
জবাবদিহি নিশ্চিত করবে কে?
প্রায় ২১ কোটি টাকার এই প্রকল্প তরুণদের দক্ষতা উন্নয়নের জন্য গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগ। কিন্তু প্রকল্পের অর্থের যথাযথ ব্যবহার, প্রশিক্ষণের মান এবং প্রকৃত প্রশিক্ষণার্থীদের অংশগ্রহণ নিশ্চিত না হলে সরকারের উদ্দেশ্য ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
তাই প্রকল্পের পূর্ণাঙ্গ চুক্তি, দরপত্র মূল্যায়ন প্রতিবেদন, প্রশিক্ষণার্থীদের তালিকা, উপস্থিতি, ভাতা বিতরণের হিসাব এবং পূর্ববর্তী প্রকল্পগুলোর অডিট প্রতিবেদন জনসমক্ষে প্রকাশের দাবি উঠেছে।
অভিযোগের সত্যতা যাচাইয়ে যুব উন্নয়ন অধিদপ্তর, যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয় এবং সংশ্লিষ্ট নিরীক্ষা কর্তৃপক্ষের স্বাধীন তদন্ত প্রয়োজন। সরকারি অর্থের প্রতিটি টাকার জবাবদিহি নিশ্চিত করে তরুণদের জন্য নেওয়া এআই প্রশিক্ষণ প্রকল্পের প্রকৃত সুফল নিশ্চিত করাই এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।
সম্পাদক - আশরাফ ইকবাল, নির্বাহী সম্পাদক - বর্ষন মোহাম্মদ
© স্বত্ব সংরক্ষিত © ২০২৬ দৈনিক মুন্সিগঞ্জের বার্তা