গতকাল ৩০শে জুলাই ছিল কিংবদন্তী বাঙালি মনীষী, বিজ্ঞানী, সাহিত্যিক এবং শিক্ষাবিদ কাজী মোতাহার হোসেনের জন্মদিন। ১৯৩৮ সালের এই দিনে কুষ্টিয়া জেলার কুমারখালী উপজেলার যদুবয়রা গ্রামে তিনি জন্মগ্রহণ করেন। তার জীবন ছিল জ্ঞান, বিজ্ঞান, সাহিত্য ও সংস্কৃতির এক অসাধারণ মিলনস্থল, যা বাংলাদেশের বুদ্ধিবৃত্তিক ইতিহাসে এক উজ্জ্বল অধ্যায় রচনা করেছে। আমাদের আজকের আয়োজন তাকে নিয়েই।
প্রারম্ভিক জীবন, শিক্ষা ও মেধার উন্মোচন
কাজী মোতাহার হোসেনের পৈত্রিক নিবাস ছিল ফরিদপুর জেলার পাংশা উপজেলার বালিয়াকান্দি গ্রামে। তবে তার জন্ম হয়েছিল মায়ের মামার বাড়ি, কুষ্টিয়ার কুমারখালীতে। শৈশব থেকেই তিনি ছিলেন অসাধারণ প্রতিভার অধিকারী। তার প্রথাগত শিক্ষা শুরু হয় স্থানীয় পাঠশালায়। এরপর তিনি ১৯১৭ সালে কলকাতা মাদ্রাসা থেকে প্রবেশিকা পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন এবং পরবর্তীতে ১৯২১ সালে কলকাতা প্রেসিডেন্সি কলেজ থেকে পদার্থবিজ্ঞানে বি.এ. অনার্স ডিগ্রি অর্জন করেন। তার মেধার পরিচয় এখানেই শেষ নয়। ১৯২৩ সালে তিনি কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পদার্থবিজ্ঞানে এম.এ. এবং একই বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ১৯২৫ সালে গণিতে এম.এ. ডিগ্রি লাভ করেন। ১৯৩৮ সালে তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পদার্থবিজ্ঞানে পিএইচ.ডি. ডিগ্রি অর্জন করেন। এই শিক্ষাজীবনের প্রতিটি ধাপে তিনি তার প্রজ্ঞা ও অধ্যবসায়ের ছাপ রেখে গেছেন, যা তাকে ভবিষ্যতে একজন বহুমুখী প্রতিভাধর মানুষ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করে।
কর্মজীবন- শিক্ষকতা, গবেষণা ও সাংগঠনিক অবদান
কাজী মোতাহার হোসেনের কর্মজীবনের মূল ভিত্তি ছিল শিক্ষকতা। ১৯২৫ সালে তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পদার্থবিজ্ঞান বিভাগে প্রভাষক হিসেবে যোগদান করেন। তার নিরলস প্রচেষ্টা ও গবেষণার ফলস্বরূপ ১৯৪৫ সালে তিনি একই বিভাগের অধ্যাপক হিসেবে নিযুক্ত হন এবং পরবর্তীতে বিভাগীয় প্রধানের দায়িত্বও সফলভাবে পালন করেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে তার প্রায় ৪১ বছরের শিক্ষকতা জীবন ছিল জ্ঞান বিতরণ এবং নতুন প্রজন্মকে অনুপ্রাণিত করার এক নিবেদিত অধ্যায়। তার শিক্ষাদান পদ্ধতি ছিল অত্যন্ত আকর্ষণীয় এবং তিনি শিক্ষার্থীদের মধ্যে বিজ্ঞানমনস্কতা ও যুক্তিবাদী চিন্তাভাবনা গড়ে তুলতে সচেষ্ট ছিলেন।
শিক্ষকতার পাশাপাশি তিনি ছিলেন একজন দক্ষ গবেষক। তার গবেষণার মূল ক্ষেত্র ছিল পদার্থবিজ্ঞান ও গণিত। তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিসংখ্যান গবেষণা ও প্রশিক্ষণ ইনস্টিটিউটের প্রতিষ্ঠাতা পরিচালক ছিলেন, যা বাংলাদেশে পরিসংখ্যান গবেষণার একটি গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র হিসেবে পরিচিতি লাভ করে। তার তত্ত্বাবধানে অসংখ্য গবেষক পরিসংখ্যানের বিভিন্ন শাখায় গুরুত্বপূর্ণ গবেষণা পরিচালনা করেন।
কাজী মোতাহার হোসেন শুধু একজন শিক্ষক বা গবেষক ছিলেন না, তিনি একজন সফল সংগঠক ছিলেন। পূর্ব-পাকিস্তান বিজ্ঞান অগ্রগতির প্রতিষ্ঠাতা হিসেবে তিনি বিজ্ঞান প্রচারে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। তিনি বিভিন্ন বৈজ্ঞানিক ও সাহিত্যিক সংগঠনের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন এবং সেগুলোর মাধ্যমে সমাজের সর্বস্তরে জ্ঞান ও বিজ্ঞান ছড়িয়ে দিতে সচেষ্ট ছিলেন। তিনি বিজ্ঞানকে সাধারণ মানুষের কাছে সহজবোধ্য করে তোলার জন্য নিরন্তর কাজ করেছেন।
সাহিত্যকর্ম- যুক্তি, মানবতাবাদ ও কুসংস্কারের বিরুদ্ধে সংগ্রাম
কাজী মোতাহার হোসেনের বহুমুখী প্রতিভার এক উজ্জ্বল দিক ছিল তার সাহিত্যকর্ম। তিনি শুধু একজন বিজ্ঞানীই ছিলেন না, তিনি ছিলেন একজন স্বনামধন্য সাহিত্যিক। তার লেখনীতে প্রবন্ধ, গল্প, নাটক এবং কবিতাসহ বিভিন্ন সাহিত্য রূপের সমাবেশ ঘটেছিল। তার সাহিত্যের মূল বিষয় ছিল বিজ্ঞান, যুক্তি, মানবতাবাদ এবং সামাজিক কুসংস্কারের বিরুদ্ধে তীব্র প্রতিবাদ। তিনি মনে করতেন, সমাজকে প্রগতির পথে এগিয়ে নিতে হলে কুসংস্কার ও অন্ধ বিশ্বাস থেকে মুক্তি পাওয়া জরুরি।
তার বিখ্যাত প্রবন্ধগ্রন্থ 'সঞ্চারণ' (১৯৫০) বাংলা সাহিত্যে এক নতুন দিগন্ত উন্মোচন করে। এই গ্রন্থে তিনি বিজ্ঞান, ধর্ম, দর্শন ও সাহিত্য নিয়ে তার গভীর চিন্তাভাবনা তুলে ধরেন। তিনি মুক্তচিন্তা এবং যুক্তিবাদী বিশ্লেষণের উপর জোর দিয়েছিলেন। তার লেখার মাধ্যমে তিনি বাঙালি মুসলিম সমাজে প্রচলিত বিভিন্ন কুসংস্কার ও গোঁড়ামির বিরুদ্ধে এক সাহসী কণ্ঠস্বর হিসেবে আবির্ভূত হন। তিনি কলমের মাধ্যমে সমাজের পশ্চাৎপদতাকে চ্যালেঞ্জ করেছিলেন এবং মানুষকে বিজ্ঞান ও যুক্তির পথে আহ্বান জানিয়েছিলেন।
এছাড়াও, কাজী মোতাহার হোসেনের সাহিত্যে সমাজ সচেতনতা এবং মানবতাবাদের প্রতিফলন ঘটেছিল। তিনি সমাজের বৈষম্য এবং অবিচারের বিরুদ্ধে প্রতিবাদী ছিলেন। তার গল্প ও নাটকগুলোতেও তিনি সমাজের বিভিন্ন দিক তুলে ধরেছেন এবং মানবতাবাদের জয়গান গেয়েছেন।
ব্যক্তিগত জীবন, দর্শন ও অনুপ্রেরণা
কাজী মোতাহার হোসেনের ব্যক্তিগত জীবন ছিল অত্যন্ত সাদামাটা এবং নিরহংকার। তিনি ছিলেন একজন ধার্মিক ব্যক্তি, তবে ধর্মীয় বিশ্বাস কখনোই তার বিজ্ঞানমনস্কতাকে বাধাগ্রস্ত করেনি। তিনি মনে করতেন, বিজ্ঞান ও ধর্ম একে অপরের পরিপূরক হতে পারে এবং উভয়ই সত্যের অন্বেষণে সহায়ক। তার দর্শন ছিল মানবতাবাদ এবং মুক্তচিন্তার উপর প্রতিষ্ঠিত। তিনি এমন একটি সমাজের স্বপ্ন দেখতেন যেখানে মানুষ যুক্তি ও জ্ঞানের দ্বারা পরিচালিত হবে, কুসংস্কারের দ্বারা নয়। তিনি মানুষের মধ্যে সহনশীলতা, সহমর্মিতা এবং ভালোবাসার বন্ধন গড়ে তোলার পক্ষপাতী ছিলেন।
কাজী মোতাহার হোসেন ছিলেন একজন অসাম্প্রদায়িক চেতনার মানুষ। তিনি বাঙালি জাতিসত্তার বিকাশে বিশ্বাসী ছিলেন এবং ভাষা আন্দোলন ও মুক্তিযুদ্ধে তার পরোক্ষ ও প্রত্যক্ষ সমর্থন ছিল। তিনি তার প্রজ্ঞা, মেধা এবং কর্মের মাধ্যমে বাংলাদেশের বুদ্ধিজীবী মহলে এক অনন্য স্থান করে নিয়েছিলেন। তার চিন্তাভাবনা এবং আদর্শ বহু মানুষকে অনুপ্রাণিত করেছে এবং আজও করছে।
সম্মাননা ও স্বীকৃতি- এক কর্মময় জীবনের প্রতিদান
কাজী মোতাহার হোসেন তার অসাধারণ কর্মের স্বীকৃতিস্বরূপ বিভিন্ন সম্মাননা ও পুরস্কারে ভূষিত হয়েছেন। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো-
১৯৬০ সালে বাংলা একাডেমি পুরস্কার (প্রবন্ধ)- তার সাহিত্যকর্মের স্বীকৃতিস্বরূপ এই সম্মাননা লাভ করেন।
১৯৬৬ সালে পাকিস্তান সরকার কর্তৃক সিতারা-ই-ইমতিয়াজ- বিজ্ঞান ও শিক্ষায় তার অবদানের জন্য তাকে এই উপাধিতে ভূষিত করা হয়।
১৯৭৯ সালে বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক একুশে পদক- স্বাধীন বাংলাদেশে তার সামগ্রিক অবদানের জন্য তিনি এই সর্বোচ্চ রাষ্ট্রীয় সম্মাননা লাভ করেন।
এই পুরস্কারগুলো তার কর্মময় জীবনেরই প্রতিচ্ছবি। তিনি আমৃত্যু জ্ঞানচর্চা, বিজ্ঞান প্রচার এবং মানবতাবাদের প্রতিষ্ঠায় কাজ করে গেছেন। ১৯৮১ সালের ৯ ই অক্টোবর এই মহান ব্যক্তিত্ব পরলোকগমন করেন।
কাজী মোতাহার হোসেন ছিলেন একজন প্রকৃত বাঙালি মনীষী, যিনি তার জ্ঞান, মেধা ও কর্মের মাধ্যমে আমাদের সমাজকে আলোকিত করে গেছেন। তার জন্মদিন স্মরণে আমরা এই মহান শিক্ষাবিদ, বিজ্ঞানী ও সাহিত্যিকের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা নিবেদন করছি। তার আদর্শ ও অবদান আগামী প্রজন্মের জন্য চিরকাল অনুপ্রেরণার উৎস হয়ে থাকবে। তার দেখানো পথে আমরা যদি বিজ্ঞানমনস্কতা, যুক্তি এবং মানবতাবাদের চর্চা করতে পারি, তবেই তার প্রতি আমাদের প্রকৃত শ্রদ্ধা নিবেদন করা হবে।
লেখক- ত্বাইরান আবির, লেখক ও অনুবাদক
সম্পাদক - আশরাফ ইকবাল, নির্বাহী সম্পাদক - বর্ষন মোহাম্মদ
© স্বত্ব সংরক্ষিত © ২০২৬ দৈনিক মুন্সিগঞ্জের বার্তা