এ. জেড. এ মুকুল
সাম্প্রতিককালে নওগাঁর আত্রাইয়ে অনুষ্ঠিত একটি সমাবেশে একটি ভিডিও ভাইরাল হয়েছে, ”যেখানে একটি সমাবেশে জামায়াতপন্থি আইনজীবি ব্যারিস্টার শাহরিয়ার কবির বলছেন, যদি আপনি জান্নাতে যেতে চান, জামায়াতে ইসলাম করাটা আপনার আমার নৈতিক দায়িত্ব। আর জান্নাতে যেতে না চাইলে কোন সমস্যা নেই। কারণ ৭২ এর মধ্যে প্রথম কাতারে থাকতে চাইলে জামায়াতে ইসলাম করতে হবে। এর মধ্যে আর দ্বিতীয় কোন অপশন নাই বাবারা।”
আমি ইসলামের স্কলার নই, কিন্তু আমার সীমিত সামর্থ্য দিয়ে সাধারন মুসলমান হিসেবে বলতে চাই, ব্যারিস্টার শাহরিয়ার কবিরের এ বক্তব্যটি সম্পূর্ণ শিরক। প্রকৃতপক্ষে জান্নাত দেওয়ার মালিক আল্লাহতায়ালা। পবিত্র কুরআনে সূরা আত-তাওবার ১১১ আয়াতে বলা হয়েছে, ”আল্লাহ মুমিনদের থেকে তাদের জীবন ও সম্পদ জান্নাতের বিনিময়ে কিনে নিয়েছেন।”
সাম্প্রতিককালে ‘ডিএসএন’ নামের একটি ইউটিউব চ্যানেলে প্রকাশিত ভিডিওতে শিশির মনির মন্তব্য করেন, ‘রোজা ও পূজা একই মুদ্রার এপিঠ ও ওপিঠ।’ উনার বক্ত্যব থেকে স্পষ্ট তিনি রাজনৈতিক ফায়দা হাসিল করতে এবং ইচ্ছাকৃতভাবে বাংলাদেশের মুসলিম জনসাধারণের ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত করতে এ বক্তব্য দিয়েছেন। তাঁর বক্তব্য সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে ধর্মপ্রাণ মুসলমানদের মধ্যে তীব্র ক্ষোভ ও উদ্বেগের সৃষ্টি হয়।
ইসলাম ধর্মে বিশ্বাসীরা নিরাকার আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য রোজা রাখেন, যার প্রতিদান আল্লাহ নিজ হাতে দেবেন। অন্যদিকে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির বাংলাদেশে সনাতন ধর্মাবলম্বীরা দেব-দেবীর আকৃতিতে পূজা করেন। রোজাকে পূজার সঙ্গে তুলনা করা বা উদাহরণ হিসেবে ব্যবহার করা মুসলিম ধর্মাবলম্বীদের কাছে কখনোই গ্রহণযোগ্য নয়। এ ধরনের উক্তি সরাসরি ধর্মীয় বিশ্বাসে আঘাতের শামিল এবং তা সমাজে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টির অপপ্রয়াস মাত্র।
‘গত ২২ নভেম্বর, ২০২৫ জামায়াতে ইসলামীর কেন্দ্রীয় কর্মপরিষদের সদস্য ও সাবেক সংসদ সদস্য (শনিবার) সন্ধ্যায় চট্টগ্রাম নগরীর জিইসি কনভেনশন হলে অনুষ্ঠিত নির্বাচনী দায়িত্বশীল সম্মেলনে শাহজাহান চৌধুরী বক্তব্য প্রদানকালে বলেন, “নির্বাচন শুধু জনগণ দিয়ে নয়, যার যার নির্বাচনী এলাকায় প্রশাসনের যারা আছে, তাদের সবাইকে আমাদের আন্ডারে নিয়ে আসতে হবে। আমাদের কথায় উঠবে, আমাদের কথায় বসবে, আমাদের কথায় গ্রেপ্তার করবে, আমাদের কথায় মামলা করবে।” তবে আমরা অনেকেই জানি, বাংলাদেশ জামায়াত ইসলামীর সুপারিশে অর্ন্তবর্তীকালীন সরকার বিভিন্ন প্রশাসনিক পদে জামায়াতপন্থী লোকজন নিয়োগ দিয়েছে। এজন্য হয়তো শাহজাহান চৌধুরীর মতো লোকজনের এতো আত্নবিশ্বাস ও এতো অহংকার।
শাহজাহান চৌধুরীর বক্তব্যে রাষ্ট্রীয় প্রশাসনের পেশাদারত্ব, নিরপেক্ষতা ও মূল স্পিরিট স্পষ্টভাবে ব্যাহত করেছে। তিনি গনতন্ত্রের প্রতি আস্থাশীল নয় এটাও স্পষ্ট। তার এই বক্তব্য ঘিরে দেশ-বিদেশে আমাদের জনশক্তি এবং সাধারণ জনগণের মাঝেও বিরূপ প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হয়েছে।
বর্তমানে জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমানকে সাংবাদিকরা প্রায়ই জামায়াতে ইসলামীর ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তোলেন। তিনি বলেন, ‘শুধু একাত্তর নয়, ১৯৪৭ সাল থেকে এ পর্যন্ত জামায়াতে ইসলামীর দ্বারা কেউ যদি কোনো কষ্ট পান, কারো যদি কোনো ক্ষতি হয়ে থাকে, আমি সব ব্যক্তি ও সংগঠনের পক্ষে নিঃশর্ত ক্ষমা চাই। আপনারা আমাদের ক্ষমা করে দেবেন।’ এখানে স্পষ্ট তিনি কৌশলে একাত্তর সালের মহান মুক্তিযুদ্ধকে নিয়ে কথা এরিয়ে গেছেন। ইদানিংকালে তরুণ ভোটারদের আকৃষ্ট করার জন্য জামায়াতে ইসলামী মুক্তিযুদ্ধের নতুন ন্যারেটিভে তৈরি করে বলছেন, জামায়াত মুক্তিযুদ্ধের বিরুদ্ধে ছিল না, ছিল ভারতের বিরুদ্ধে। প্রকৃতপক্ষে তৎকালীন ভারততো বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে ছিলেন। সুতরাং ঘুরফিরে একই কথা তারা স্বাধীনতা ও মুক্তিযুদ্ধ বিরোধী। । গত কয়েকদিন আলোচনা চলছে ভারতের সাথে জামায়াতের আমীরের গোপন মিটিং নিয়ে। বিগত ৫ টা মাস গোপন রেখেছিল জামায়াতে ইসলামী। ওরা বলছে জামাতের আমীরের মুখ দিয়েই তো এটা বের হইছে। বাস্তবতা হল, জামাতের আমীরের এই ঘটনা জেনে গিয়েছিল রয়টার্স, কুল রক্ষায় ভারতের দোষ দিয়ে বলে বললেন ভারতের অনুরোধে গোপন রেখেছেন তিনি। এভাবে এদেশের রাজনীতি করে ভারতের অনুরোধ রাখা জামায়াত ইসলামীও আওয়ামী লীগের মতো ভারতপন্থী।
সচেতন নাগরিক হিসেবে মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ে জামায়াতে ইসলামীর বক্ত্যব্য কেউ বিশ্বাস করবে না এটা স্বাভাবিক। ১৯৪১ সালে বৃটিশ ভারতে জামায়াতে ইসলামীর জন্ম। ১৯৪৭ সালে ভারত-পাকিস্থান বিভাজনের পর এই দলটি ভারত ও পাকিস্তানে যথাক্রমে জামায়াতে ইসলামী হিন্দ (ভারত) ও জামায়াতে ইসলামী পাকিস্তান নামে পৃথক স্বাধীন সংগঠনে বিভক্ত হয়। জামায়াত ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের স্বাধীনতার এবং পাকিস্তান বিভক্তির বিরোধীতা করেছিল। ১৯৭১ সালের গনহত্যায়, খুন ও ধর্ষনসহ নানা অভিযোগ রয়েছে তাদের। ১৯৭২ সালে সরকার জামায়াতকে রাজনীতি থেকে নিষিদ্ধ ঘোষণা করে এবং দলের নেতারা পাকিস্তানে নির্বাসনে চলে যান। তাদের গণহত্যা আর ধর্ষণের পড়েও কেউ সেই হত্যার পক্ষে সাফাই গাইবে, গোলাম আজমের আদর্শের চাষাবাদ করে অপরাধ খুজবেন কি করে, তারা হয়তো মানসিকভাবে বিকারগ্রস্থ। যদি শান্তি কমিটি, রাজাকার, আলবদর আর আলশামস না থাকত তবে একাত্তরে পাকিস্তানি সেনারা বাংলাদেশে এত মানুষকে হত্যা করতে পারত না এটাই স্পষ্ট।
সর্বশেষ বলতে চাই, গত ১৫ মাসে মহান মুক্তিযুদ্ধ, স্বাধীনতা ও মুক্তিযোদ্ধাদের যেভাবে হেয় করা হয়েছে তা আমি কোন কালেই দেখি নাই। এটি নিয়ে অর্ন্তকালীন নীরব কেন সেটিও আমার জানা নেই। বিগত আওয়ামী লীগ সরকার মুক্তিযুদ্ধের একক মালিকানা নিয়েছেন বলে এদের খাটো করা হবে সেটার যুক্তি গ্রহনযোগ্য নয়। এ দেশের সচেতন মানুষ জানে যে, মহান মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহন করেছেন এ দেশের খেটে খাওয়া শ্রমিকসহ সর্বস্তরের মানুষ। সুতরাং আগমি নির্বাচনে সাধারন জনগন ভোটের মাধ্যমে জবাব দিবে তারা মহান মুক্তিযুদ্ধ, স্বাধীনতা ও মুক্তিযোদ্ধাদের প্রতি শ্রদ্ধাশীল কিনা? তাই আগামি নির্বাচন হবে মূলত মুক্তিযুদ্ধের স্বপক্ষের শক্তি ও মুক্তিযুদ্ধের বিরোক্ষের শক্তির মধ্যে।
লেখখ: গবেষক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক
সম্পাদক - আশরাফ ইকবাল, নির্বাহী সম্পাদক - বর্ষন মোহাম্মদ
© স্বত্ব সংরক্ষিত © ২০২৬ দৈনিক মুন্সিগঞ্জের বার্তা