মো. রাসেল সরকার, গজারিয়া (মাল্টিমিডিয়া) প্রতিনিধি
আমরা প্রায়ই বিভিন্ন মানুষের অর্জন, কৃতিত্ব ও সাধনার গল্প শুনি। কিন্তু এমন মানুষ খুব কমই দেখা যায়, যারা নিভৃতে থেকে আলোর প্রদীপ জ্বালান প্রজন্মের পর প্রজন্মে। তেমনই একজন আলোকিত মানুষ হাফেজ মাওলানা মো. আল আমিন সরকার। কুরআনের শিক্ষাকে জীবনের মূল লক্ষ্য হিসেবে গ্রহণ করে তিনি স্বল্প সময়ে গড়ে তুলেছেন শত শত হাফেজে কুরআন। দীর্ঘদিন ধরে রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম বাংলাদেশ বেতার-এ কুরআন তিলাওয়াতের মাধ্যমে তিনি পৌঁছে গেছেন সারাদেশের শ্রোতাদের হৃদয়ে। সম্প্রতি তাঁর সঙ্গে কথা বলেছেন আমাদের মুন্সিগঞ্জে বার্তা প্রতিবেদক।
দৈনিক মুন্সিগঞ্জের বার্তা: আপনার জন্ম ও পারিবারিক সম্পর্কে?
হাফেজ মাওলানা আল আমিন সরকার: আমার স্থায়ী ঠিকানা মুন্সিগঞ্জ জেলার গজারিয়া উপজেলার ভবেরচর ইউনিয়নের লক্ষিপুর গ্রাম (৭নং ওয়ার্ড)। ১৯৮৭ সালে কুমিল্লার গৌরীপুরে নানাবাড়িতে জন্মগ্রহণ করি। আমার পিতা আলহাজ্ব ক্বারি আব্দুর রহমান এবং মাতা শিরিন আক্তার। ছোটবেলা থেকেই কুরআনের পরিবেশে বেড়ে উঠেছি।
দৈনিক মুন্সিগঞ্জের বার্তা: শিক্ষাজীবনের শুরুটা?
হাফেজ মাওলানা আল আমিন সরকার: শিক্ষার হাতেখড়ি হয়েছে আমার পিতার কাছ থেকেই। ১৯৯৩ সালে ঢাকার তেজগাঁও নূরানী ওয়াকফ স্ট্রিট মক্তব বিভাগ সম্পন্ন করি। এরপর কুরআন হিফজের জন্য আমার বড় ফুপা হাফেজ মোহসিন সাহেবের তত্ত্বাবধানে সাভারের বাইপাইল আল আমিন মাদরাসায় ভর্তি হয়ে ১৯৯৮ সালে হিফজ সম্পন্ন করি।
হিফজকে আরও মজবুত করতে রায়েরবাজার বাইতুন নূর মাদরাসায় ভর্তি হই। এটি পরিচালনা করতেন প্রখ্যাত হাফেজ শায়েখ আব্দুল হক সাহেব হাফিজাহুল্লাহ। ২০০০ সালে সেখানে হিফজের রিভিশন শেষ করি।উচ্চতর ইসলামী শিক্ষার জন্য দেশের ঐতিহ্যবাহী প্রতিষ্ঠান জামিয়া শারইয়্যাহ মালিবাগ-এ ভর্তি হই এবং ২০১৩ু১৪ শিক্ষাবর্ষে তাকমিল (দাওরায়ে হাদিস) সম্পন্ন করি।
পাশাপাশি সাধারণ শিক্ষা বোর্ডের অধীনেও দাখিল, আলিম, ফাজিল ও কামিল (মাস্টার্স) সম্পন্ন করেছি। বর্তমানে পিএজডি অর্জনের প্রস্তুতি নিচ্ছি।
দৈনিক মুন্সিগঞ্জের বার্তা: ছাত্রজীবনে উল্লেখযোগ্য অর্জন?
হাফেজ মাওলানা আল আমিন সরকার: আলহামদুলিল্লাহ, ছাত্রজীবনে কিছু সাফল্য অর্জনের সুযোগ হয়েছে। হুফফাজুল কুরআন ফাউন্ডেশন বাংলাদেশের জাতীয় হিফজুল কুরআন প্রতিযোগিতায় ২০ পারা গ্রুপে প্রথম পুরস্কার অর্জন করি। সৌদি আরবে অনুষ্ঠিত আন্তর্জাতিক হিফজ প্রতিযোগিতায় ইসলামিক ফাউন্ডেশনের ফাইনাল পর্বে দ্বিতীয় স্থান লাভ করি। এছাড়া মিশরে অনুষ্ঠিত আন্তর্জাতিক হিফজ প্রতিযোগিতায় ইসলামিক ফাউন্ডেশনের ফাইনাল পর্বে তৃতীয় স্থান অর্জন করি। জেলা ও জাতীয় পর্যায়ের বিভিন্ন প্রতিযোগিতায়ও একাধিক সম্মাননা পেয়েছি।
দৈনিক মুন্সিগঞ্জের বার্তা: কর্মজীবন?
হাফেজ মাওলানা আল আমিন সরকার: শিক্ষাজীবন শেষে ২০১৪ সালে উত্তরা ৪নং সেক্টরের মাদরাসাতুস সুফফায় সহকারী পরিচালক হিসেবে যোগদান করি।২০১৬ সালে নিজ ইউনিয়নের চরপাথালিয়া গ্রামে একটি পরিত্যক্ত প্রতিষ্ঠানকে পুনরুজ্জীবিত করে “চরপাথালিয়া সালমান ফারসী রা. মাদরাসা” প্রতিষ্ঠা করি। বর্তমানে এটি গজারিয়া উপজেলার অন্যতম স্বনামধন্য শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়েছে।
বেফাকুল মাদারিসিল আরাবিয়া বাংলাদেশ কেন্দ্রীয় বোর্ড পরীক্ষায় ১ম, ২য় ও ৩য় স্থান অর্জনসহ জাতীয় পর্যায়ে একাধিক সাফল্য অর্জন করেছে প্রতিষ্ঠানটি। বর্তমানে এখানে ১৯ জন শিক্ষক, ৫ জন স্টাফ এবং ৩৬৭ জন শিক্ষার্থী অধ্যয়নরত।
দৈনিক মুন্সিগঞ্জের বার্তা: গণমাধ্যমে কুরআন তিলাওয়াতের অভিজ্ঞতা?
হাফেজ মাওলানা আল আমিন সরকার: ২০০৯ সাল থেকে মাহে রমাদানে বাংলাদেশ বেতার-এ হিফজুল কুরআন অনুষ্ঠানে নিয়মিত তিলাওয়াত করছি। এছাড়াও বাংলাদেশ টেলিভিশন এবং ঘবংি২৪-এ কুরআন তিলাওয়াতের সুযোগ হয়েছে।পাশাপাশি আমি দেশের বিভিন্ন জাতীয় দৈনিকে নিয়মিত কলাম লিখছি। এর মধ্যে রয়েছে দৈনিক ইত্তেফাক, দৈনিক যুগান্তর, দৈনিক ইনকিলাব, দৈনিক দেশ রূপান্তর, দৈনিক কালের কণ্ঠ এবং বাংলাদেশ প্রতিদিন। কুরআন, শিক্ষা ও সমসাময়িক বিভিন্ন বিষয়ে লেখালেখির মাধ্যমে সমাজে ইতিবাচক চিন্তা ছড়িয়ে দেওয়ার চেষ্টা করছি।
দৈনিক মুন্সিগঞ্জের বার্তা: খতমে তারাবির দীর্ঘ অভিজ্ঞতা?
হাফেজ মাওলানা আল আমিন সরকার: দীর্ঘ প্রায় ২৫ বছর ঢাকার বিভিন্ন মসজিদে খতমে তারাবি পড়িয়েছি। ২০০১ সালে কাওরান বাজারের ঐতিহ্যবাহী আম্বরশাহ শাহী মসজিদে প্রথম খতমে তারাবি শুরু করি। এছাড়াও রমিহ মেটাল জামে মসজিদ এবং মালিবাগ মাদরাসার মসজিদসহ একাধিক মসজিদে খতমে তারাবি পড়ানোর সুযোগ পেয়েছি।বর্তমানে ছাত্রদের কল্যাণের কথা বিবেচনা করে নিজ প্রতিষ্ঠানে খতমে তারাবি পড়াচ্ছি, যাতে শিক্ষার্থীরা সরাসরি আমার তিলাওয়াত থেকে উপকৃত হতে পারে।
আমি নিজের প্রচারের জন্য কাজ করি না; বরং প্রজন্ম গড়াকেই জীবনের ব্রত হিসেবে নিয়েছি। সকলের কাছে দোয়া চাই—যেন আমৃত্যু কুরআনের খেদমতে নিয়োজিত থাকতে পারি এবং দেশের জন্য যোগ্য হাফেজ ও আলেম গড়ে যেতে পারি।
সম্পাদক - আশরাফ ইকবাল, নির্বাহী সম্পাদক - বর্ষন মোহাম্মদ
© স্বত্ব সংরক্ষিত © ২০২৬ দৈনিক মুন্সিগঞ্জের বার্তা