
খুনের রাজ্য মুন্সিগঞ্জে আইন কোথায়?
ত্বাইরান আবির
পাহাড়ের ঢেউ নয়, নদীর ঢেউ নয়, খুনের ঢেউ প্রতিদিনই ছুটছে মুন্সিগঞ্জজুড়ে। গত কয়েক বছর ধরে এই জেলার মানুষ এমন এক ভয়াবহ অপরাধের দশা নিয়ে জনজীবন অতিবাহিত করছে, যেখানে সামান্য ঝামেলা থেকে শুরু করে বিরোধিতার এক মুহূর্তেই জীবন শেষ হয়ে যাচ্ছে। স্থানীয় ছয়টি থানার রিপোর্ট, আদালতের রায় ও সাধারণ মানুষকে কেন্দ্র করে স্পষ্ট হয়ে উঠেছে মুন্সিগঞ্জ এখন শুধু একটি জেলা নয়, গতানুগতিক হত্যাকাণ্ডে জড়িত বিচারহীনতার এক ভয়ঙ্কর প্রতিচ্ছবি।
জেলায় যে অপরাধের পরিবেশ তৈরি হয়েছে তা শুধু খুনের সংখ্যা বা ঘটনার মর্মেই সীমাবদ্ধ নেই, মানুষের নিরাপত্তা, আইনের প্রতি বিশ্বাস, সামাজিক স্থিতিশীলতা এবং প্রশাসনিক কর্তৃপক্ষের কার্যকারিতা সবকিছুই প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে পড়েছে। এখানকার সাধারণ মানুষ বলেছেন, 'রোজ রাতে আমরা আতঙ্কে থাকি, জানি না কখন দেখি খুনের সংবাদ।'
সরকার ও পুলিশের তথ্য অনুসারে, বাংলাদেশে ২০২৫ সালে দেশের ১০ মাসে মোট প্রায় ৩,২৩০ টি হত্যাকাণ্ড ঘটেছে, গড়ে প্রতি মাসে প্রায় ৩২৩ টি খুন, যা গত বছরগুলোর তুলনায় উল্লেখযোগ্য হারে বৃদ্ধি দেখাচ্ছে।
মুন্সিগঞ্জে সরকারি পরিসংখ্যান সরাসরি প্রকাশ করা না হলেও অতীতের প্রকাশ্য তথ্যগুলো থেকে বোঝা যায়, জেলায় প্রতি বছর শতাধিক হত্যাকাণ্ডের খবর সংবাদপত্রে শব্দ হচ্ছে।
উদাহরণস্বরূপ, ২০২১ সালের একটি মাত্র ঘটনায় তিনজনকে খুন করা হয় এবং সেই মামলায় অপরাধীদের বিরুদ্ধেই তিনজনকে মৃত্যুদণ্ড এবং পাঁচজনকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছিল।
আরেকটি মামলায়, ২০২০ সালে একজন অটোরিকশা চালককে হত্যা করার জন্য চার জনকে মৃত্যুদণ্ড দেয়া হয়েছে। অন্য ঘটনায় ২০০২ সালের হত্যা মামলায় দশ জনকে যাবজ্জীবন সাজা দেয়া হয়েছে।
এই ডেটাগুলো থেকে বোঝা যায়, মুন্সিগঞ্জে শুধু সাম্প্রতিক ঘটনাই নয়, দীর্ঘদিন ধরেই হত্যার মামলা ও রায় আদালতে উঠেছে। কিন্তু সেই বিচারধারার গতি ও কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন অনেক বেশি।
আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে সবচেয়ে বড় অভিযোগ হলো- সত্যিকারের খুনিরা আইনের আওতায় খুব ধীরে আসছে এবং অনেক হত্যাকাণ্ডের মামলা বিচারের অপেক্ষায় দীর্ঘদিন আটকে পড়েছে।
রফিকুল নামে স্থানীয় এক বাসিন্দা অভিযোগ করেন, 'মামলা যত্ন নিয়ে করা হয় না, পুলিশ প্রমাণ জোগাড়ে ব্যর্থ হয়, আবার অনেকসময় বাদীরাই অভিযোগ করেন মামলার সঙ্গে ব্যবসা চলে, অভিযোগের সঙ্গে অংশীদারিত্ব করা হচ্ছে।' এমন অভিযোগ সম্প্রতি স্থানীয় মিডিয়ায়ও উঠে এসেছে।
ফলে একটি ভয়ঙ্কর পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে- খুনের পর যথাযথ তদন্ত হয় না বলে মনে করা হচ্ছে। যারা হত্যাকাণ্ডে জড়িত তারা ধারালো আইন থেকে বেরিয়ে আসছে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ও বিচার বিভাগের মধ্যে সমন্বয়হীনতা জনমনে সন্দেহ তৈরি করছে।
মুন্সিগঞ্জের মতো জেলার মানুষ আজ আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে শুধু সহায়তায় নয়, নিরাপত্তা গ্যারান্টি দেয় এমন একটি শক্তি হিসেবেও দেখতে চায়, কিন্তু এটি অর্জন কঠিন হয়ে উঠেছে।
পুলিশ জানিয়েছে, বিভিন্ন হত্যাকাণ্ডের পেছনে রাজনৈতিক বিরোধ, ব্যক্তিগত শত্রুতা, জমিজমা ইস্যু, পরিবারিক কলহ ও অন্য আর্থ-সামাজিক কারণগুলো কাজ করছে। তারা বলছে এসব অপরাধ নিরসনে রাউন্ড দ্য ক্লক টাস্কফোর্স তৈরি করা হচ্ছে এবং অভিযান চলছে।
তবে পুলিশের এই ব্যাখ্যা সাধারণ মানুষের মধ্যে বিশ্বাস তৈরি করতে পারছে না। কারণ প্রতিদিন নতুন করে খুনের সংবাদ ফিডে দেখা যাচ্ছে। অধিকাংশ ঘটনায় দ্রুত গ্রেফতার কিংবা প্রমাণভিত্তিক তদন্তের কোনো স্পষ্ট ব্যাখ্যা মেলে না।
এমন পরিস্থিতিতে মানুষের বিভ্রম ও নিরাপত্তাহীনতার অনুভূতি বাড়ছে এবং অনেকেই মনে করছেন, 'আইন নেই, বা ভুল জায়গায় আছে।'
এ বিষয়ে মুন্সিগঞ্জের বাসিন্দারা বলেন, 'দিন রাত আমরা ভয়ে থাকি। এই বুঝি সকাল হলেই নতুন খুনের খবর শুনবো। চাইলেই আমরা নিরাপত্তা নিয়ে রাতে বাইরে দাঁড়াতে পারি না।'
এমন ভয়াবহ পরিস্থিতি মানুষের জীবনে শুধু নিরাপত্তাহীনতা তৈরি করছে না, বরং মানসিক, অর্থনৈতিক ও সামাজিক স্থিতিশীলতাকেও ক্ষতিগ্রস্ত করছে। অনেক সরেজমিনে থাকা ব্যবসায়ী উল্লেখ করেছেন, ব্যবসায়িক কার্যক্রমেও লোক আসছে কম। কারণ ক্ষুদ্র ব্যবসা বন্ধ হয়ে যাচ্ছে নিরাপত্তার অভাবে।
সোহেল নামের এক শিক্ষার্থী বলেছেন, 'আমরা রাতে বাইরেও যেতে ভয় পাই। বাড়ির ইমার্জেন্সি ছাড়া কোথাও যাই না।'
রাহেলা নামের আরেক বয়স্ক মহিলা বলেছেন, 'আমরা এখন মনে করি এই জেলাতেই যদি নিরাপত্তা না থাকে, তাহলে কোথায় নিরাপত্তা হবে?'
এই জনমতকেই অনেক বিশ্লেষক 'সম্ভাব্য সামাজিক উদ্ভ্রান্তি এবং আইনশৃঙ্খলার বড় ধরণের ভাঙন' হিসেবে দেখছেন।
মুন্সিগঞ্জ দীর্ঘদিন ধরে পারস্পরিক বিরোধপূর্ণ রাজনৈতিক ও সামাজিক কাঠামোর অংশ হয়ে এসেছে। এলাকার রাজনৈতিক গোষ্ঠীগুলোর মধ্যে সংঘর্ষ, ক্ষমতার লড়াই, গ্রাম-শহরের ভূমিকা এবং শিক্ষাগত-অর্থনৈতিক বৈষম্যগুলো একত্রিত হয়ে নৃশংস পরিবেশ তৈরি করেছে।
বিশেষজ্ঞরা বলেছেন, রাজনৈতিক সংঘর্ষ ও রাজনৈতিক দলীয় সহিংসতা অনেক খুন-অপরাধের পেছনে কাজ করে। সামাজিক ও আর্থ-সামাজিক বৈষম্য ও পারিবারিক কলহ জীবন-নাশক সংঘর্ষে রূপ নেয়। অর্থনৈতিক কর্মসংস্থানের অভাব, অব্যবস্থাপনা ও সামাজিক সহিংসতার কারণগুলো মিলেমিশে পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তোলে।
এলাকার নীতি-নির্ধারক ও বিশ্লেষকরা মনে করেন, খুনের পেছনে কারণ শুধু ব্যক্তিগত সংঘাতে সীমাবদ্ধ না থেকে সামাজিক কাঠামোর মধ্যে গভীর সমস্যার রূপে কাজ করছে।
মুন্সিগঞ্জে শুধু খুন হচ্ছে না, বরং সামাজিক জীবনের প্রতি ভয় ও অসহায়তার সংস্কৃতি তৈরি হয়েছে। এই সবই সাধারণ আতঙ্কের সমাজ তৈরির লক্ষণ।
আইনজীবীরা বলছেন, বিচার যদি সময়মতো না হয়, জনমনে সেই আইনও অবমূল্যায়িত হবে এবং দু’একটি খুন শুধু নিয়মানুযায়ী বিচার পায়, বাকি বহু ঘটনার বিচার আটকে যায়।
এখানেই মূল সমস্যা দেখা দেয়- আইনের রাজত্ব না থাকলে মানুষ নিজের হাতেই বিচার নেওয়ার পথ খুঁজে নেয়।
বিশ্লেষকদের মতে এসব নির্মূলে যে পথগুলো কাজ করতে পারে দ্রুত, স্বচ্ছ ও প্রমাণভিত্তিক তদন্ত, যাতে খুনিরা দ্রুত আইনের আওতায় আসে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর পুনর্গঠন ও দক্ষতা বৃদ্ধির উদ্যোগ। সামাজিক সচেতনতা, বিরোধ নিষ্পত্তি ও শান্তি কমিটি যেকোনো সংঘর্ষ দ্রুত নিবারণ করতে পারে। স্থানীয় প্রশাসনের সাথে জনগণের সমন্বয়, যাতে স্থানীয় স্তরে সম্পর্ক বাড়ে।
সমাজবিজ্ঞানীরা বলছেন, 'আইনের মধ্যে যদি সচেতনতা না থাকে এবং আইন যদি তার কাজ করাতে ব্যর্থ হয়, তাহলে সেই আইন কোনো নিরাপত্তা দিতে পারে না।'
মুন্সিগঞ্জ আজ সংকট আকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতির মুখোমুখি, যেখানে হত্যা একসময় বিস্ময়ের ঘটনা ছিল, এখন তা দৈনন্দিন সংবাদে পরিণত হয়েছে। বিচারহীনতা, ধীরগতি, নিরাপত্তার অভাব, জনমনের অসন্তোষ সবমিলিয়ে একটি ভয়াবহ অস্থিরতা তৈরি হচ্ছে।
এখন প্রশ্ন হলো, মুন্সিগঞ্জ কি আবার শান্তির, আইনের, ন্যায়ের জায়গায় ফিরে আসবে নাকি জীবনের নিরাপত্তাহীনতা নতুন স্বাভাবিক বাস্তবতায় পরিণত হয়ে যাবে?
উত্তর হয়তো খুব সহজ নয়। কিন্তু একটি জিনিস স্পষ্ট, বর্তমান পরিস্থিতি কোনোভাবে স্থায়ীভাবে অব্যাহত থাকতে পারে না। রাজনৈতিক দল, প্রশাসন ও সাধারণ মানুষের উদ্যোগ ছাড়া এই শহর আবার শান্তি ফিরে পাবে না।
সম্পাদক - আশরাফ ইকবাল, নির্বাহী সম্পাদক - বর্ষন মোহাম্মদ
© স্বত্ব সংরক্ষিত © ২০২৬ দৈনিক মুন্সিগঞ্জের বার্তা