প্রিন্ট এর তারিখঃ সেপ্টেম্বর ৩০, ২০২৬, ৩:৪৭ পি.এম || প্রকাশের তারিখঃ সেপ্টেম্বর ২১, ২০২৬, ৯:০১ এ.এম
টানা ১০ বছরের এমপি মৃনাল : প্রশাসন খবরদারিতে ছিলেন সিদ্ধহস্ত
দেখা থেকে লেখা - ২
টানা ১০ বছরের এমপি মৃনাল : প্রশাসন খবরদারিতে ছিলেন সিদ্ধহস্ত
সালেহীন তুহিন
ফাও সংসদ সদস্য তাও একবার নয় ২ দুইবার। ফাও এমপি এ কারণে যে , প্রথমবার অর্থাৎ ১০ম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে দেশের প্রধান বিরোধী দল বিএনপি নির্বাচনে অংশগ্রহণ করেনি ফলে একতরফা নির্বাচনে তিনি বিজিত হন। তাও বাংলাদেশের জাতীয় সংসদ নির্বাচনের ইতিহাসের রেকর্ড ১৫৩ জন বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হন যার অত্যন্ত সৌভাগ্যবান একজন তিনি। কেন্দ্রীয় আওয়ামী লীগ নেতার সুবাদে এবং প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার অতীব আস্থাভাজন হওয়ায় এই বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় জয়লাভ। আর একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বহু জনশ্রুতি বিদ্যমান দিনের ভোট রাতে নিস্পন্নের মাধ্যমে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। অর্থাৎ দু দুটি জাতীয় সংসদ নির্বাচনে তিনি একরকম প্রতিদ্বন্দ্বীহীন এমপি নির্বাচিত হন। এভাবেই তিনি টানা ১০ বছর মুন্সিগঞ্জ তিন আসনে এমপির আসনে অধিষ্ঠিত ছিলেন।
তিনি বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় কার্যনির্বাহী পরিষদের মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক সম্পাদক অ্যাডভোকেট মৃনাল কান্তি দাস। টানা ১০ বছর এমপি থাকাকালীন তার সম্বন্ধে মোটাদাগে অত্যন্ত সংক্ষিপ্ত পরিসরে এবং সরল সমীকরণে সহসাই বলা যায় জগদ্দল পাথরের মত প্রশাসনের উপর চেপে বসে ছিলেন। আর তা খুব সহজেই সম্ভব হয়েছে এ কারণে যে তিনি বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় নেতা এবং তদানীন্তন প্রধানমন্ত্রীর বিশ্বস্ত সহযোগী ছিলেন। হলে সংশ্লিষ্ট আসনের স্থানীয় প্রশাসনের নড়াচড়া করার মতো কোনো ব্যবস্থাই তিনি রাখেননি। অধিকন্তু অত্যন্ত সূচকের রাজনীতিবি হিসেবে সুখ্যাতি ছিল তার গোটা আসন জুড়ে। চতুর রাজনীতিবিদ হিসেবে কোপ মারার ক্ষেত্রে তার জুড়ি মেলা ভার। কেননা সংসদ সদস্য নির্বাচিতদের ক্ষেত্রে গুনে গুনে বেছে নিলেন ২০১৪ সালকে। তিনি নিশ্চিতভাবেই জানতেন উক্ত নির্বাচনে দেশের তৎকালীন প্রধান বিরোধীদল বিএনপি অংশগ্রহণ করবে না। তাই কোন রকমের দলীয় প্রধানকে ম্যানেজ করতে সমর্থ হলেই কেল্লাফতে। তবে তিনি এতটাও আশা করেননি ইতিহাস ব্রেকের ১৫৩ জন বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় সংসদ নির্বাচিত এর তালিকায় তার নামও থাকবে। তবে এই তালিকায় নাম উঠানোর জন্য তাকে প্রচন্ড দৌড়ঝাঁপ এবং তোয়াজ তদবির এবং লবিং করতে হয়েছে। আশ্চর্যের বিষয় হচ্ছে বিনা ভোটে এবং বিনা প্রতিদ্বীনদের নির্বাচিত একজন এমপির বডি ল্যাঙ্গুয়েজ দেখে তাকে বোঝার কোন উপায় ছিল না। এমপির তকমা নিয়ে গোটা আসন জুড়ে তিনি দাবরে বেরিয়েছেন যত্রতত্র। তিনি মুন্সীগঞ্জের রাজনীতিতে তার অবস্থান সুসংহত করার জন্য হেন কোন প্রচেষ্টা নেই যা তিনি করেননি। মুন্সিগঞ্জ সদরে কোনরকম সুবিধা করতে না পেরে তিনি বেছে নেন গজারিয়া উপজেলাকে। দৌর্দন্ড প্রতাপে গজারিয়া উপজেলার সর্বত্র তিনি দাপিয়ে বেড়াতেন। তিনি রীতিমতো গজারিয়া উপজেলা কে তার দখলী সত্তায় পরিণত করেছিলেন। গজারিয়া উপজেলা প্রশাসন সর্বদা তার ভয়ে ভীত সন্ত্রস্ত থাকতে হতো। গজারিয়ায় তার বিরুদ্ধে কথা বলার মত কারো সাহস ছিল না।
যত প্রচেষ্টা তিনি চালিয়েছেন দিনশেষে রাজনৈতিকভাবে তিনি সফল হতে পারেননি। তিনি কেন্দ্রীয় আওয়ামী লীগের মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক সম্পাদক নির্বাচিত হলে তাতেও সমালোচনার ঝড় ওঠে। এ নিয়ে দলীয় অভ্যন্তরে নেতৃবৃন্দের মধ্যে চরম অসন্তোষ বিরাজ করে। কেননা মুক্তিযুদ্ধে নেতৃত্বদানকারী সংগঠন আওয়ামী লীগে তখন উক্ত পদের জন্য যোগ্য কয়েক লাখ মুক্তিযোদ্ধা ছিলেন। অথচ একজন অযুক্তিযুদ্ধাকে গ্রুপিং লবিং এর মাধ্যমে উক্ত পদে অধিষ্ঠিত করা হয়। দলীয় পথ পদবী বলতে ওই মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক সম্পাদক তার জীবনের শেষ কথা। কেননা তিনি যে আসনের এমপি অর্থাৎ মুন্সিগঞ্জ ৩ যা মুন্সিগঞ্জ সদর এবং গজারিয়া উপজেলা নিয়ে গঠিত। দলীয়ভাবে এ আসনে তিনি ছিলেন এক কথায় অবাঞ্চিত। টানা ১০ বছর এমপি ছিলেন। ইত্যাবসরে কয়েক দফা মুন্সিগঞ্জ জেলা আওয়ামী লীগের কাউন্সিল অধিবেশন অনুষ্ঠিত হয়েছে। দুর্ভাগ্যের বিষয় হচ্ছে কোন কাউন্সিলেই তাকে নিমন্ত্রণপত্র পর্যন্ত প্রদান করা হয়নি। তবে তিনি কাউন্সিল অধিবেশনে অংশগ্রহণ করতেন কেন্দ্রীয় নেতৃবৃন্দ তথা ওবায়দুল কাদের এবং মির্জা আজমদের পিছু পিছু। তার জন্য চরম দুর্ভাগ্যের বিষয় ছিল টানা ১০ বছর এমপি থাকাকালে তিনি মুন্সিগঞ্জ জেলা আওয়ামী লীগের কার্যনির্বাহী পরিষদের ন্যূনতম সদস্য পর্যন্ত নির্বাচিত হতে পারেননি। তাই সহসাই বলা যায় মুন্সিগঞ্জ জেলা আওয়ামী লীগে তিনি ছিলেন অনুপ্রবেশকারী। তার সময়কালে মুন্সিগঞ্জ জেলা আওয়ামী লীগ সহ গজারিয়া উপজেলা মুন্সিগঞ্জ পৌরসভা এবং পৌরসভা সহ সংশ্লিষ্ট আসনের ১৭ টি ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়েছে। আশ্চর্যের বিষয় হচ্ছে উল্লিখিত সম্মেলনগুলোতে মৃনাল কান্তি দাসের অনুসারীরা কেউই কোন পথ পদবী অর্জন করতে সমর্থ হননি। সদর উপজেলা আওয়ামী লীগের সম্মেলনে তার অনুসারীদের কারো নাম পর্যন্ত উত্থাপন করতে পারেননি। অর্থাৎ সদরে তিনি রাজনৈতিকভাবে ন্যূনতম আচর কাটতে পারেননি। কেবল গজারিয়া উপজেলা পরিষদের সম্মেলনে স্বাধীনতা চিকিৎসক ফোরামের নেতা ডাক্তার তপনকে নিয়ে তিনি বেশ মাতামাতি করেছিলেন। কিন্তু তাতেও তিনি শতভাগ ব্যর্থ হন। সুতরাং ১০ বছরে একজন এমপি স্থানীয় রাজনীতিতে প্রভাব বলয় শুন্যের ঘরে অবস্থান করেছে যা বলাই বাহুল্য। তবে তিনি এমপির ক্ষমতা বলে গজারিয়া উপজেলার আটটি ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান নিজের লোকদের ওর সাথে সক্ষম হয়েছিলেন।
রাজনৈতিকভাবে ব্যর্থ হলেও তিনি প্রশাসনকে তটস্থ রাখতে এবং তাদের উপর খবরদারি করার ক্ষেত্রে ছিলেন সিদ্ধহস্ত। রাজনৈতিকভাবে কোলে উঠতে না পেরে তার যত রাগ ক্রোধ সবকিছুই ছিল প্রশাসনের উপর। মুন্সিগঞ্জ জেলা এবং পুলিশ প্রশাসন ভালো করি ওয়াকিবহাল ছিলেন এমপি মিনাল কান্তি দাসের সঙ্গে তদানীন্তন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার বেশ সখ্যতা ছিল। মূলত এই সখ্যতাকেই তিনি কাজে লাগিয়ে প্রশাসনের উপর ছরি ঘুরাতেন। আর প্রশাসনেরও কিছু করার উপায় ছিল না তার সকল ধরনের আবদার মুখ বুজে সহ্য করতে হয়। এক্ষেত্রে দু একটি দৃষ্টান্তই হতে পারে প্রশাসনকে তিনি কতটা বিপদাপন্ন অবস্থায় উন্নীত করেছিলেন। প্রায় বছর দশেক পূর্বের কথা মুন্সিগঞ্জ লঞ্চঘাট এলাকায় মুন্সিগঞ্জ সদর থানার একজন পুলিশ কনস্টেবল কে এমপির অনুসারী লোকজনরা তুচ্ছ ঘটনায় বেদম প্রহার করে। এক্ষেত্রে সরকারি কাজে বাধা প্রদান এবং পুলিশ এসল্টের ধারায় মামলা হবে এটাই সহজাত। কিন্তু দুর্ভাগ্যের বিষয় হলো পুলিশ এতটাই অসহায় ছিল যে তারা কিছুই করতে পারেনি। নূন্যতম একটি মামলা ও তারা করতে সক্ষম হননি। এমপির অনুসারী লোকজনরা ওপেন শত শত লোকের সামনে পুলিশকে মারধর করে পার পেয়ে যায় উক্ত এমপির বদন্যতায়। বেগোরে মার খাওয়া ওই পুলিশ কনস্টেবলের বিচারের বাণী নীরবে-নিভৃতে পরিশেষে আপোষ মীমাংসায় পরিসমাপন ঘটে। এমপি মৃণাল কান্তি দাস প্রায় ক্ষেত্রেই পুলিশকে রাজনৈতিক কাজে ব্যবহার করতেন যার ভুরিভুরি দৃষ্টান্ত আজও মানুষের নিকট জলজেন্ত। শুধু কি তাই কোন কোন ক্ষেত্রে তিনি পুলিশকে জবর দখলের কাজেও ব্যবহার করতেন। পুলিশ কারো জমি জায়গা তখন করার প্রতিবিধান না থাকলেও এমপির নির্দেশে উল্লেখিত অবৈধ কাজ করতে বাধ্য হতেন। দৃষ্টান্ত অনুযায়ী এমপি মৃণাল কান্তি দাসের অত্যন্ত আস্থাভাজন তার বাড়ির পার্শ্ববর্তী এলাকার অধিবাসী বাবুলদাস এবং মুকুল দাসের দোকান ঘর বলপূর্বক মুন্সিগঞ্জ থানা পুলিশ উত্তোলন করে দেন। মুন্সিগঞ্জ সদর থানা থেকে মাত্র ২০০ মিটার দূরত্বের স্থানীয় কালিবাড়ি সংলগ্ন বাবুল ফার্মেসী নামক উক্ত দোকান ঘরটি রীতিমত পুলিশ প্রহরায় উত্তোলিত হয়। সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত পুলিশ উপস্থিত থেকে অবৈধভাবে উক্ত দোকানটি নির্মাণের সহযোগিতা করেন। প্রকৃত জায়গার মালিক এ বিষয়ে নানাভাবে বাধা প্রদানের চেষ্টা করলেও পুলিশের সঙ্গে কুলিয়ে উঠতে ব্যর্থ হন। এছাড়াও তার প্রতিপক্ষ রাজনৈতিক দলের নেতাকর্মিতো বটেই নিজ দলের তার বিরাগভাজন নেতাকর্মীদের পুলিশের মাধ্যমে নাজেহাল করতে ছাড়েননি তিনি। ভুয়া মামলা দিয়ে তাদেরকে হেনস্থা করা হত। এভাবেই তিনি প্রশাসনের মাথার উপর বসে তার বিভিন্ন ধরনের অবৈধ কর্মকান্ড বাস্তবায়ন করতেন।
সম্পাদক - আশরাফ ইকবাল, নির্বাহী সম্পাদক - বর্ষন মোহাম্মদ
© স্বত্ব সংরক্ষিত © ২০২৬ দৈনিক মুন্সিগঞ্জের বার্তা