
গণমাধ্যমে হাইলাইটিংয়ে বাড়ছে অসম প্রতিযোগিতা
ত্বাইরান আবির
দেশে নির্বাচনী উত্তাপ যতই বাড়ছে, রাজনৈতিক অঙ্গনে দেখা যাচ্ছে আরও ঘন ঘন একটি দৃশ্য- প্রচারের সব আলো যেন কেন্দ্রীভূত হয়ে আছে কেবল বড় রাজনৈতিক দলগুলোর ওপর। জাতীয় পর্যায়ের দলগুলো একের পর এক শোডাউন, র্যালি, প্রতিশ্রুতিমূলক ম্যানিফেস্টো, নীতিগত বক্তব্য, টকশো উপস্থিতি ও সোশ্যাল মিডিয়া প্রচারণায় ব্যস্ত। তাদের প্রতিটি পদক্ষেপ ও প্রতিটি মন্তব্য নিউজরুম থেকে সোশ্যাল প্ল্যাটফর্ম পর্যন্ত কভারেজ পেয়েই যাচ্ছে স্বাভাবিকভাবে।
কিন্তু একই সময়ে ছোট ছোট রাজনৈতিক দলগুলো পর্যাপ্ত জায়গা পাচ্ছে না গণমাধ্যমে। তাদের প্রচার সামান্য, সীমিত। এমনকি কেউ কেউ কেউ অভিযোগ করছে, গণমাধ্যমে না থাকার কারণে জনগণের কাছে তাদের অবস্থান, দাবি এবং রাজনৈতিক প্রস্তাব পৌঁছানোর পথই ক্রমে সংকুচিত হয়ে পড়ছে। ফলে নির্বাচনে রাজনীতির স্বাভাবিক প্রতিযোগিতা একরকম অসম হয়ে উঠছে।
গণমাধ্যমের কনটেন্ট ও নিউজ ভ্যালু নির্ধারণে সিগনিফিক্যান্স, ইনফ্লুয়েন্স ও ইন্টারেস্ট এর মতো মানদণ্ড সবসময়ই গুরুত্বপূর্ণ। যেখানেই জনস্বার্থ বেশি, সেখানেই খবর বেশি, এটাই স্বাভাবিক। বড় দলগুলোর ভোট ব্যাংক, ক্ষমতার ইতিহাস, নেতৃত্বের জনপ্রিয়তা এবং জাতীয় পরিসরে নীতি প্রণয়ন ক্ষমতা থাকায় তাদেরই নিউজ ভ্যালু প্রাকৃতিকভাবে বেশি বিবেচিত হয়।
একই সাংবাদিকতা কাঠামোর মধ্যে ছোট দলগুলো কম গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে ধরা পড়ায় তাদের পক্ষ থেকে প্রচারের মাঠ হারানো শুধু গণমাধ্যমের সিদ্ধান্ত নয়, বরং রাজনৈতিক বাস্তবতার প্রতিফলনও। কিন্তু এই বাস্তবতা নির্বাচনী প্রতিযোগিতায় ন্যায্যতা ও সমতার আলোচনাকে আরও গুরুত্বপূর্ণ করেছে।
এ ব্যাপারে একজন নির্বাচন বিশ্লেষক বললেন, 'প্রচার মানেই শুধু বড় বড় প্রতিশ্রুতি নয়, এটি ভোটারদের দৃষ্টি আকর্ষণের মনস্তাত্ত্বিক ও প্রযুক্তিগত প্রক্রিয়া। যাদের কাছে বেশি অর্থ, বড় কাঠামো, পেশাদার ক্যাম্পেইন টিম এবং মিডিয়া কভারেজ আছে, তারা এই খেলায় অনেক এগিয়ে থাকে।'
বড় দলগুলোর প্রচারে থাকে বাজেট ও পরিকল্পনা, প্রফেশনাল স্ট্রাটেজি টিম, ডেটা অ্যানালিটিক্স, সোশ্যাল মিডিয়া মেশিনারি, মিডিয়া ফ্রেন্ডলিনেস, অভিজ্ঞ ক্যাডার কাঠামো। অন্যদিকে ছোট দলগুলোর থাকে সীমিত অর্থ, স্থানীয়/ব্যক্তিনির্ভর প্রচার, কম প্রচারণা কর্মী, মিডিয়া কভারেজহীনতা, ডিজিটাল প্রচারে সীমাবদ্ধতা।
ফলে বড় দলগুলোর প্রচার যেন এক ধরনের মেগা-ইভেন্ট ক্যাম্পেইন এ পরিণত হয়, যেখানে ছোট দলগুলো বিছিন্ন ও অগোছালো গোল্লা খেলায় আটকে থাকে।
বর্তমান নির্বাচন যাকে কেউ কেউ প্রচারের যুদ্ধ বলছেন, সেই যুদ্ধের সঙ্গে জড়িয়ে গেছে অর্থনীতিরও সরাসরি সম্পর্ক। বিজ্ঞাপন, সোশ্যাল মিডিয়া মার্কেটিং, ডিজিটাল কন্টেন্ট, গ্রাফিক্স ডিজাইন, ভিডিও প্রোডাকশন, মিডিয়া-বাইং, অ্যাকাউন্ট ম্যানেজমেন্ট সবই নির্বাচনকে বানিয়ে ফেলেছে একটি ইলেকশন ইকোনমি।
এই অর্থনীতিতে টিকে থাকতে হলে দলগুলোকে ক্ষমতাসীন বা ক্ষমতাসীন হওয়ার সম্ভাবনাময় হতে হয়। কারণ মিডিয়া ও প্রচারের এই ব্যবস্থার অংশীদার অনেকেই লাভজনক ক্লায়েন্ট খোঁজেন। বড় দলগুলো সেখানে সবচেয়ে বড় ক্রেতা, ছোট দলগুলো হয় ক্ষুদ্র ভোক্তা, যাদের উপেক্ষা করা হারানোর ঝুঁকি কম।
রাজনীতিতে প্রচারের কার্যকারিতা শুধু তথ্য বিনিময়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। এটি মানুষের মনোভাব, প্রত্যাশা, বিশ্বাস ও সিদ্ধান্ত গ্রহণের উপর দীর্ঘমেয়াদে প্রভাব ফেলতে পারে।
প্রচারের শক্তিগুলো ইমেজ বিল্ডিং, প্রতিশ্রুতির আর্কিটেকচার, প্রতিপক্ষ চ্যালেঞ্জ, ক্ষমতা সম্ভাবনা স্মরণ করানো, মাস সাইকোলজি প্রভাব, মিডিয়া ন্যারেটিভ দখল ইত্যাদি কাজে সাহায্য করে।
বড় দলের তোলা শোডাউন, ক্যাম্পেইন সংগীত, জোরালো ভাষণ, টকশো উপস্থিতি সবই ভোটারের মনে এক ধরনের বিজয়ী দলের ইমেজ তৈরি করে যা ছোট দলগুলো সহজে ভাঙতে পারে না।
একজন রাজনৈতিক মনস্তত্ত্ববিদ বলেন, 'অনেক সময় ভোটার দলকে সমর্থন করে না, বরং বিজয়ী সম্ভাবনাকে সমর্থন করে।' আর এই সম্ভাবনা প্রচারের মাধ্যমেই তৈরি হয়।
গণমাধ্যমে বড় দলের কভারেজ বেশি হওয়ার কারণগুলো সাংবাদিকতা ও রাজনৈতিক বিজ্ঞানের গবেষণায় কয়েকভাবে ব্যাখ্যা করা হয়েছে-
১। নিউজরুমে স্পেস সীমিত
২। জাতীয় প্রেক্ষাপটের ভ্যালু বেশি
৩। টিআরপি ও ক্লিক আকর্ষণ
৪। দর্শক চাহিদা
৫। রাজনৈতিক সম্পর্ক
৬। নিরপেক্ষতার ভ্রান্ত ভারসাম্য
কেউ কেউ বলছেন, গণমাধ্যমের এই কাঠামো পরিবর্তন করা না হলে ছোট দলগুলো কখনোই আলোতে আসতে পারবে না।
যদিও প্রচারের যুদ্ধ অসম, তবে ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম ছোট দলগুলোকে কিছুটা জায়গা দিতে শুরু করেছে। বিশেষ করে ফেসবুক, ইউটিউব, টিকটক, এক্স (টুইটার), লাইভস্ট্রিমিং।
ছোট দলগুলো খুব কম খরচে নির্দিষ্ট এলাকায় বা গ্রুপে প্রচার করতে পারে এবং ‘হাইপার-লোকাল ভোটার টার্গেটিং’ করতে পারে। কিন্তু ডেটা অ্যানালিটিক্স ও বিজ্ঞাপন খরচে এখনও বড় দলগুলো এগিয়ে।
ছোট দলগুলো মাঝে মাঝে দাবি তুলেছে, নির্বাচন কমিশনকে ন্যায্য প্রচার ব্যবস্থায় হস্তক্ষেপ করতে হবে। অনেক দেশে প্রচারের সময় রাষ্ট্রীয় টেলিভিশন ও মিডিয়ায় সমান সুযোগ দেওয়ার নীতি আছে। কিন্তু স্থানীয় বাস্তবতায় এমন ব্যবস্থা এখনও দুর্বল।
রাজনীতি শুধু আদর্শের লড়াই নয়, এটি টিকে থাকার ক্ষেত্র। একটি দল যদি প্রচারে পিছিয়ে পড়ে, তবে তারা-
১। জনমতের দৃশ্যপটে অদৃশ্য হয়ে যায়
২। ভবিষ্যৎ জোটে গুরুত্ব হারায়
৩। নতুন সদস্য ও তরুণ সমর্থক পায় না
৪। নীতি প্রভাব ক্ষমতা হারায়
৫। এবং শেষ পর্যন্ত বিলীনও হয়ে যেতে পারে
এ কারণে প্রচার রাজনীতির অস্তিত্বের অন্যতম ভিত্তি জীবনরেখা।
রাজনৈতিক প্রতিযোগিতা শুধু মাঠে-ঘাটে র্যালি বা পোস্টার-লিফলেটের লড়াই নয়, এটি গণমাধ্যম, ডিজিটাল, অর্থনীতি, মনস্তত্ত্ব ও ন্যারেটিভ গঠনের লড়াই। যেখানে বড় দলগুলো স্বাভাবিকভাবেই এগিয়ে আছে, আর ছোট দলগুলো টিকে থাকার জন্য সংগ্রাম করছে, নতুন প্রযুক্তি ও ডিজিটাল কৌশলের ওপর নির্ভর করছে।
নির্বাচন যত এগোচ্ছে, এই অসম প্রচারের খেলা ততই স্পষ্ট হয়ে উঠছে। প্রশ্ন শুধু এই, গণতন্ত্রের প্রকৃত প্রতিযোগিতা কি গণমাধ্যমের আলোতে সমানভাবে জায়গা পাবে নাকি আলো কেবল বড়দের জন্যই থাকবে?
সম্পাদক - আশরাফ ইকবাল, নির্বাহী সম্পাদক - বর্ষন মোহাম্মদ
© স্বত্ব সংরক্ষিত © ২০২৬ দৈনিক মুন্সিগঞ্জের বার্তা