এ. জেড.এ মুকুল
১৯৯১ সালের সম্ভবত জানুয়ারী মাস আমার যতটুকু মনে পড়ে শৈশবকালে খালেদা জিয়াকে খুব কাছে থেকে দেখার স্মৃতি রয়েছে। তিনি মুন্সিগঞ্জের শ্রীনগর স্টেডিয়ামে জনসভায় আসছিলেন এবং এমপি প্রার্থী হিসেবে মুন্সিগঞ্জ-১ আসনে বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা মহাসচিব ও সাবেক রাষ্ট্রপতি ডাঃ বি চৌধুরিকে এমপি প্রার্থী হিসেবে পরিচয় করিয়ে দেন। তিনি আড়িয়াল বিলে মাছের পোনা উন্মুক্ত করেছিলেন ও ডাঃ বি চৌধুরি তাকে বিক্রমপুরের বিখ্যাত গাদিঘাটের মিষ্টি কুমড়া (প্রায় ১ মন ওজনের) উপহার দিয়েছিলেন। জনসভায় বেগম খালেদা জিয়ার বক্তব্য ছিলেন সহজ, সরল, সাবলীল ও সৌন্দর্যের প্রতীক এবং উপস্থিত সভায় সকলে খুব মনোযোগ সহকারে তার বক্তব্য উপভোগ করেছিলেন। দল-মত নির্বিশেষে তিনি সবসময় শ্রদ্ধা ও ভালোবাসার মানুষ। পরবর্তীতে ১ যুগ পরে ২০০৩ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র থাকাকালীন এক বড় ভাইয়ের মাধ্যমে গনভবনে ইফতারের প্রোগ্রামে যাওয়ার সুযোগ হয়েছিল। সেদিন তিনি বাংলাদেশি মুসলিম জাতীয়তাবাদের আদর্শ লালন করে দেশ পরিচালনা বিষয়ে অসাধারন বক্তব্য প্রদান করেছিলেন। পাশাপাশি তিনি সরকার প্রধান হিসেবে রাষ্ট্রধর্ম ইসলাম ও সংবিধানের প্রস্তাবনায় যুক্ত বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহিম অপরিবর্তিত রাখার প্রয়োজনীয়তা বিষয়ে সকলের কাছে তুলে ধরেন।
বেগম খালেদা জিয়া বাংলাদেশের ৩য় বারের প্রধানমন্ত্রী, প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী এবং মুসলিম বিশ্বের দ্বিতীয় নির্বাচিত নারী সরকার প্রধান ছিলেন। বেগম খালেদা জিয়ার জন্ম নাম খালেদা খানম পুতুল। তিনি আগস্ট ১৫, ১৯৪৫ সালে দিনাজপুরে জন্ম গ্রহণ করেন। তিন বোন এবং দুই ভাইয়ের মধ্যে তিনি তৃতীয়। ভাইয়েরা সবার ছোট। তার পিতামহ হাজী সালামত আলী, মাতামহ জলপাইগুড়ির তোয়াবুর রহমান। বাবা জনাব ইস্কান্দর মজুমদার এবং মা বেগম তৈয়বা মজুমদার। দিনাজপুর শহরের মুদিপাড়া। আদি পৈতৃকনিবাস ফেনী জেলার ফুলগাজী উপজেলার শ্রীপুর গ্রামের মজুমদার বাড়ী। বাবা জনাব ইস্কান্দর মজুমদার ছিলেন একজন ব্যবসায়ী। ১৯৬০ সালে বেগম খালেদা জিয়ার সঙ্গে তৎকালীন পাকিস্তান সেনাবাহিনীর ক্যাডেট অফিসার জিয়াউর রহমানের বিয়ে হয়।
বেগম খালেদা জিয়া প্রত্যেক বারই সংসদ নির্বাচনে বিপুল ভোটে জয় লাভ করেছিলেন। নির্বাচনী ইতিহাসে তার একটি অনন্য রেকর্ড হলো ৫টি জাতীয় নির্বাচনে ২৩টি আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে সবগুলোতে জয়ী হওয়া। স্বাধীনতাযুদ্ধের দীর্ঘ ৯ মাস বেগম খালেদা জিয়া দুই সন্তানসহ গৃহবন্দি ছিলেন। তিনি বিনা অপরাধে গ্রেপ্তার হয়েছেন, মিথ্যা মামলায় জেল খেটেছেন; তবে দেশ ছেড়ে তিনি পালিয়ে যাননি। ওয়ান ইলেভেনের সময় দেশ ছাড়তে চাপ দেওয়া হলেও তিনি দেশ ছাড়েননি। বরংচ তিনি সেনা সমর্থক সরকারকে বলেছিলেন, দেশে তার অনেক সন্তান, তাই তাদেরকে ছেড়ে তিনি বিদেশ যাবেন না। তিনি আরও বলেন, দেশের বাহিরে আমার কোনো ঠিকানা নাই, এদেশই আমার ঠিকানা' এটাই ছিল তার দেশপ্রেম। গত ১৫ বছরে আওয়ামী লীগের শাসনামলে নানা অন্যায় মামলার শিকার হয়ে টানা ৭ বছর কারাবন্দি জীবন কাটিয়েছেন। তবু খালেদা জিয়া আপোষ করেননি। বাংলাদেশের রাজনীতিতে তিনি পরিচিতি পেয়েছেন আপোষহীন নেত্রী’ হিসেবে। পাশাপাশি জনগনের কাছে বেগম খালেদা জিয়া অপরাজেয় নেত্রী হিসেবে পরিচিত।
১৯৮১ সালের ব্যর্থ অভ্যুত্থানে রাষ্ট্রপতি জিয়ার শাহাদাত বরণের পর, তিনি ১৯৮২ সালের ২ জানুয়ারী সাধারণ সদস্য হিসাবে বিএনপিতে যোগদান করেন। তিনি ১৯৮৩ সালের মার্চ মাসে দলের ভাইস-চেয়ারম্যান নির্বাচিত হন এবং ১৯৮৪ সালের আগস্টে দলের চেয়ারপারসন নির্বাচিত হন।
১৯৮২ সালে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর প্রধান জেনারেল হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের নেতৃত্বে একটি সামরিক অভ্যুত্থানের পর, খালেদা জিয়া গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের জন্য সর্বাত্মক আন্দোলনের সূচনা করেন। তিনি এরশাদের স্বৈরাচারের অবসান ঘটাতে ১৯৮৩ সালে গঠিত সাত দলীয় জোট গঠনের স্থপতি ছিলেন। তিনি ১৯৮৬ সালের কারচুপির নির্বাচনের বিরোধিতা করেন এবং নির্বাচনে অংশগ্রহণ থেকে বিরত থাকেন। যদিও আওয়ামী লীগ, জামায়াতে ইসলামী এবং বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টির (সিপিবি) মত রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বীরা এরশাদের অবৈধ সরকারকে বৈধতা দেয়ার জন্য জাতীয় পার্টির নেতৃত্বাধীন শাসনের অধীনে নির্বাচনে যোগ দিয়েছিল। তার দৃঢ় সংকল্পের কারণে, তাঁকে ১৯৮৩ থেকে ১৯৯০ সাল পর্যন্ত সাতবার আটক করা হয়েছিল । তিনি বিএনপির ছাত্র সংগঠন জাতীয়তাবাদী ছাত্রদলকে শক্তিশালী একটি সংগঠনে পরিণত করেন যার ফলে তারা সারা দেশে ৩২১টি ছাত্র সংসদগুলোর মধ্যে ২৭০টি জয়লাভ করে । এই ছাত্ররা এরশাদের শাসনের পতনের আন্দোলনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিল। ১৯৮০ দশকে এরশাদের সামরিক স্বৈরাচারের বিরুদ্ধে কঠোর বিরোধিতা এবং বাংলাদেশে গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের আন্দোলনে ভূমিকা রাখার কারণে তিনি "আপোষহীন নেত্রী" হিসাবে খ্যাতি অর্জন করেছিলেন।
১৯৯১ সালের ২৭ ফেব্রুয়ারি একটি অবাধ ও সুষ্ঠু সাধারণ নির্বাচনের মাধ্যমে দেশের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী নির্বাচিত হন বেগম জিয়া। তার প্রধানমন্ত্রীত্বকালে বাংলাদেশ সংসদীয় গণতন্ত্রে পরিণত হয়। বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে তার মেয়াদে কিছু বড় অর্থনৈতিক পরিবর্তনের সূচনা হয়েছিল। কর্মসংস্থানের হার ব্যাপকভাবে বৃদ্ধি পায় এই সময় এবং শুধুমাত্র তৈরি পোশাকশিল্প খাতেই পাঁচ বছরে কর্মসংস্থানের বৃদ্ধি ছিল ২৯%। প্রায় ২ লাখ নারী এই সময় তৈরি পোশাকশিল্প খাতে যোগ দেন।
ক্ষমতায় থাকাকালীন, খালেদা জিয়ার সরকার বাধ্যতামূলক বিনামূল্যে প্রাথমিক শিক্ষা, মেয়েদের জন্য দশম শ্রেণী পর্যন্ত বিনামূল্যে শিক্ষা, ছাত্রীদের জন্য একটি শিক্ষা "উপবৃত্তি" এবং শিক্ষা কার্যক্রমের জন্য খাদ্য প্রবর্তন করে শিক্ষা ক্ষেত্রে যথেষ্ট অগ্রগতি করেছিল। তার সরকার সরকারি চাকরিতে প্রবেশের বয়সসীমা ২৭ বছর থেকে বাড়িয়ে ৩০ বছর করে এবং শিক্ষা খাতে সর্বোচ্চ বাজেট বরাদ্দ করেন।
২০১১ সালের ২৪ শে মে নিউ জার্সি স্টেট সিনেটে বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়াকে ’ফাইটার ফর ডেমোক্রেসি’ পদক প্রদান করা হয়। যুক্তরাষ্ট্রের স্টেট সিনেট কর্তৃক কোন বিদেশিকে এ ধরনের সম্মান প্রদানের ঘটনা এটাই ছিল প্রথম।
পরবর্তীতে ২০১৮ সালের ৩১ জুলাই তাকে ‘মাদার অব ডেমোক্রেসি’ সম্মাননা দেয় কানাডিয়ান হিউম্যান রাইটস ইন্টারন্যাশনাল অর্গানাইজেশন (সিএইচআরআইও) নামের একটি সংগঠন। উনার যে দেশপ্রেম তা সত্যিই সকলের কাছে অনুকরনীয় ও শিক্ষনীয়। গতকাল ৩০ ডিসেম্বর,২০২৫ ভোর ৬টায় মৃত্যুর মধ্য দিয়ে এক মহাকাব্যের অবসান হলো। তার এই অপূরনীয় ক্ষতিতে সারা বিশ্ব ও জাতি শোকাহত।
ত্যাগ ও সংগ্রামে ভাস্বর হয়েও, তিনি ছিলেন দেশের সত্যিকারের অভিভাবক; বেগম খালেদা জিয়া এমন একজন আলোকবর্তিকা যাঁর অপরিসীম ভালোবাসা ও দেশপ্রেম যুগ যুগ ধরে বাংলাদেশের গনতন্ত্রের শক্তি ও প্রেরণা যুগাবে। বেগম খালেদা জিয়া ছিলেন ধৈর্য, আভিজাত্য এবং হার না মানার এক অনন্য প্রতীক। প্রতিপক্ষের অমানবিক আচরণের মুখেও অবিচল ছিলেন। এই জাতি আপনাকে গর্বের সঙ্গে স্মরণ করবে। মহান আল্লাহতায়ালা আপনাকে বেহেস্ত নসিব করুন। আমিন।
বেগম খালেদা জিয়া শুধুমাত্র একটি বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের নেত্রীই ছিলেন না; তিনি ছিলেন বাংলাদেশের ১৮ কোটি মানুষের দেশনেত্রী। তিনি থাকবেন চিরদিন আমাদের মাঝে স্মরনীয় ও বরনীয় হয়ে। লেখক: গবেষক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক
সম্পাদক - আশরাফ ইকবাল, নির্বাহী সম্পাদক - বর্ষন মোহাম্মদ
© স্বত্ব সংরক্ষিত © ২০২৬ দৈনিক মুন্সিগঞ্জের বার্তা