
রাজনীতিতে বড়, উন্নয়নে ছোট জেলা
ত্বাইরান আবির
পদ্মা, ধলেশ্বরী ও মেঘনার তীরঘেরা মুন্সিগঞ্জ একসময় নদী বাণিজ্যের গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র ছিল। প্রাচীন বিক্রমপুরের ঐতিহ্য ও সংস্কৃতি নিয়ে গড়ে ওঠা এই জেলার মানুষের আত্মপরিচয়ও ভিন্ন- ঐতিহ্যের গর্বে ভরপুর, কিন্তু উন্নয়ন সূচকে পিছিয়ে। রাজধানীর সাথে হাতে-গোনা কিলোমিটারের দূরত্ব হয়েও জেলায় শিল্প-বিনিয়োগ, স্বাস্থ্য-শিক্ষা, পর্যটন ও কৃষি-প্রক্রিয়াজাত শিল্পের কাঠামো গড়ে ওঠেনি উল্লেখযোগ্য হারে। এমন বাস্তবতায় স্থানীয়দের প্রশ্ন, ঢাকার পাশের জেলা হয়েও এতো সুযোগ হাতছাড়া কেন?
জেলার উন্নয়ন নিয়ে এই প্রশ্ন আজকাল সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম থেকে শুরু করে রাজনৈতিক সভা, জনমত জরিপ, ব্যবসায়ী মহল, শহর-গ্রাম সব জায়গাতেই আলোচিত হচ্ছে।
সরকারি হিসাবে গত ১০ বছরে মুন্সিগঞ্জে প্রায় ২২-২৫ টি অবকাঠামো ও সংযোগ-ভিত্তিক প্রকল্প বাস্তবায়ন হয়েছে। এর মধ্যে সবচেয়ে বড় হচ্ছে পদ্মা সেতু। মাওয়া-জাজিরা সংযোগ, এক্সপ্রেসওয়ে, নৌবন্দর ও ভাঙনরোধ প্রকল্প, উপজেলা-স্তরের রাস্তা-সেতু সবমিলিয়ে জেলা যোগাযোগে বদল এসেছে।
তবে জনমত বলছে, এগুলো হলো ‘ট্রানজিট ডেভেলপমেন্ট। অর্থাৎ, এসব করা হয়েছে ঢাকার সাথে সংযোগ ও জাতীয় অর্থনীতির জন্য। কিন্তু জেলায় স্থানীয় অর্থনীতি, চাকরি বা শিল্প-উৎপাদন কাঠামো গড়ার দিকে নজর কম। ফলে উন্নয়নের সুফল আংশিক ও অসমভাবে বিতরণ হয়েছে।
এ ব্যাপারে মাসুম নামের একজন স্থানীয় ব্যবসায়ী মন্তব্য করেন, 'পদ্মা সেতু হয়ে দেশের উন্নয়ন হলো, কিন্তু মুন্সিগঞ্জে শিল্প হলো কোথায়?'
মুন্সিগঞ্জের সর্ববৃহৎ বাস্তবতা ঢাকার সাথে তার অনিবার্য সংযোগ। প্রতিদিন হাজারো মানুষ গজারিয়া, সিরাজদিখান, লৌহজং ও সদর থেকে ঢাকায় কাজ করতে যান। চাকরি, চিকিৎসা, শিক্ষা, বাজার, বিনোদন সবক্ষেত্রে ঢাকার ওপর নির্ভরতা এত বেশি যে মুন্সিগঞ্জ এক অর্থে রাজধানীর এক্সটেন্ডেড শহর।
এ নির্ভরতা আবার উন্নয়নের বাধাও। স্থানীয়ভাবে শিল্প গড়ে না ওঠায় ঢাকার কোল ঘেঁষে বসতি ও বাণিজ্য ছড়িয়ে পড়লেও অর্থনৈতিক গতিশীলতা জেলা-ভিত্তিক হয়নি।
এক্ষেত্রে ব্যবসায়ী সংগঠনগুলোর মতে তিনটি বড় বাধা-
১। জমির দাম (ঢাকার কারণে অস্বাভাবিক উঁচু)
২। পরিবেশগত নিয়ম (নদী বেষ্টিত এলাকা)
৩। অর্থনৈতিক জোনের অভাব
ফলে উদ্যোক্তারা নারায়ণগঞ্জ-গাজীপুর-ঢাকার দিকে ঝুঁকেন। উদাহরণস্বরূপ, গাজীপুরে ৮০% পোশাক রপ্তানি কারখানা, নারায়ণগঞ্জে টেক্সটাইল ও ডাইং হাব, সাভারে ট্যানারি স্থানান্তর সবমিলিয়ে গঠন হয়েছে শিল্প ক্লাস্টার, কিন্তু মুন্সিগঞ্জে এমন কোনো ক্লাস্টার নেই।
এখানে শিল্প থাকলেও সেটা বিক্ষিপ্ত। নৌবন্দর, ড্রেজিং, ছোট-মাঝারি খাদ্য প্রক্রিয়াজাত শিল্প, গার্মেন্টস ও প্লাস্টিক, কনস্ট্রাকশন ম্যাটেরিয়াল- এসব জেলা অর্থনীতিকে বড় স্কেলে বদলানোর মতো গতি আনতে পারেনি।
জেলায় প্রতি বছর প্রায় হাজার হাজার শিক্ষার্থী এইচএসসি, গ্রাজুয়েট পর্যায় শেষ করেন। কিন্তু স্থানীয় চাকরি তৈরি হয় তার কিয়দংশেরও কম। ফলে তিনটি ধারা তৈরি হয়েছে-
১। ঢাকায় চাকরি
২। বিদেশে (গাল্ফ/মালয়েশিয়া/ইউরোপ) শ্রমবাজার
৩। গ্রামে ক্ষুদ্র ব্যবসা
যাদের সামর্থ্য আছে তারা ঢাকায় ভাড়া বাড়ি নেন, বাকি অংশ প্রতিদিন যাতায়াত করেন। এর ফলে জেলা থেকে মানবসম্পদ বেরিয়ে যায়, কিন্তু ফেরত আসে না। একে অর্থনীতিতে বলে ‘ব্রেইন ওয়ার্কফোর্স ড্রেইন।’
মুন্সিগঞ্জ আলু উৎপাদনের জন্য বিখ্যাত। বছরে প্রায় কয়েক লাখ টন আলু উৎপাদন হয়। এছাড়া ধান, পাট, সবজি ও মাছ সবই উল্লেখযোগ্য। কিন্তু সমস্যা একটাই- প্রক্রিয়াজাত শিল্প নেই, ফলে উৎপাদনশীলতা নগদ অর্থে রূপান্তর কম।
এ ব্যাপারে কৃষক মনি মিয়া বলেন, 'মুন্সিগঞ্জ থেকে আলু যায় ঢাকায়, আবার ঢাকার কোম্পানি সেটা প্যাকেট করে বিক্রি করে। তাহলে সমস্ত লাভ কে পায়? তারাই।'
এদিকে সদর হাসপাতাল ও উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সগুলো কাগজে কলমে পরিপূর্ণ মনে হলেও সেবা সীমিত। বিশেষজ্ঞ ডাক্তার, আইসিইউ, ল্যাব, শল্যচিকিৎসা এমন সেবাগুলো রাজধানীর ওপর নির্ভরশীল।
আবার শিক্ষা খাতে সরকারি কলেজ আছে, বেসরকারি কলেজ আছে, বিশ্ববিদ্যালয় নেই, কারিগরি শিক্ষার সুযোগ কম। ফলে ডাক্তার-ইঞ্জিনিয়ার-বিশেষজ্ঞ তৈরি হলেও তারা ঢাকায় চলে যায়, জেলায় থাকে না।
মুন্সিগঞ্জ পৌরসভা ও বিভিন্ন উপজেলা শহরে রয়েছে ড্রেনেজ সমস্যা, জলাবদ্ধতা, বর্জ্য সংকট, সড়ক খারাপ, বাজার ব্যবস্থাপনা অগোছালো, নৌ যাতায়াত ঝুঁকিপূর্ণ। সদরের রাস্তাঘাট উন্নত হলেও বেশিরভাগই জেলা বা উপজেলা পর্যায়ে থেমে আছে।
প্রশ্ন হচ্ছে, ঢাকার পাশের বাকি দুই জেলা নারায়ণগঞ্জ-গাজীপুর কেন এগিয়ে? তিন জেলার ভূগোল প্রায় সমান, কিন্তু সূচক বলছে নারায়ণগঞ্জ ও গাজীপুর মুন্সিগঞ্জের চেয়ে শিল্প, রাজস্ব, শ্রমবাজার, অর্থনৈতিক জোন, স্বাস্থ্য, শিক্ষা, সাধারণ চাকরির সুযোগ সবদিক থেকে এগিয়ে। এই তুলনা জনমতের প্রশ্নকে আরও প্রবল করে।
পর্যটনের ক্ষেত্রে বলা যায়, ইদ্রাকপুর কেল্লা, বিক্রমপুরের প্রাচীন সব ঐতিহ্য, মাওয়া ঘাট, নদীপথ, চরাঞ্চল সবই পর্যটন খাতের জন্য মূল্যবান।
কিন্তু এখানে নেই পর্যটন মানচিত্র, নেই ব্র্যান্ডিং, নেই গাইড সার্ভিস, নেই হোটেল-রিসোর্ট চেইন, নেই সরকারি মাস্টারপ্ল্যান। পদ্মা সেতুর পরে পর্যটক আসা বাড়লেও সেটি ‘ডে ট্যুরিজম’। অর্থাৎ, অর্থ এই জেলায় থেকে যায় না।
মুন্সিগঞ্জ জাতীয় রাজনীতিতে সবসময় গুরুত্বপূর্ণ জেলা। কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব, মন্ত্রী পর্যায়, রাজনৈতিক প্রভাব সবই আছে। তবুও উন্নয়ন আটকে থাকে কিছু কারণে-
১। দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার অভাব
২। লোকাল-জাতীয় রাজনীতি দ্বন্দ্ব
৩। প্রশাসনিক সমন্বয়হীনতা
৪। অর্থনৈতিক লক্ষ্য নির্ধারণ না করা
বিশেষজ্ঞরা বলেন, 'এখানে করা হয় ইনফ্রা-প্রজেক্ট উন্নয়ন, কিন্তু ইকোনমিক রেজাল্ট আসে নীতি ও পরিকল্পনা থেকে।'
স্থায়ী উন্নয়নের চাহিদা পাঁচ খাতে কেন্দ্রীভূত-
১। শিল্প-অর্থনীতি
২। চাকরি
৩। স্বাস্থ্য
৪। শিক্ষা
৫। পর্যটন-ঐতিহ্য
এছাড়াও তরুণদের মধ্যে আরও স্পষ্ট দাবি, ঢাকা নয়, মুন্সিগঞ্জেই সুযোগ চাই।
বিশেষজ্ঞদের মতে পাঁচটি পদক্ষেপ নিলে মুন্সিগঞ্জ বদলে যেতে পারে-
১। ইকোনমিক জোন / ইন্ডাস্ট্রিয়াল হাব
২। কারিগরি বিশ্ববিদ্যালয় বা টেকনিক্যাল ইনস্টিটিউট
৩। অ্যাগ্রো-প্রসেসিং ক্লাস্টার
৪। পর্যটন মাস্টারপ্ল্যান
৫। স্বাস্থ্য অবকাঠামো উন্নয়ন
এছাড়া পদ্মা সেতুর লজিস্টিক সুবিধা কাজে লাগিয়ে দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের ট্রেড রুট নিয়ন্ত্রণ করতে পারে মুন্সিগঞ্জ।
মুন্সিগঞ্জের উন্নয়ন আলোচনায় সবচেয়ে বড় বাক্য- ঢাকার পাশে থেকে ঢাকার ওপর নির্ভরতা কমানো।
অর্থনীতি, সংস্কৃতি, শ্রমবাজার, বিনিয়োগ, শিক্ষা ও নাগরিক সুবিধা এই সবগুলো যদি স্থানীয়ভাবে শক্তিশালী হয়, তবে মুন্সিগঞ্জ আর ‘ট্রানজিট জেলা’ থাকবে না, হবে অর্থনৈতিক জেলা।
জেলার মানুষের প্রত্যাশা তাই সরল- উন্নয়ন চাই, তবে জীবনমানের উন্নয়ন।
সম্পাদক - আশরাফ ইকবাল, নির্বাহী সম্পাদক - বর্ষন মোহাম্মদ
© স্বত্ব সংরক্ষিত © ২০২৬ দৈনিক মুন্সিগঞ্জের বার্তা