হিজলের অঞ্চল বিক্রমপুর পরগণা। এ কথাটি শুধু একটি ভৌগোলিক পরিচয় নয়, এ যেন এক সাংস্কৃতিক স্বীকারোক্তি। বিক্রমপুর–মুন্সিগঞ্জের আনাচে–কানাচে হিজলগাছ ছড়িয়ে আছে শিকড়–বাকড়ের মতো; মাটির গভীরে যেমন তার বিস্তার, মানুষের স্মৃতির ভেতরেও তেমনি তার অনুপ্রবেশ। ফণীমনসার ঝোপে, শাটিবনে তাদের ছায়া পড়ে জল, কাদা আর নিঃশব্দ জীবনের ওপর।
মধুকর ডিঙা থেকে না জানি সে কবে চাঁদচম্পার কাছে—
এমনই হিজল, বট, তমালের নীল ছায়ায় বাংলার অপরূপ রূপ দেখেছিলেন রূপসী বাংলার কবি জীবনানন্দ দাশ। তাঁর কবিতায় হিজল কেবল একটি গাছ নয়, সে এক জলছায়ার অনুভব, এক নিঃসঙ্গ সৌন্দর্যের প্রতীক। বিক্রমপুরের হিজলগুলো যেন সেই কবিতারই জীবন্ত অনুবাদ।
এই ভাবনা নিয়েই একদিন আমি আর ডা. রাফি মোটরসাইকেল নিয়ে বেরিয়ে পড়ি। সিরাজদিখান বাজার থেকে আমাদের গন্তব্য দক্ষিণ তাজপুর গ্রামের নূরাতলীর চক। চক বললেও আসলে তা বিলের ধারে এক নিভৃত প্রান্ত।
সিরাজদিখান উপজেলা পরিষদ থেকে নূরাতলীর দূরত্ব মাত্র দুই কিলোমিটার। কিন্তু এই দুই কিলোমিটার পথ যেন সময়কে ধীরে হাঁটতে শেখায়। রাস্তার দুপাশে ধানক্ষেত, জলজমি, কোথাও পুরোনো বাড়ির ভাঙা উঠোন—সব মিলিয়ে এক শান্ত, ধীর ল্যান্ডস্কেপ। মনে হয় এই পথ দ্রুত পাড়ি দেওয়ার জন্য নয়; দেখার জন্য, অনুভব করার জন্য।
চলতে চলতে গ্রামের শেষপ্রান্তে পৌঁছে গেলাম। হঠাৎ করেই চোখে পড়ে বিলের কিনারায় দাঁড়িয়ে থাকা সেই গাছ।
নূরাতলীর হিজল গাছটি।
প্রকাণ্ড, নিশ্চল, অথচ জীবন্ত এক উপস্থিতি। একটি গাছ, না কি গাছের জোড়া—তা ঠিক বোঝা যায় না। কারণ তার শিকড়গুলো মাটির স্তুপে এমনভাবে ঢেকে গেছে যে গাছটি যেন ভূমির সঙ্গে একাকার হয়ে আছে। গাছটির প্রকৃত বয়স কত, তা নিশ্চিতভাবে কেউ বলতে পারে না। তবু স্থানীয়দের কাছে এটি পরিচিত ‘পাঁচশত বছরের হিজল গাছ’ নামেই।
দক্ষিণ তাজপুর গ্রামের বহু ঘটনার নীরব সাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে আছে এই শতবর্ষী হিজল। কত প্রজন্ম এসেছে–গেছে, কত বন্যা জল উঠেছে–নেমেছে, কিন্তু গাছটি রয়ে গেছে তার জায়গায়—বিলের বুকে প্রহরীর মতো।
নিসর্গবিদেরা জানান, হিজলের আদি নিবাস অস্ট্রেলিয়া, মালয়েশিয়া ও বাংলা–ভারত অঞ্চলে। ‘হিজল’ শব্দটি বাংলা; সংস্কৃতে এর নাম ‘নিচুল’। ‘জলন্ত’, ‘নদীক্রান্ত’ নামেও পরিচিত এই গাছ। ইংরেজি নাম ইন্ডিয়ান ওক, বৈজ্ঞানিক নাম Barringtonia acutangula। তবে এসব পরিচয়ের বাইরে হিজল মূলত জলের গাছ—নদী, বিল, খালের সঙ্গেই তার আত্মীয়তা।
নূরাতলীর হিজল গাছটিও যেন বিলের বুকের সবুজ আকাশ। তার ডালপালা চারদিকে ছড়িয়ে পড়লে তৈরি হয় এক মায়াবী পরিবেশ। পাখিদের নিরব বাসস্থান, বিকেলের হালকা বাতাসে পাতার ফিসফাস। কাণ্ডগুলো ঘন ছাইরঙা, শিকড়গুলো মাটির স্তুপে ঢাকা—যেন শতাব্দীর ভার বহন করছে নীরবে।
এখানে দাঁড়িয়ে বোঝা যায়, কত মানুষের স্মৃতি এই গাছের সঙ্গে জড়িয়ে আছে। কারও শৈশব, কারও প্রেম, কারও দীর্ঘ অপেক্ষা—সবকিছুর ছায়া লেগে আছে এই হিজলে। এটি শুধু একটি গাছ নয়; এটি মুন্সিগঞ্জের প্রাচীন জনপদের এক অবিনাশী কিংবদন্তি, আমাদের বেঁচে থাকা ইতিহাসের এক অনন্য অধ্যায়।
বিকেল গড়িয়ে সন্ধ্যা নামলে আমরা ফিরে চলি নন্দনকোণার দিকে—বিখ্যাত তেতুল চা খেতে। কিন্তু পেছনে ফেলে আসা বিলের মাঝে, অন্ধকার নামার সঙ্গে সঙ্গে নূরাতলীর হিজল গাছটি জেগে থাকে। ইতিহাসকে বুকে নিয়ে, ছায়া মেলে ধরে চুপচাপ, অথচ অমলিন।