ইঞ্জি. মো. শাহিদুল হাসান শাওন
সারা বাংলাদেশ আজ শোকের ছায়ায় নিমজ্জিত। দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনের পর সাবেক প্রধানমন্ত্রী এবং বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়া শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেছেন। দেশের রাজনীতির এক যুগান্তকারী নেত্রী হিসেবে তিনি শুধু নিজের দল নয়, সমগ্র রাজনীতিকে প্রভাবিত করেছেন। আজকের এই শোক কেবল একটি রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বের মৃত্যুর নয়, এটি বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের এক গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়ের সমাপ্তি।
বেগম খালেদা জিয়ার জন্ম হয়েছিল ১৯৪৫ সালের ১৫ আগস্ট, দিনাজপুরে। মধ্যবিত্ত পরিবারে বেড়ে ওঠা খালেদা জিয়ার শৈশব কেটেছে সাধারণ জীবনযাত্রার মধ্য দিয়ে। পারিবারিক মূল্যবোধ, শিক্ষার প্রতি আগ্রহ এবং সমাজের দায়িত্ববোধ ছিল তার জীবন দর্শনের অংশ। স্থানীয় বিদ্যালয় থেকে কলেজ পর্যন্ত পড়াশোনা সম্পন্ন করার পর তিনি জীবনের পারিবারিক দায়িত্বে মনোনিবেশ করেন।
১৯৬০ সালে তিনি তৎকালীন পাকিস্তান সেনাবাহিনীর কর্মকর্তা জিয়াউর রহমানের সঙ্গে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হন। এই বিয়ে তাঁর জীবনের দিক পরিবর্তন করে দেয়। স্বামীর রাজনৈতিক ও সামরিক জীবন তাকে সরাসরি রাজনীতির সঙ্গে পরিচিত করায়।
রাজনীতিতে খালেদা জিয়ার সক্রিয় পদার্পণ ঘটে ১৯৮১ সালে, যখন স্বামী রাষ্ট্রপতি হিসেবে নিহত হন। ওই সময়ে বিএনপি নেতৃত্বহীন হয়ে পড়ে। দলকে পুনর্গঠন এবং রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনার দায়িত্ব তিনি গ্রহণ করেন। ১৯৮৪ সালে বিএনপির চেয়ারপারসন নির্বাচিত হয়ে তিনি দলীয় নেতৃত্বের কেন্দ্রবিন্দুতে আসেন। এটি তাঁর রাজনৈতিক জীবনের একটি মাইলফলক।
১৯৯১ সালে তিনি বাংলাদেশের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন। এটি ছিল গণতান্ত্রিক সংসদীয় ব্যবস্থায় একটি নতুন অধ্যায়। তাঁর নেতৃত্বে দেশ বহু রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হয়। অবকাঠামোগত উন্নয়ন, বেসরকারি খাতের প্রসার, আন্তর্জাতিক সম্পর্ক উন্নয়ন এবং অর্থনীতির স্থিতিশীলতা ছিল তাঁর সরকারের মূল অগ্রাধিকার। একই সঙ্গে রাজনৈতিক সংঘাত, বিরোধী দলীয় আন্দোলন এবং হরতালের প্রভাবও দেখা গেছে।
রাজনীতিতে তার দীর্ঘদিনের প্রতিদ্বন্দ্বী ছিলেন শেখ হাসিনা। এই দুই নেত্রীর মধ্যে রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা বাংলাদেশের রাজনীতিতে প্রভাবশালী ভূমিকা রাখে। কখনো এটি দেশের রাজনৈতিক ব্যবস্থাকে শক্তিশালী করেছে, আবার কখনো বিতর্ক ও সংঘাতের সৃষ্টি করেছে। এই দ্বন্দ্বই বাংলাদেশকে বহুদলীয় গণতান্ত্রিক রাজনীতির দিকে ধাবিত করেছে।
শেষ কয়েক বছরে বেগম খালেদা জিয়ার স্বাস্থ্য অবনতির দিকে মনোযোগ ছিল দেশজুড়ে। বয়সজনিত জটিলতার সঙ্গে সঙ্গে লিভার, শ্বাসপ্রশ্বাসের সমস্যা এবং অন্যান্য দীর্ঘমেয়াদি অসুস্থতা তাঁকে দীর্ঘদিন চিকিৎসাধীন রেখেছে। শেষ পর্যন্ত চিকিৎসাধীন অবস্থায় তিনি চলে গেলেন।
আজকের এই মৃত্যু শুধু একজন রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বের নয়; এটি বাংলাদেশের রাজনীতির এক যুগান্তকারী অধ্যায়ের সমাপ্তি। তিনি দেশকে দেখিয়েছেন, একটি মহিলা নেত্রীরও নেতৃত্বে কতটুকু দৃঢ়তা এবং প্রতিশ্রুতি থাকতে পারে। তাঁর রাজনৈতিক জীবন, সংগ্রাম এবং অবদান ভবিষ্যত প্রজন্মের জন্য গুরুত্বপূর্ণ পাঠ।
বেগম খালেদা জিয়ার জীবন ও কর্ম বাংলাদেশে রাজনৈতিক ইতিহাসের এক গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় হিসেবে চিহ্নিত হয়ে থাকবে। সমর্থক বা সমালোচক, যে কেউ তাকে স্মরণ করবে শক্তিশালী এবং সাহসী একজন নেত্রী হিসেবে, যার নেতৃত্ব দেশকে বহু চ্যালেঞ্জের মুখে দাঁড় করিয়েছে। আজ পুরো দেশ শোকাহত, কিন্তু তাঁর রাজনৈতিক উত্তরাধিকার চিরস্থায়ী।
সম্পাদক - আশরাফ ইকবাল, নির্বাহী সম্পাদক - বর্ষন মোহাম্মদ
© স্বত্ব সংরক্ষিত © ২০২৬ দৈনিক মুন্সিগঞ্জের বার্তা