মোহাম্মদ ইয়ামিন
প্রথম বিদ্যাপীঠ মানে এক ভীষণ ভালা লাগা অনুভূতি ও আবেগের জায়গা। যেখানে মিশে থাকে শত সহস্র স্মৃতি। কখনো সে স্মৃতি মুছে ফেলা যায় না। ভুলে থাকা যায় না—পড়ন্ত বয়সেই হোক আর বয়সের বসন্তেই হোক। অন্তরে বেঁচে থাকে তা জীবনের শেষ মুহুর্ত পর্যন্ত।
আমার এমনই এক বিদ্যাপীঠ হযরতপুর আহমদিয়া দাখিল মাদ্রাসা। যে পীঠে আমি বড় হয়েছি। আমার প্রায় এক যুগের বেশী সময় কেটেছে এখানে। যেখানে আমি পড়েছি, ঘুমিয়েছি, খেয়েছি, খেলেছি ও বন্ধুদের সাথে মান-অভিমান, ঝগড়াঝাটিও করেছি।
আমার মতো শতশত শিক্ষার্থীদের অনুভূতি ও স্মৃতি জড়িয়ে আছে মাদরাসাটির সাথে। এ মাদরাসা কেবল একটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান নয় বরং এটি সমাজের একটি গুরুত্বপূর্ণ সামাজিক প্রতিষ্ঠান। বিভিন্ন সময়ে সামাজিক কাজগুলো এখান থেকে আঞ্জাম দেওয়া হয়, এই যেমন ঈদ উল আদহা সময় কুরবানীর গরুর চামড়াগুলো সমাজ থেকে অপসারণ করে তা বিক্রির ব্যবস্থা করা—এতে একদিকে যেমন সমাজের রাস্তা-ঘাট পরিস্কার পরিচ্ছন্ন থাকে ভিন্নদিকে মাত্রাতিরিক্ত পঁচা রক্তের দুর্গন্ধ থেকে মানুষ মুক্তি পায়। আবার চামড়া ফেলে না দিয়ে তা বিক্রির একটা ব্যবস্থা করে দেশীয় অর্থনীতির চাকাকে সচল করতে অংশীদারিত্বের ভূমিকা পালন করছে প্রতিষ্ঠানটি। মাদরাসাটি শিক্ষাদান ছাড়াও সমাজের বঞ্চিত শিশু-কিশোরদের থাকা-খাওয়ার ব্যবস্থা করছে, সমাজের প্রয়োজনে মৃতব্যক্তির নামাজে যানাজার ব্যবস্থা করছে, ঈদে এতিম শিক্ষার্থীদের নতুন পোশাকের ব্যবস্থা করছে। এছাড়াও সমাজের বিপদআপদে পাশে দাড়াচ্ছে। একবার গ্রামে প্রচুর পানি উঠেছিলো। বন্যার পানি। খুব সম্ভব ১৯৯৮ সালে। সেবার গ্রামের মানুষ এ মাদরাসাটিতে আশ্রয় নিয়েছিলো। মাদারাসাটি কেবল একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বরং মানুষের চরম সংকটে আশ্রয় ও আস্থার জায়গা।
শিক্ষাক্ষেত্রে হযরতপুর মাদরাসার ফলাফল বেশ চমকপ্রদ। সচরাচরই মাদরাসার ফলাফল গুলো ভালো হয়, হচ্ছে। এবছরও বেশ কয়েকজন শিক্ষার্থী এ-প্লাস পেয়েছেন ও গোল্ডেন এ-প্লাসও রয়েছে মাদরাসার ঝুড়িতে। যদিও পাসের হার গেলো বছর তেমন ভালো হয়নি কিন্তু কয়েকজন শিক্ষার্থীর ফলাফল ঈর্ষান্বিত পর্যায়ে পৌছেছে।
আহমদিয়া দাখিল এ মাদরাসার গর্ভে জন্ম নিয়েছে অনেক মেধাবী শিক্ষার্থীর যারা দেশের সর্বোচ্চ বিদ্যাপীঠ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যয়ন করেছেন, করছেন। দেশের বাহিরেও পড়াশুনা করছেন কেউ কেউ। মিশরের আল-আজহার বিশ্ববিদ্যালয়, সৌদি আরবের মদিনা বিশ্ববিদ্যালয়েও পড়াশুনা করেন এ মাদারাসারই শিক্ষার্থী।
হযরতপুরের (বাহেরচর) প্রাচীণ এ মাদরাসা থেকে অসংখ্য মেধাবী শিক্ষার্থী পাশ করে বের হয়েছেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের জনাব শরিফুল ইসলাম (এসআই), আমিরুল ইসলাম, আব্দুল আহাদ, রুহুল আমীন, মোঃ রাহাত এখান থেকেই দাখিল/এসএসসি পাশ করে বের হোন। ইসলামি বিশ্ববিদ্যালয়ের মুহাম্মাদ ইয়ামিন, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের মোহাম্মদ শাহাদাত, বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়ের নোমান, বিজিএমইএর শাহরিয়ার ফয়সাল, এডভোকেট আব্দুল কাইয়ুম, হাফিজুর রহমান ইমন, মোঃ কাউসার, মোহাম্মাদ নাসির, মোহাম্মাদ আরিফ, নুরুজ্জামান, মোহাম্মাদ মিলন, সিদ্দিকুর রহমান সাত্তার, হেমায়েত উদ্দিনসহ আরো নাম না জানা অসংখ্য মেধাবী শিক্ষার্থী এখানেই দাখিল পাশ করেছেন।
সফল ব্যক্তি জনাব আবুল হোসেন অপু, জনাব তানভীর আলম এ মাদরাসারই শিক্ষার্থী ছিলেন, যারা এখন সফল ব্যবসায়ী। বাংলাদেশের গার্মেন্টস ব্যবসাকে নেতৃত্ব দিচ্ছেন। হাজার হাজার কর্মচারী, শ্রমিক, স্টাফ তাদের প্রতিষ্ঠান-আল মুসলিম গ্রুপে নিয়োজিত আছেন। বাংলাদেশের অর্থনীতির চাকা সচল ও অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির জন্য আল মুসলিম গ্রুপের ঝুরি নেই। এক কথায় বলতে গেলে আল মুসলিম প্রায় ত্রিশ চল্লিশ হাজার মানুষের কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করছেন যার পথিকৃৎ জনাব শেখ মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ, জনাব আবুল হোসেন অপু ও শেখ মোহাম্মাদ তানভীর আলম। এমনই সফল ব্যক্তিদ্বয় হযরতপুর মাদরাসারই শিক্ষার্থী।
ঐতিহ্যেবাহী এ মাদরাসায় শিক্ষকতা করেছেন দেশের বিভিন্ন সনামধন্য প্রতিষ্ঠানের শিক্ষকগণ। শিক্ষকতা করেছেন জনপ্রিয় আলোচক ও ডিএন কলেজের ইংরেজি বিভাগের প্রভাষক মাওলানা ওয়ালিউল্লাহ বিক্রমপুরী, মাওলানা হাসান তালুকদার, মাওলানা সাদিকুর রহমান, মাওলানা আনিছুর রহমান, হাবিবুর রহমান বিএসসি, মোহাম্মাদ আবিদ স্যারসহ আরো অনেকে।
মাদরাসাটি প্রতিষ্ঠা হয় ১৯৮৫ সাথে। এটি প্রতিষ্ঠা করেন মাওলানা কাজী আফতাব উদ্দীন ও মরহুম আলী আজগর বেপারীসহ আরো গন্যমান্য স্থানীয় ব্যক্তিবর্গ। প্রতিষ্ঠার পর থেকে মাদরাসাটি গৌরবের সাথে আজও দাড়িয়ে আছে। প্রতিদিন এখান থেকে পাঠ গ্রহণ করে প্রায় ৩৫০ শিক্ষার্থী। শিক্ষক রয়েছেন প্রায় ২০ জনের অধিক। নৈশ প্রহরী ও মাদরাসা ইয়াতিমখানার জন্য বাবুর্চিও রয়েছেন। মাদরাসাটিতে যে ছাত্রাবাস রয়েছে তাতে প্রায় ৪০/৫০ জন ছাত্র থাকেন। ছাত্রাবাস পরিচালনার জন্য ক্বারী জনাব আকরাম সাহেব হুজুর নিয়োজিত আছেন। মাদরাসার বহির্ভাগে একটি ছোট খেলার যায়গা রয়েছে। এক সময় এখানে খেলার জন্য বড় জায়গা ছিল কিন্তু বড় একটি ভবন হওয়াতে জায়গাটি সংকীর্ণ হয়ে গেছে। রাস্তা সংলগ্ন পূর্বের ভবনটি দুতলা ও পশ্চিমের ভবন একতলা বিশিষ্ট। মাদরাসার উত্তর-পশ্চিমে ছাত্রাবাসের জন্য একতলা বিশিষ্ট একটি ভবন তৈরী হচ্ছে। চারিপাশ সবুজে ঘেরা এ মাদরাসাটির অভ্যন্তরভাগে একটি বিশালাকার অফিস ভবন রয়েছে। যার মধ্যে দুটো কক্ষ রয়েছে। একটি ছোট ও অন্যটি বড়। অফিস ভবনের ভেতরে বৃহত একটি টেবিল ও শিক্ষকদের বসার অনেকগুলো চেয়ার রয়েছে। অফিস ভবনের বা'শ ঘেঁষে সারিবদ্ধ হয়ে বেশ গাছ দাড়িয়ে রয়েছে যা মাদ্রাসার অভ্যন্তরীন সৌন্দর্য বৃদ্ধি করছে। মাদরাসার একেবারে পূ্র্বদিকের শেষপ্রান্তে নূরানী শিক্ষকদের একটি কামরা রয়েছে যেখানে কয়েকজন নূরানী শিক্ষকগণ অবস্থান করেন।
মাদরাসাটির পশ্চিম পাশে ইছামতী নদী। নদীটি বহুলাংশে মাদরাসার সৌন্দর্য বৃদ্ধি করেছে। নদীতে গোসল ও দৈনন্দিন কাজের জন্য মাদরাসা লাগুয়া একটি ঘাট রয়েছে। ঘাটটি ইট-বালু, রট সিমেন্ট দিয়ে সুন্দর ও মজবুত করে পাকা করা। মাদরাসার আবাসিক শিক্ষার্থীসহ সমাজের অনেকেই নিজেদের প্রয়োজনীয় কাজ এখানে সমাধা করেন। নদীটির সাথে মাদরাসার যেই টিনশেড ঘর রয়েছে, এখানে ছাত্রাবাসের ছাত্রদের খাবার রান্না করা হয়।
ঐতিহ্যবাহী এ মাদরাসায় সুপার মাওলানা মিনহাজ উদ্দিনসহ শিক্ষক রয়েছে প্রায় আঠারো থেকে ২০ জন। যারা নিজ নিজ কার্য সম্পাদন করছেন।
সম্পাদক - আশরাফ ইকবাল, নির্বাহী সম্পাদক - বর্ষন মোহাম্মদ
© স্বত্ব সংরক্ষিত © ২০২৬ দৈনিক মুন্সিগঞ্জের বার্তা