প্রিন্ট এর তারিখঃ জুলাই ৭, ২০২৬, ৫:০৮ পি.এম || প্রকাশের তারিখঃ অগাস্ট ২৭, ২০২৫, ৯:৩৫ এ.এম

নাজির আহমাদ মিয়াজী
পৃথিবীতে ক্রমশ মানুষের অস্তিত্ব হুমকির মুখে পড়ছে। এত আগেই এমনটি হওয়ার কথা ছিলনা।আজকে বিশ্বব্যাপী জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মানুষের প্রাত্যহিক জীবনকে বিপর্যস্ত করে তুলছে ক্রমাগত। বৈশ্বিক জলবায়ু ও পরিবেশ বিপর্যয়ের ফলে বহু পরিবেশবাদী সংগঠন গড়ে উঠছে, স্থানীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে সম্মেলন হচ্ছে।
দিনেদিনে পৃথিবীটা যেনো মানুষের বাসযোগ্য আবাসভূমির অবস্থানটা হারিয়ে ফেলছে। তার নিজের দেশের পরিবেশ সুরক্ষায় অনেক দেশ বিপুল অর্থ বরাদ্দ দিচ্ছে। এমনকি তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণের জন্য চিফ হিট অফিসারের পদও দেখতে পাই আজকাল। জনসচেতনতা বাড়ানোর চেষ্টার কোনো কমতি নেই।
ঘটনা যাইহোক, পৃথিবীর পরিবেশটাতো শুরু লগ্নে এমন নাজুক অবস্থায় ছিলনা। শীতকালে প্রচণ্ড শৈত্যপ্রবাহ আর গরমকালে অসহনীয় দাবদাহ, বন্যা, খরা, অনাবৃষ্টি, ভূমিকম্প, ঘূর্ণিঝড় সবগুলোই পরিবেশ ও মানবজীবনের জন্য চরম হুমকি।
কোরআন আমাদেরকে বলছে মহান আল্লাহ পৃথিবী ও এর পরিবেশ মানুষের জন্যে উপযাোগী এবং বাসযোগ্য করেই সৃষ্টি করেছেন। তারপর তিনি মানুষকে দুনিয়ায় প্রেরণ করেছেন। মানুষের মৌলিক প্রয়োজন মেটানোর জন্য প্রয়োজনীয় সবকিছু পরিমাণমতোই সৃষ্টি করেছেন। আল্লাহ বলছেন- "আমি প্রত্যেক বস্তুকে পরিমিতরূপে সৃষ্টি করেছি"। (সুরা কামার, আয়াত:৪৯)
মহান রব কখনো-সখনো তার গোলামদের পরীক্ষা করার জন্য সামান্য কষ্ট দেন; তবে স্বাভাবিকভাবে এমনিতেই দুর্যোগ বা বিপদ দেন না। বরং মানুষের নিজেদের কৃতকর্মের কারণে এসব বিপর্যয়ের সম্মুখীন হতে হয়।
আল্লাহ বলেন, জলে ও স্থলে মানুষের কৃতকর্মের ফলে বিপর্যয় ছড়িয়ে পড়ছে। আল্লাহ তাদেরকে তাদের কৃত কর্মের স্বাদ আস্বাদন করাতে চান, যাতে তারা ফিরে আসে।' (সুরা রুম, আয়াত: ৪১)
মানুষ যখন স্রষ্টার বেঁধে দেওয়া সীমা অতিক্রম করবে, তখন সে ধ্বংস ও বিনাশের দিকে যাবে অনিবার্যভাবেই।
পরিবেশ আমাদের অস্তিত্বেরই অংশ, পরিবেশটাকে যতো সুরক্ষিত রাখতে পারব, আমরা ততো ভালো থাকব। বৈশ্বিক পরিবেশ বিপর্যয়ের এ অবস্থা থেকে উত্তরণের জন্য প্রিয়নবী হযরত মোহাম্মদ (স.) প্রায় দেড়হাজার বছর আগে কী ফর্মুলা দিয়ে গেছেন, চলুন আমরা উল্লেখযোগ্য কয়েকটি ফর্মুলা দেখে আসি।
১.বৃক্ষরোপণ কর্মসূচী:
গাছপালা প্রকৃতির প্রাণ। পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষায় গাছপালা হলো এক অনন্য উপাদান।
আজকাল অনেক স্বেচ্ছাসবী সংগঠন বৃক্ষরোপণ কর্মসূচী চালু করেছে, বিষয়টি প্রশংসনীয়। তবে যথার্থ পরিচর্যার ব্যবস্থাও করতে হবে।
বৃক্ষরোপণের প্রতি উৎসাহ দিয়ে প্রিয়নবী (স.) যে বক্তব্যটি দিয়েছেন, এটা যথেষ্ট।
নবী কারীম (স.) বলেন -"যদি নিশ্চিতভাবে জানো যে কিয়ামত এসে গেছে, ঐ মুহূর্তেও যদি হাতে একটি গাছের চারা থাকে, যা রোপণ করা যায়, তবে সেই চারাটি রোপণ করবে"। (বুখারী, আদাবুল মুফরাদ)
অন্য হাদীসে এসেছে, যে ব্যক্তি বিনা প্রয়োজনে গাছ কাটবে, আল্লাহ তার মাথা আগুনের মধ্যে নিক্ষেপ করবেন। (বায়হাকি, হাদীস ১৪০)
মহানবী (স.) আরো বলেছেন, যে মুসলমান কোনো বৃক্ষ রোপণ করবে, তারপর তা থেকে কোনো মানুষ, পশু-পাখি ভক্ষণ করবে, এর বিনিময়ে কিয়ামতে তার জন্য একটি সদকার সওয়াব রয়েছে। (মুসলিম শরীফ, হাদীস:৪০৫৩)
২. প্রাকৃতিক সম্পদের সুষ্ঠু ব্যবহার :
প্রাকৃতিক সম্পদ মহান আল্লাহর অপার দান।সহজলভ্য বলে এসব অপচয় ও অপব্যবহার করা যাবে না। প্রাকৃতিক সম্পদ মনে করে যখন এর যত্রতত্র ব্যবহার করা শুরু হয়, তখন জনপদে বিপর্যয় নেমে আসে।
পাহাড়, পর্বত প্রাকৃতিক সম্পদ। পাহাড় কেটে ব্যবসা করা কিংবা ঘরবাড়ি নির্মাণ, রাস্তাঘাট তৈরি ইত্যাদি কারণে পরিবেশে মারাত্মক প্রভাব পরছে।পাহাড়, পর্বত মহান আল্লাহর সৃষ্টি। পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষায়, জমিন স্থির রাখা, ভূকম্পনের পরিমাণ হ্রাস করণে পাহাড় পেরেক হিসেবে কাজ করে। এ ব্যপারে কোরআন আমাদের কে বহু আগেই জানিয়েছে।
'পাহাড়কে আমি পেরেক হিসেবে সৃষ্টি করেছি।' (সুরা নাবা)
যমিনের পেরেক বিনষ্ট হলে তাতে কম্পন সৃষ্টি হবে। কাজেই পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষায় এ যাতীয় যত প্রাকৃতিক সম্পদ আছে এসবের রক্ষণাবেক্ষণ ও সুষ্ঠু ব্যবহার নিশ্চিত করতে হবে।
৩. ভূমির পরিকল্পিত ব্যবহার: আমরা এমন এক আশ্চর্য সমাজ ব্যবস্থায় আছি যেখানে কতিপয় স্বার্থান্বেষী ব্যক্তির কারণে ফসলি জমি হারিয়ে যাচ্ছে, মাটি কেটে সাধারণ কৃষকদের আবাদি জমি কেড়ে নিচ্ছে অনেক এলাকায়। এতে করে আমাদের কৃষি ও কৃষকের পাশাপাশি পরিবেশ তার ভারসাম্য হারাচ্ছে ক্রমাগত। কৃষি জমিতে চাষাবাদ ও বনায়ন অব্যাহত রাখতে হবে।
জমির পরিকল্পিত ব্যবহার নিশ্চিত করতে হাদীসে তাগিদ এসেছে। হযরত জাবির ইবনু আব্দুল্লাহ (রা.) থেকে বর্ণিত। রাসুলে কারীম (স.) বলেছেন, যার কাছে জমি আছে সে যেন তা নিজে চাষাবাদ করে।যদি সে নিজে চাষাবাদ না করে তবে যেন তার কোনো ভাইকে চাষাবাদ করতে দেয়।' (মুসলিম,হাদীস:৩৭৭৩)
৪.পানি দূষণ রোধ: পানি প্রাকৃতিক পরিবেশের অন্যতম উপাদান। যে অঞ্চলে সুপেয় ও বিশুদ্ধ পানি এভেইলেবল, সে অঞ্চলের মানুষজন সুস্থতার ক্ষেত্রে এগিয়ে। অতএব নিজেদের কারণে যেন পানি দূষিত না হয়, এ বিষয়ে গণসচেতনতা বাড়াতে হবে আমাদের।
রাসুলে আকরাম (স.) পানিকে নিরাপদ ও দূষণমুক্ত রাখতে উৎসাহিত করেছেন। প্রখ্যাত সাহাবী হযরত আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত। প্রিয়নবী (স.) বলেছেন, "তোমাদের কেউ যেন আবদ্ধ পানিতে প্রস্রাব করে অত:পর সেখানে গোসল না করে।"(বুখারী, হাদীস: ২৩৬)
৫. বায়ু দূষণ প্রতিরোধ : পৃথিবীর চলমান সভ্যতায় বায়ু দূষণ মানুষের রোগব্যাধির অন্যতম কারণ। দূষিত বাতাস প্রকৃতির সজীবতা ও নির্মলতাকে বিনষ্ট করে। বায়ু দূষণের ফলে বায়ুমণ্ডলে ওজন স্তরও হালকা হয়ে যাচ্ছে। বায়ুকে দূষণ মুক্ত রাখতে বিশ্বনবী মোহাম্মদ (স.) এর নির্দেশনাটি প্রণিধানযোগ্য। যা আজো যুগের চাহিদা পূরণ করছে।
প্রসিদ্ধ সাহাবী হযরত মু'আজ ইবনে জাবাল (রা.) থেকে বর্ণিত। রাসুলে আকরাম (স.) বলেছেন, " তোমরা অভিশাপ ডেকে আনে এরূপ তিনটি কাজ থেকে বিরত থাকো। চলাচলের রাস্তায়, রাস্তার মোড়ে কিংবা ছায়াদার স্থানে মলমূত্র ত্যাগ৷ করা থেকে।' (আবু দাউদ, হাদীস:২৬)
গবেষকগণের মতে, যত্রতত্র মলমূত্র ত্যাগ বায়ুদূষণের সবচেয়ে বড় কারণ।
৬. জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ : জলবায়ু পরিবর্তন, পরিবেশের ভারসাম্য নষ্ট হওয়ার পেছনে জীববৈচিত্র্য ধ্বংস সবচেয়ে বেশি দায়ী। এজন্য বণ্যপ্রাণী রক্ষায় বিভিন্ন দেশে আলাদা মন্ত্রণালয়ও চালু হচ্ছে। একটা অঞ্চলের পরিবেশ সুন্দর রাখা কিংবা তাপমাত্রা সহনীয় পর্যায়ে রাখতে কমপক্ষে ২৫-৩০ ভাগ বনায়ন থাকা অপরিহার্য। পৃথিবীর অধিকাংশ অঞ্চলে পর্যাপ্ত বনায়ন নেই। আমাদের ভুলে গেলে চলবে না যে বনাঞ্চলকে আঁকড়ে ধরে জীববৈচিত্র্য বেঁচে থাকে।
কাজেই গৃহপালিত ও বন্য পশুপাখির প্রতি আমাদের দয়ার্দ্র আচরণ করতে হবে।
সাহাবীরা রাসুলে কারীম (স.) কে জিজ্ঞেস করলেন, হে আল্লাহর রাসুল (স.) জীবজন্তুর প্রতি দয়া প্রদর্শনের জন্যও কি আমাদের পুরস্কার আছে? রাসুল (স.) বললেন, হা। প্রত্যেক দয়ার্দ্র হৃদয়ের মানুষের জন্য পুরস্কার আছে।" (বুখারী)
পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষা ও জলবায়ু পরিবর্তন রোধে বিশ্বনবী জনাবে মুহাম্মাদুর রাসুলুল্লাহ (সা.) এর দেড়হাজার বছর আগের দেয়া ফর্মুলা চলমান সভ্যতায়ও কতটা যুগোপযোগী, তা একজন চিন্তাশীল ও সচেতন পাঠকের কাছে সহজেই অনুমেয়। নবীজী (স.) এর দেয়া ফর্মুলা বাস্তবায়নের মধ্য দিয়ে একটি ভারসাম্যপূর্ণ পরিবেশ ও সুন্দর আগামী গড়ে তোলা সম্ভব।
পরিবেশ সুস্থ থাকলে মানুষ সুস্থ থাকবে, পরিবেশ দূষিত থাকলে মানুষজনও ক্ষতিগ্রস্ত হবে। কাজেই আসুন, পরিবেশ রক্ষায় আমরা নিজেরা সচেতন হই, আমার চারপাশটাকেও সচেতন করে তুলি। তাহলেই আমাদের অনাগত প্রজন্ম পাবে একটি বাসযোগ্য সুন্দর পৃথিবী।
লেখক : শিক্ষক, উপস্থাপক, আবৃত্তি ও অভিনয় শিল্পী।