
আসন্ন নির্বাচনে মোবাইল ব্যাংকিং ও ইন্টারনেট ব্যাংকিং সেবায় কড়াকড়ি
এ.জেড.এ মুকুল
দৈনন্দিন নানা প্রয়োজনে নগদ টাকার চাহিদা মেটাচ্ছে হাতে থাকা মোবাইল ফোন। মুহূর্তেই মোবাইলের মাধ্যমে এক জায়গা থেকে অন্য জায়গায় পৌঁছে যাচ্ছে টাকা। ফলে বেড়েই চলেছে মোবাইল ব্যাংকিংয়ের গ্রাহক সংখ্যা বা মোবাইল ফিন্যান্সিয়াল সার্ভিসেস (এমএফএস)। বাংলাদেশে বর্তমানে মোট নিবন্ধিত বাংলাদেশে মোবাইল ব্যাংকিং (গঋঝ) অ্যাকাউন্টধারীর সংখ্যা প্রায় ২৩.৮৬ কোটি (২৩৮.৬ মিলিয়ন) ছাড়িয়েছে । এর মধ্যে প্রতিদিন গড়ে প্রায় ২ কোটি ৪০ লাখ বার লেনদেন হয়, যার পরিমাণ ৫ হাজার ৮৩৩ কোটি টাকার বেশি। এক গবেষণায় দেখা গেছে, এমএফএসের হিসাবধারীদের ৫২ শতাংশের বেশি গ্রামে বসবাস করছেন এবং ব্যবহারকারীদের মধ্যে প্রায় ৪২ শতাংশ নারী।
ভাবিয়া করিও কাজ, করিয়া ভাবিও না বাংলায় এই প্রবাদ বাক্যটি নীতি প্রনয়নের পূর্বে আমরা কেউ চিন্তা করি না। ধরেন, আপনি মুন্সিগঞ্জের একটি রেষ্টুরেন্টে ৮ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ইং সপরিবারে খেতে গেলেন আপনার হাতে নগদ টাকা নাই, মোট বিল আসলো ২ হাজার টাকা তখনতো বিকাশ, রকেটের মতো মোবাইল ব্যাংকিং সেবা (এমএফএস) সহায়তা নেওয়া নিতে হতে পারে। কিন্তু সেই দিন আপনি তা পারবেন না। শুধু সেটা ৮ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ইং নয়, আগামি ৮ থেকে ১৩ ফেব্রুয়ারি এই সেবা সীমিত থাকবে। আবার ধরেন, ৮ তারিখ আপনার প্রতিষ্ঠানের বেতনের টাকা একাউন্টে আসছে কিন্তু বাসা ভাড়ার ১৫ হাজার টাকা বাড়িওয়ালা দিতে পারছেন না। কী একটা অবস্থা, কেন জানি মনে হয় বাংলাদেশ চলছে কবি শামসুর রাহমানের 'উদ্ভট উটের পিঠে চলেছে স্বদেশ' কবিতার মতো এ দেশের প্রতিটি সেক্টরের সাধারন মানুষের ভাল-মন্দ দেখার কেউ নেই। এখন অনেকে বলতে পারেন আপনি এই ৬ দিন নগদ টাকা নিয়ে ঘুরাফেরা করবেন, দেশের নিরাপত্তার যে অবস্থা তাতে এটি আরো ঝুঁকিপূর্ণ বিষয়। যে কোন সময় ছিনতাইয়ের স্বীকার হতে পারেন এমনকি যেতে পারেন মানুষের জীবন।
আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে নির্বাচন কমিশনের চাহিদার পরিপ্রেক্ষিতে মোবাইল ব্যাংকিং ও ইন্টারনেট ব্যাংকিং সেবায় কড়াকড়ি আরোপের নির্দেশনা আসছে। নতুন সিদ্ধান্ত অনুযায়ী বিকাশ, রকেট ও নগদের মতো মোবাইল ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিসে (এমএফএস) এক হাজার টাকার বেশি লেনদেন করা যাবে না। একই সঙ্গে নির্বাচনকালীন সময়ে ইন্টারনেট ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে ব্যক্তি থেকে ব্যক্তি টাকা পাঠানো সাময়িকভাবে বন্ধ রাখার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এমনকি ব্র্যাক ব্যাংকের আস্থা, সিটি ব্যাংকের সিটিটাচ, ডাচ্-বাংলা ব্যাংকের নেক্সাস পে-সব অ্যাপেই এই নিষেধাজ্ঞা কার্যকর হবে।
বাস্তবতা হলো যে ব্যক্তির ভোট টাকায় বিক্রি হয় সেটা আগেও বিক্রি হতে পারে এমনকি মৌখিক আশ্বাসের মাধ্যমে বিক্রি হতে পারে। সুতরাং সমাজে কতিপয় অসৎ ব্যক্তির জন্য এ সেবাটি সীমিত করা সাধারন মানুষের কাছে গ্রহনযোগ্য নয়।
বর্তমানে মোবাইল ব্যাংকিং গ্রাহকরা দিনে ৫০ হাজার টাকা পর্যন্ত লেনদেন করতে পারলেও নির্বাচনের সময় এই সীমা কমিয়ে ১০ হাজার টাকা করা হচ্ছে। প্রতিটি একক লেনদেনের সর্বোচ্চ সীমা হবে এক হাজার টাকা। এক দিনে একজন গ্রাহক সর্বোচ্চ ১০ বার লেনদেন করতে পারবেন। এই বিধিনিষেধ ৮ ফেব্রুয়ারি থেকে শুরু হয়ে ১৩ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত কার্যকর থাকবে।
ইন্টারনেট ব্যাংকিং ব্যবহার করে এখন দিনে ১০ লাখ টাকা পর্যন্ত লেনদেন করা যায়। তবে বিএফআইইউ-এর প্রস্তাব অনুযায়ী, নির্বাচনের ওই কয়েক দিন ব্যক্তি থেকে ব্যক্তি ফান্ড ট্রান্সফার সুবিধা পুরোপুরি বন্ধ থাকতে পারে। এর ফলে অ্যাপস বা ওয়েব পোর্টাল ব্যবহার করে অন্য কাউকে টাকা পাঠানো সম্ভব হবে না।
আশা করি, নির্বাচন কমিশন এ বিষয়টি আরো ভেবে-চিন্তে বাংলাদেশ ব্যাংককে সিদ্ধান্ত গ্রহন করা জন্য বলবেন।
অনেকে বলতে পারেন, এই কয়েক দিন নগদ টাকা নিয়ে চলাফেরা করলেই তো হয়। কিন্তু দেশের সামগ্রিক নিরাপত্তা পরিস্থিতিতে এটি আরও ঝুঁকিপূর্ণ। ছিনতাইয়ের আশঙ্কা যেমন থাকে, তেমনি বিপন্ন হতে পারে মানুষের জীবনও। লেখক ও গবেষক
সম্পাদক - আশরাফ ইকবাল, নির্বাহী সম্পাদক - বর্ষন মোহাম্মদ
© স্বত্ব সংরক্ষিত © ২০২৬ দৈনিক মুন্সিগঞ্জের বার্তা