সম্পাদকীয়
শিল্পের পৃথিবীতে অনেক সংগ্রাম দৃশ্যমান হয় না। কিছু লড়াই চলে নিঃশব্দে, প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে, সময়ের আড়ালে। তা হয়তো ক্ষমতা, অর্থ বা রাজনৈতিক প্রভাবের জন্য নয়—বরং সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য, মানুষের জীবন ও শিল্পবোধকে বাঁচিয়ে রাখার জন্য। মুন্সিগঞ্জের কালিন্দীপাড়ার আচার্য পরিবার সেই নিরব সংগ্রামের জীবন্ত সাক্ষী। চারশ বছরেরও বেশি সময় ধরে তারা বাংলার পটচিত্রের ঐতিহ্য সংরক্ষণ, রক্ষণা-বেক্ষণ এবং সমৃদ্ধ করতে কাজ করে চলেছে।
পটচিত্র বাংলার অন্যতম প্রাচীন লোকচিত্রের একটি। প্রাতিষ্ঠানিক শিল্পরীতির আগেও মানুষ তার জীবন, বিশ্বাস এবং কল্পনাকে পটে ফুটিয়ে তুলত। চিত্রগুলো কখনো একক চৌকো পট, কখনো দীর্ঘ আখ্যানভিত্তিক দীর্ঘপট। বৌদ্ধ, হিন্দু ও লোকবিশ্বাসের মেলবন্ধনে গড়ে ওঠা এই শিল্প ছিল মানুষের জীবনদর্শন প্রকাশের প্রধান মাধ্যম। কালিঘাটের পটচিত্র কলকাতায় হারিয়ে গেলেও বাংলাদেশের আচার্য পরিবার এই শিল্পকে বংশপরম্পরায় টিকিয়ে রেখেছে।
বর্তমান প্রজন্মের কাণ্ডারি শম্ভু আচার্য্য এই ধারার নবম প্রতিনিধি। তার কাজ শুধু চিত্রায়ন নয়; তা প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে চলা নিষ্ঠার, অধ্যবসায়ের এবং পারিবারিক ঐতিহ্যের প্রতিফলন। তিনি দেশীয় উপকরণ—ইটের গুঁড়া, তেঁতুলবিচির আঠা, ডিমের কুসুম, গাছের রস, এলা মাটি, গুপি মাটি, রাজা নীল, সিঁদুর ও অন্যান্য প্রাকৃতিক রঙ—ব্যবহার করে ক্যানভাসে পটচিত্র আঁকেন। এই রঙ ও উপকরণে ফুটে ওঠে কৃষক, জেলে, তাঁতী, দিনমজুর নারীশ্রমিক, নাগরিক জীবন, পৌরাণিক কাহিনি এবং সমসাময়িক বাস্তবতা। তার আঁকা প্রতিটি ছবি নিঃসন্দেহে একটি জীবন্ত ইতিহাস, যা মানুষের জীবন ও বিশ্বাসের নানা দিক তুলে ধরে।
শিল্পী শম্ভু আচার্য্যের কাজ শুধু চিত্র নয়; তা প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে চলা নিবেদিত সাধনার ফল। তার পটচিত্র ব্রিটিশ মিউজিয়াম, সাংহাই মিউজিয়াম, জাপান ও ইন্দোনেশিয়ার বিভিন্ন জাদুঘরে স্থান পেয়েছে। এটি শুধুই আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি নয়, বরং সেই দীর্ঘ নিরব লড়াইয়ের সাক্ষ্য, যা চোখে দেখা যায় না।
এই দীর্ঘ সংগ্রাম প্রমাণ করে—শিল্প টিকে থাকে শিল্পীর সাধনা ও নিষ্ঠায়। সাধারণ দর্শক শুধু রঙ ও চিত্রের সৌন্দর্যে মুগ্ধ হয়, কিন্তু পটচিত্রের পেছনের অধ্যবসায়, শৈল্পিক অধ্যয়ন এবং প্রজন্মের সংরক্ষণ কমিই বোঝে। মুন্সিগঞ্জের আচার্য পরিবার ও শম্ভু আচার্য্য সেই নিরব লড়াইয়ের এক জীবন্ত ইতিহাস। তাদের নিষ্ঠা ও অধ্যবসায়ের কারণেই বাংলা লোকচিত্রের গৌরবময় ঐতিহ্য আজও টিকে আছে।
শিল্পী ও তার ঐতিহ্যের প্রতি সম্মান প্রদর্শন, সচেতনতা এবং সমর্থন—এটাই আমাদের সামাজিক দায়িত্ব। কারণ যে লড়াই চোখে না দেখেও ইতিহাস সৃষ্টি করে, সেই সংগ্রামই সত্যিকারের মূল্যবান। মুন্সিগঞ্জের আচার্য পরিবারের গল্প আমাদের শেখায়, যে কোনো শিল্পকর্মের সৌন্দর্য শুধু চোখে দেখা নয়; তার পেছনের অধ্যবসায়, সাধনা ও প্রজন্মের সংরক্ষণই প্রকৃত মূল্য।
পটচিত্র শুধু রঙের খেলা নয়; এটি বাংলার ইতিহাস, মানুষের জীবন এবং বিশ্বাসের এক জীবনন্ত রূপ। শম্ভু আচার্য্য ও আচার্য পরিবারের প্রতি আমাদের শ্রদ্ধা সেই নিরব সংগ্রামের প্রতি সম্মান প্রদর্শনের একমাত্র পথ। এই গল্প শুধু শিল্পপ্রেমীদের জন্য নয়—সামাজের প্রতিটি মানুষকে স্মরণ করিয়ে দেয়, যে সংস্কৃতি ও ঐতিহ্য রক্ষা করা মানে মানুষের আত্মপরিচয়কে বাঁচানো।
সম্পাদক - আশরাফ ইকবাল, নির্বাহী সম্পাদক - বর্ষন মোহাম্মদ
© স্বত্ব সংরক্ষিত © ২০২৬ দৈনিক মুন্সিগঞ্জের বার্তা