
বিশাল এক বাড়ি। বাড়িটির দিকে তাকালে প্রথম যে জিনিস চোখে পড়ে তা সৌন্দর্য নয়, নিস্তব্ধতা। লস অ্যাঞ্জেলেসের পাহাড়ি এলাকায় এমন নিস্তব্ধতা স্বাভাবিক নয়। বাতাস থাকে, পাখি থাকে, দূরে গাড়ির শব্দ থাকে। কিন্তু এই বাড়িটির চারপাশে যেন শব্দ ঢুকতে চায় না। মনে হচ্ছে কেউ শব্দ ঢোকার অনুমতি দেয় না। রাত হোক বা দিন, বাড়িটি সবসময় সুনসান। আর এই নিস্তব্ধতা প্রথম দিন থেকেই কাইরা জেনারকে অস্বস্তিতে ফেলেছিল।
কাইরা পৃথিবীর অন্যতম ধনী নারী। 'জেনারা কসমেটিক্স' এর নাম পৃথিবীর প্রায় প্রতিটি মেয়েই জানে। এই কোম্পানির মালিক সে। তার বাড়ি হবে বিলাসবহুল, নিখুঁত- এটাই স্বাভাবিক। এই বাড়িটিও তেমন। সাদা মার্বেলের মেঝে, কাঁচের দেয়াল, বিশাল ছাদ, পাহাড়ের দিকে খোলা বারান্দা। সব নিখুঁত।
তবুও প্রথম রাতেই কাইরা বুঝেছিল এই বাড়ি নতুন নয়। এই বাড়ি খালি নয়। এখানে রয়েছে অদ্ভুত কোনোকিছু, যা মনে করে গা শিউরে ওঠে।
প্রথমদিন বাড়িতে ওঠার পরপরই অদ্ভুত সব শব্দ শুনতে পেয়েছিল কাইরা। প্রথম শব্দ শুনেছিল রাত ২ টা ১৭ মিনিটে। কাইরা তখনও ঘুমায়নি। এমনিতেই তার ঘুম আসে দেরিতে। সেদিনও এটাই হয়েছিল। এজন্য সে ছাদের দিকে তাকিয়ে শুয়ে ছিল। হঠাৎ করে শব্দ হলো- ঠক।
একটা শুকনো শব্দ, যেন কেউ কাঠের ওপর আঙুল দিয়ে টোকা দিল। শব্দটা শুনে কাইরা উঠে বসলো।
'হ্যালো?'
বললো সে। কিন্তু তার নিজের কন্ঠই নিজের কানে অচেনা লাগলো। এরপর আরেকটা শব্দ। এবার একটু জোরে। ঠক, ঠক। শব্দটা আসছে দেয়ালের ভেতর থেকে। ইঁদুর দৌড়াচ্ছে? ভাবলো কাইরা। কিন্তু বাড়িটি সম্পূর্ণ নতুন। দেয়ালে কোনো ইঁদুর থাকার প্রশ্নই আসে না। কাইরা জানে এই বাড়ি কেনার আগে তিনবার ইনস্পেকশন হয়েছে। তাই সে বেডসাইড ল্যাম্প জ্বালালো। পরক্ষণেই শব্দ থেমে গেল। এসব দেখে কাইরা হাসলো। নিজেকে বললো- 'নতুন বাড়ি। হয়তো সাউন্ড সেটেল করছে।'
কিন্তু আলো নিভানোর ঠিক আগ মুহূর্তে সে টের পেল রুমের দেয়াল কাঁপছে। খুব হালকাভাবে। ঠিক যেন কেউ ভেতর থেকে শ্বাস নিচ্ছে। ঘটনাটি দেখে সে কিঞ্চিৎ বিস্মিত হলো। কিন্তু সাহস হারালো না। এসবে যদিও ঠিকঠাক ঘুম হলো না তার, তবে রাত ঠিকই কাটলো।
পরদিন সকালে কাইরা এই কথা কাউকে বললো না। সে এমন মানুষ নয়, যে ভূতের গল্পে ভয় পায়। সে বাস্তববাদী। টাকা, হিসাব, ব্যবসা- এসবই তার জীবন। কিন্তু তৃতীয় রাতের ঘটনা আর এড়িয়ে যাওয়ার মতো রইলো না। সেদিন তার বোন কেনা বাড়িতে এসেছিল। কেনা বাড়িতে ঢুকেই থেমে গিয়েছিল। তার কিছু রহস্যময় অনুভূতি হচ্ছিল।
'তুই কিছু অনুভব করছিস?' কেনা জিজ্ঞেস করলো।
'কী অনুভব করার কথা বলছিস?' কাইরা বিরক্তির সুরে জবাব দিলো।
'বাড়ির ভেতরটা মারাত্মক ঠান্ডা। এত ঠান্ডা কোনো বাড়ি হওয়ার কথা নয়। আর কেমন স্তব্ধ, সুনসান। অস্বাভাবিক লাগছে খুব।' বললো কেনা।
রুমের ভেতর এয়ার কন্ডিশন বন্ধ ছিল। কেনা বারান্দায় দাঁড়িয়ে পাহাড়ের দিকে তাকালো। সুন্দর সব দৃশ্য। সবুজ, কুয়াশাচ্ছন্ন ভাব। হঠাৎ কী যেন ভেবে তার গা শিউরে উঠলো।
'আমার মনে হচ্ছে কেউ আমাদেরকে দেখছে।'
কেনার কথা শুনে কাইরা হাসলো। 'তুই সিরিয়াসলি ভূতের ভয় পাচ্ছিস?'
কেনা এই প্রশ্নের উত্তর দিলো না।
সেদিন রাত তিনটায় কেনা চিৎকার করে উঠলো। তার চিৎকার শুনে কাইরা ছুটে গেল। কেনার রুমে পৌঁছে দেখলো সে বিছানায় বসে কাঁপছে।
'ও দরজার সামনে দাঁড়িয়ে ছিল।' কেনা ফিসফিস করে বললো।
'কে?' জিজ্ঞেস করলো কাইরা।
'একটা মানুষ। না, মানুষ না। ওর মুখ ছিল না।'
কথাটা বলেই ভয়ে ফের কাঁপতে থাকলো কেনা।
কেনার কথা শুনে কাইরা দরজার দিকে তাকালো। দেখলো কিছুই নেই। কিন্তু দরজার নিচে নখের আঁচড়। নতুন কাঠে। গভীর। রক্তমাখা।
মারাত্মক ভয় পেয়ে কেনা সেই রাতেই বাড়ি ছেড়ে চলে গেল। এমনকি আর কেউ বাড়িতে রাত কাটাতে চাইলো না। একদিন মেকআপ আর্টিস্ট লিও এসেছিল। রাত বারোটা পর্যন্ত কাজ করলো সে। তারপর হঠাৎ থেমে গেল। তার মনে হলো কেউ একজন কাঁদছে। কান্নার শব্দ শুনতে পেল সে।
'কাইরা, তোমার বাথরুমে কেউ কাঁদছে।' লিও বললো।
শুনে কাইরা বিরক্ত হয়ে বললো- 'ফালতু কথা বলিস না। এখানে কেউ নেই। শুধু তুই আর আমি ছাড়া।'
কিন্তু বাথরুমের দরজা খোলা। ভেতর থেকে শব্দ আসছে খচখচ, খচখচ। ঠিক যেন কেউ নখ দিয়ে আয়নার ওপর কিছু আঁকছে। শব্দ শুনতে পেয়ে একটু সতর্ক হলো কাইরা। ভুরু কুঁচকে গেল তার। কী হচ্ছে আসলে? ভাবলো সে। অতঃপর ধীরে ধীরে বাথরুমের দিকে এগোলো। ভেতরে গিয়ে দেখলো আয়নায় লেখা- 'এটা আমার ঘর।'
এরপর লিও এসে একই জিনিস দেখলো। সেদিন সে এতই ভয় পেয়েছিল যে, তৎক্ষণাৎ জুতো পরে দৌড়ে বাড়ি থেকে বেরিয়ে গিয়েছিল।
এরপর শুরু হলো মৃত্যুর খেলা। প্রথমে নিরাপত্তা রক্ষী হোসে। মৃত্যুর দিন সকালে সে পাহারায় ছিল। দুপুরে তার লাশ পাওয়া গেল লিফটের ভেতর। তার চোখ দুটো উপড়ে নেওয়া। মুখ হাঁ করে খোলা। ভেতরে কিছু নেই। জিহ্বা নেই। গলা নেই।
এত বীভৎস ঘটনা ঘটলো, কিন্তু ক্যামেরা ফুটেজে কিছু ধরা পড়লো না। শুধু একটা বিষয় দেখা গেল- লিফটের দরজা বন্ধ হওয়ার আগে ভেতরে ঢুকেছিল চারটি ছায়া। তবে হোসে সেখানে একাই ছিল।
ঘটনার পর পুলিশ আসলো। লম্বা সময় তদন্ত হলো। কিন্তু হত্যার মোটিভ বা সূত্র কোনোকিছুই পাওয়া গেল না। এই ভয়ানক ঘটনার পর কাইরার মা কাঁদতে কাঁদতে বললেন- 'এই বাড়ি ছাড় তুই, মা। আমি চাই না তোর কোনো ক্ষতি হয়ে যাক। এখানে খারাপ কিছু আছে। নয়তো আমাদের সিকিউরিটির এমন বাজে অবস্থা হতো না। খুব ভয়ানক জিনিস আছে এখানে। তোর এখানে থাকা ঠিক নয়।'
কিন্তু কাইরা বাড়ি ছাড়লো না। তার মধ্যে এক ধরনের জেদ কাজ করলো। এই বাড়ি তাকে হারাতে পারবে না। কিন্তু বাড়িটি যেন এই চ্যালেঞ্জই নিচ্ছিলো। রাতে কাইরা স্বপ্ন দেখলো। সে আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে আছে। তার পেছনে কেউ দাঁড়ানো। কানে কানে ফিসফিস করে বলছে- 'তুমি আমাকে কিনেছো ভাবছো? উহু, উলটো আমিই তোমাকে কিনেছি, হাহ হাহ হা।'
কাইরা চিৎকার করে জেগে উঠলো। বিছানার চারপাশে রক্তের দাগ। আর বিছানার নিচ থেকে আসছে হাড়গোড় চিবানোর শব্দ। কাইরা কিচ্ছু ভাবতে পারছে না। হাড় হিম হয়ে আসছে তার। পরক্ষণেই আতঙ্কে মাথা ঘুরে বিছানাতেই পড়ে গেল সে।
এই ঘটনার পর আবারও মর্মান্তিক দৃশ্য ঘটলো সপ্তম রাতে। বিদ্যুৎ চলে গেল। পুরো বাড়ি অন্ধকার। হঠাৎ একটার পর একটা দরজা বন্ধ আর খুলতে শুরু করলো।
ঠাস! ঠাস! ঠাস!
কাইরা সিঁড়িতে দাঁড়িয়ে আছে। সে দেখতে পেল নিচতলা থেকে কেউ উঠে আসছে। ধীরে। খুব ধীরে। একটা মানুষ। না, ঠিক মানুষ নয়, মানুষের মতো দেখতে কিছু একটা। তার গায়ে চামড়া নেই। মাংস দেখা যাচ্ছে। চোখের জায়গায় গর্ত। সে বিকট হাসি হাসছে। আর তার পেছনে এমন আরও অনেকেই আসছে।
ঠিক এমন মুহূর্তে বাড়িটি ফিসফিস করে বলছে- তুমি অনেকদিন ধরে এখানে আছো। এখন থেকে সারাজীবন এখানেই থাকতে হবে। আমি জানি তোমার পালানোর ইচ্ছা আছে, কিন্তু পালাতে পারবে না কোথাও।
এসব দেখে কাইরার কলিজা শুকিয়ে আসলো। বুক কাঁপছে ভয়ে। দরদর করে ঘাম ঝরছে কপাল থেকে। যদিও চারপাশ বেশ ঠান্ডা। এই মুহূর্তে তার একটাই চিন্তা- নিজেকে বাঁচাতে হবে। নয়তো আর রক্ষা নেই। ভয়ানক কিছু ঘটবে। যেই ভাবা সেই কাজ। দৌড়াতে লাগলো কাইরা। কিন্তু মেঝে নরম। মাংসের মতো নরম৷ তার পা সেখানে ডুবে গেল। আর অন্ধকার থেকে একটা হাত উঠে এসে তার গোড়ালি চেপে ধরলো। হাতটা ঠান্ডা নয়। জীবন্ত। কাইরার মনে হলো জীবন শেষ হচ্ছে তার। এখনই এই ভয়ংকর হাত তাকে হত্যা করবে। ভয়ে, কষ্টে, আতংকে কাইরা জোরেশোরে চিৎকার করলো। নিজের সর্বোচ্চ শক্তি নিয়ে চিৎকার করলো সে। একবার, দুইবার, বারবার। সেই চিৎকার পাহাড়ে প্রতিধ্বনিত হলো। কিন্তু কেউ শুনলো না। কারণ এই বাড়ি শব্দ বাইরে যেতে দেয় না। শেষ যে শব্দ কাইরা শুনলো সেটা তারই নিজের নাম। তবে নিজের কন্ঠে নয়। দেয়ালের ভেতর থেকে কোনো একজনের কন্ঠে। সেই কন্ঠ বীভৎস সুরে ডাকছে।
কাই রা! কা ইরা! কাইরা! হাহাহা, হাহ হাহ হা, হাহাহাহাহাহাহা!
(সমাপ্ত)
সম্পাদক - আশরাফ ইকবাল, নির্বাহী সম্পাদক - বর্ষন মোহাম্মদ
© স্বত্ব সংরক্ষিত © ২০২৬ দৈনিক মুন্সিগঞ্জের বার্তা