মুন্সিগঞ্জ-২
গোলাম মঞ্জুরে মাওলা অপু
১২ ফেব্রুয়ারীতে নির্বাচনের দিনক্ষণ ঘনিয়ে আসার সাথে সাথে ক্রমশ:সরব হয়ে উঠেছে মুন্সীগঞ্জ-২ তথা লৌহজং-টঙ্গিবাড়ী নির্বাচনী এলাকায় ভোটের প্রত্যাশায় প্রার্থীদের ব্যস্ত ছুটে চলা।এ নির্বাচনকে ঘিরে প্রতীক বরাদ্দের পরদিন থেকেই সারাদেশের মতো রাজধানীর পার্শ্ববর্তী এ জেলার ভোটারদের মাঝে বিরাজ করছে ব্যাপক উৎসাহ-উদ্দীপনা।বিগত বহু বছরের ইতিহাস-ঐতিহ্য আর সংস্কৃতি নিয়ে গড়ে ওঠা বিস্তীর্ণ পদ্মাঘেঁষা এই জনপদ।মৎস ও কৃষিপ্রধান এ অঞ্চলে রয়েছে বিভিন্ন শ্রেণীর পেশাজীবিদের নানা চাওয়া-পাওয়া।একইসাথে দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের অন্যতম প্রবেশদ্বারখ্যাত প্রাচীণ এই জনপদে পদ্মা সেতু ডানা মেলে তুলে ধরায় এখানে আধুনিক একটি নৌবন্দরসহ পর্যটন বিকাশে অপার সম্ভাবনাকে ঘিরে গুরুত্ব বেড়েছে এ অঞ্চলের।তাই এবারের হিসেব নিকেশকে একটু ভিন্ন চোখে দেখছেন এ অঞ্চলের সাধারণ ভোটারগণ।এতে করে আগামীর কান্ডারী নির্বাচিত করতে ভোটারদের আগ্রহ যেনো বেড়েই চলেছে।
লৌহজং ও টংগিবাড়ী উপজেলার ২৩টি ইউনিয়ন নিয়ে গঠিত মুন্সীগঞ্জ-২ সংসদীয় আসন নং ১৭২।বাংলাদেশ নির্বাচন কমিশনের (ইসি) হালনাগাদ (জানুয়ারি-২০২৬) তথ্য অনুযায়ী এ আসনে মোট ভোটার সংখ্যা ৩লাখ ৭৮হাজার ৪৯২ জন। এর মধ্যে পুরুষ ভোটার: ১লাখ ৯৪হাজার ৭২০ জন।নারী ভোটার: ১লাখ ৮৩হাজার৭৭২ জন এবং হিজড়া ভোটার নেই।
তফসিল ঘোষণার পর এ আসনে জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অংশ নিতে দাখিল করা মোট ৭ জন প্রার্থী মনোনয়নপত্র বৈধ ঘোষণা করা হলেও জামায়াত-এনসিপিসহ ১১টি দল জোট করায় শরীক দলের বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর অধ্যাপক এ বি এম ফজলুল করিম ও বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের মো. আমিনুল ইসলামসহ মোট দু’জন প্রার্থী মনোনয়ন প্রত্যাহার করে নেন।এতে করে নির্বাচনকে সামনে রেখে এ আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতায় রয়েছেন মোট ৫জন প্রার্থী।এ আসনে বিএনপির প্রার্থী অ্যাডভোকেট আব্দুস সালাম আজাদ (ধানের শীষ), জামায়াতে ইসলামী সমর্থিত ১১ দলীয় জোটের মনোনীত এনসিপির প্রার্থী মো: মাজেদুল ইসলাম (শাপলা কলি), ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের প্রার্থী কে এম বিল্লাল (হাতপাখা),জাতীয় পার্টির মো. নোমান মিয়া (লাঙ্গল) ও ইসলামিক ফ্রন্ট বাংলাদেশের প্রার্থী আশিক মাহমুদ (চেয়ার) নির্বাচন করছেন।
এখানে বিএনপির কোনো স্বতন্ত্র বা বিদ্রোহী প্রার্থী না থাকায় দলীয় প্রার্থী কেন্দ্রীয় যুগ্ম মহাসচিব আব্দুস সালাম আজাদ বেশ ভালো অবস্থান নিয়ে জোড়ালোভাবেই প্রচার-প্রচারণা চালাচ্ছেন।এ আসনে বিএনপি প্রার্থীর প্রতিপক্ষ ১১দলীয় জোটের এনসিপির প্রার্থী মাজেদুল ইসলামও মাঠে সরব রয়েছেন।ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের মনোনীত প্রার্থী কে. এম. বিল্লাল হোসাইন নির্বাচনী প্রচারণা ও গণসংযোগ চালিয়ে যাচ্ছেন।একইসাথে গণসংযোগ চালিয়ে বাড়ি বাড়ি গিয়ে ভোট চাইছেন জাতীয় পার্টির প্রার্থী নোমান মিয়া।তবে গণসংযোগ,উঠান বৈঠক,পথসভার পাশাপাশি লিফলেট বিতরণসহ বাড়ী বাড়ী গিয়ে প্রায় প্রতিদিনই ভোটের মাঠ চষে বেড়াচ্ছেন এসব প্রার্থীগণ।গণসংযোগকালে সাধারণ মানুষের সঙ্গে কুশল বিনিময় করে প্রার্থীরা তাদের নিজ নিজ প্রতীকে ভোট ও সমর্থন কামনা করে চলেছেন।তুলে ধরছেন নানা উন্নয়ণ পরিকল্পনা ও প্রতিশ্রুতির কথা।
নির্বাচন প্রসঙ্গে বিএনপি দলীয় প্রার্থী কেন্দ্রীয় যুগ্ম মহাবসচিব আব্দুস সালাম আজাদ বলেন, আমি আশাবাদী, ইনশাআল্লাহ। জনগণ আমাকে ফিরিয়ে দিবে না।কেননা গণতন্ত্রের জন্য বিগত ১৭ বছর আন্দোলন-সংগ্রামে সক্রিয় থেকে মামলা-কারাবরণের পরও এলাকার জনগণের পাশে আমার উপস্থিতি ছিলো। দীর্ঘদিন ধরে সবসময় জনগণের সাথে সম্পৃক্ত ছিলাম। এখানে বিক্রমপুরের জনপদ রক্ষায় পদ্মার তীরে একটি স্থায়ী বেরিবাঁধ,স্বাস্থ্য ব্যবস্থার উন্নয়নের জন্য একটি উন্নত মানের হাসপাতাল, শিক্ষা ব্যবস্থার মান বাড়াতে একটি বিশ্ববিদ্যালয়, স্কুল-কলেজ, মসজিদ-মাদরাসা করার স্বপ্ন রয়েছে। এগুলো এখানে করতে পারলে এ অঞ্চলের মানুষের পাশাপাশি দক্ষিণাঞ্চলের মানুষও উপকৃত হবেন। এছাড়া সন্ত্রাস মুক্ত, মাদক মুক্ত সমাজ গঠনে ও এলাকার উন্নয়নের জন্য জনগণের মাধ্যমে জাতীয় সংসদে গেলে জনগণের প্রত্যাশা পূরণে আমি আমার ভুমিকা রাখতে পারবো।
১১ দলীয় জোটের এনসিপির প্রার্থী মোঃ মাজেদুল ইসলাম বলেন,আগের গতানুগতিক রাজনৈতিক ধারার ওপর এখন আর মানুষের আস্থা নেই।আমরা বিশ্বাস করি নতুনরাই পারবে দেশটাকে নতুন করে সাজাতে।সবাই আমাদের স্বাগত জানাচ্ছে।আমি নির্বাচিত হলে লৌহজং ও টঙ্গীবাড়ী এলাকার রাস্তা-ঘাট উন্নয়নসহ মাদকমুক্ত একটি সমাজ এবং পদ্মার ভাঙ্গন রোধে বেরিবাঁধ, শিক্ষা ব্যবস্থা ও স্বাস্থ্যসেবার মানোন্নয়নসহ অন্যান্য বিষয়গুলো নিয়ে কাজ করবো ইনশাআল্লাহ।পাশাপাশি মানুষের মৌলিক অধিকার নিশ্চিত করতে কাজ করবো।মুন্সীগঞ্জ একটি কৃষিপ্রধান এলাকা।কৃষক যেন তার উৎপাদিত পণ্যের ন্যায্য মূল্য পায়, সে লক্ষ্যে আমরা কাজ করবো।তাই মানুষের আকাঙ্খার প্রতিফলনের মাধ্যমে যে পরিবর্তন হয়েছে সেটি ধরে রাখতে জনগণের সমর্থন আমরা চাচ্ছি।
ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের মনোনীত সংসদ সদস্য প্রার্থী কে. এম. বিল্লাল হোসাইন বলেন,আমি জনগণের খেদমতে জনগণের খাদেম হিসেবে থাকতে চাই।সব ইচ্ছাই আল্øাহ তালার।দেশের মানুষের ন্যায্য অধিকার নিশ্চিত করতে ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ একটি কল্যাণরাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে কাজ করছে। তাই দুর্নীতি, সন্ত্রাস ও বৈষম্য মুক্ত শান্তিপূর্ণ সমাজ গঠনে জনগণকে সাথে নিয়ে জণগণের কল্যাণে কাজ করবো,ইনশাল্লাহ।
জাতীয় পার্টির কেন্দ্রীয় কমিটির ভাইস চেয়ারম্যান ও দলের মনোনীত প্রার্থী মো. নোমান মিয়া বলেন,দীর্ঘদিন থেকেই নির্বাচনী এলাকায় জনগণের সাথে আমার সম্পৃক্ততা রয়েছে।জনগণের কাছে যাচ্ছি,জনগণের সমর্থন ও ভালোবাসা পেলে এলাকায় সন্ত্রাস নির্মূল,মাদকমুক্ত সমাজ গঠনসহ এলাকার সার্বিক উন্নয়ন ও জনস্বার্থে কাজ করে যাবো।
বিগত সময়ে বিএনপির দুর্গখ্যাত জেলার এ আসনে সবসময় লড়াই হয়েছে ধানের শীষ ও নৌকা প্রতীকের মধ্যে।১৯৯১ সালের পঞ্চম জাতীয় সংসদ নির্বাচন থেকে অষ্টম জাতীয় সংসদ নির্বাচন পর্যন্ত বারবার বিএনপি প্রার্থী এ আসনে জয়লাভ করে।বিএনপি প্রার্থী হিসেবে মিজানুর রহমান সিনহা এ আসন থেকে ১৯৯৬ ও ২০০১ সালে পরপর দু’বার জাতীয় সংসদ নির্বাচিত হন।পরে ২০০৮ সালের নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে আওয়ামীলীগ প্রার্থীর কাছে পরাজিত হন।
সব মিলিয়ে আসন্ন নির্বাচনকে ঘিরে বিএনপি এখানে হারানো দুর্গ পুনরুদ্ধারে সচেষ্ট থাকলেও মূল প্রতিদ্বন্দ্বি হিসেবে জোটের এনসিপি প্রার্থী নিজ গতিতে ভোটের মাঠে প্রভাব ফেলতে চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন।তবে তরুণ প্রজন্মসহ সচেতন ভোটারদের কেউ কেউ দলীয় প্রতীকে নয়,ব্যক্তি হিসেবে প্রার্থীদের নিজস্ব ইমেজকেই বড় ফ্যাক্টর বলে মনে করছেন।অন্যদিকে গতানুগতিক ধারার বাইরে এসে পরিবর্তনের আভাসকে প্রাধান্য দেয়ার চিন্তাভাবনায় রয়েছেন কেউ কেউ।এছাড়াও স্থানীয় নানা ইস্যুসহ প্রতিশ্রুত উন্নয়ণ পরিকল্পনার কতটা বাস্তবায়ণ হতে পারে,সেসব প্রশ্নও মনে টেনে আনছেন সাধারণ ভোটাররা।এতে করে জামায়াত-এনসিপি সমর্থিত ১১দলীয় জোট ভোটের হিসেব-নিকাশে অনেকটাই নতুন মেরুকরণের সম্ভাবনা দেখা দিতে পারে বলে মনে করা হচ্ছে।
২.
সম্পাদক - আশরাফ ইকবাল, নির্বাহী সম্পাদক - বর্ষন মোহাম্মদ
© স্বত্ব সংরক্ষিত © ২০২৬ দৈনিক মুন্সিগঞ্জের বার্তা