মাদক চক্রের টার্গেটে মুন্সিগঞ্জের তরুণ সমাজ!
ত্বাইরান আবির
মুন্সিগঞ্জ নদীমাতৃক এই জেলায় গ্রামের শিশু থেকে শুরু করে শহরের যুবক-যুবতী এখন বিভিন্ন ধরনের মাদকদ্রব্যের সঙ্গে ঝুঁকছে, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অভিযান চললেও সমস্যা কমছে না, বরং নানামুখী নতুন মাত্রা নিয়েই বিস্তার পাচ্ছে।
সম্প্রতি বাংলাদেশ মেডিক্যাল ইউনিভার্সিটি (বিএমইউ) পরিচালিত একটি জাতীয় জরিপে দেখা গেছে, দেশজুড়ে প্রায় ৮২ লাখ জনগণ এক বা একাধিক অবৈধ মাদক সেবন করে। এতে প্রায় ৫ শতাংশ জনগণ তরুণ হিসেবে মাদকসেবনে জড়িত এবং অধিকাংশই ১৮-২৫ বয়সী। অর্থাৎ, পড়ুয়া বা কর্মজীবী বয়সের মধ্যে। অধিকাংশই প্রথমবার ড্রাগ ব্যবহার করছে কম বয়সেই, ৮-১৭ বছর বয়সের মধ্যে প্রায় ৩৩ শতাংশ।
মুন্সিগঞ্জেও এই জাতীয় প্রবণতা দেখা যাচ্ছে। প্রতিদিনের সংবাদে দেখা যায়, ইয়াবা, গাঁজা ও অন্যান্য মাদকদ্রব্যের সাথে কিশোর-তরুণদের জড়িত থাকার অপরাধে ধারাবাহিকভাবে গ্রেফতার করা হচ্ছে।
মাদক কেবল আইনী বা অপরাধমূলক ইস্যু নয়, এটি এখন সামাজিক ও জনস্বাস্থ্য ঝুঁকি। জাতীয় জরিপে দেখা গেছে যে, তরুণদের আসল ঝুঁকি শুরু হয় পরিবার ও সমাজের চাপ, বেকারত্ব, বন্ধুবান্ধবদের প্রভাব, মানসিক চাপ ও অস্থিরতার কারণে।
এমন পরিস্থিতি গ্রামে গ্রামে ছড়িয়ে পড়ছে এবং মুন্সিগঞ্জসহ দেশের নানান শহরেও মাঝে মাঝে দেখা যায় কিশোরদের মধ্যে মাদক গ্রহণ ও বিক্রির ঘটনায় স্থানীয়দের উদ্বেগ, যদিও সরকারি পরিসংখ্যান সরাসরি জেলা-ভিত্তিক প্রকাশ করে না। কিন্তু পুলিশ ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অভিযান থেকে স্পষ্ট যে, মুন্সিগঞ্জে এই ইস্যু বাস্তবে উপস্থিত।
গত এক বছরে মুন্সিগঞ্জের বিভিন্ন থানা ও এলাকা থেকে সর্বমোট কয়েকটি বড় মাদক-সংক্রান্ত ঘটনা পাওয়া গেছে- লৌহজংয়ের গোয়ালিমান্দ্রা এলাকায় যৌথ বাহিনী ১৮ জন সন্দেহভাজন মাদক ব্যবসায়ীকে গ্রেফতার করেছে। তাদের কাছ থেকে ইয়াবা, হেরোইন ও হেম্পসহ বিপুল পরিমাণ মাদক উদ্ধার করা হয়।
এছাড়াও সদর ও শ্রীনগর উপজেলা এলাকায় পৃথক অভিযানে ইয়াবা ট্যাবলেটসহ ড্রাগ ডিলারদের আটক করা হয়েছে।
পূর্বে একবার একজন ব্যক্তি ৮ কেজি হেম্পসহ গ্রেফতার হয়েছে, যা চক্রাকার ব্যবসার ইঙ্গিত দেয়।
এমনকি সদর উপজেলায় অস্ত্র ও মাদকসহ চারজনকে আটক করা হয়েছে, যার মধ্যে ইয়াবাসহ অন্যান্য অবৈধ দ্রব্যও ছিল।
এই ধরণের অভিযান দেখায়, জেলা প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনী মাদকবিরোধী অভিযান চালিয়ে যাচ্ছে, কিন্তু মাদক চক্রের কার্যক্রম ছাড়াও তার প্রতিক্রিয়া হিসেবে পুলিশ সদস্যদের বিরুদ্ধেও হামলার ঘটনা দেখা গেছে।
দেশজুড়ে জরিপ অনুযায়ী, মাদক সেবনের শুরুর বয়সই জুনিয়র পর্যায়ে এসেছে। এটি এখন কেবল বড়দের সমস্যা নয়। অনেক ক্ষেত্রে ১৮-২৫ বয়সের মানুষের মধ্যেই প্রথমবার মাদক গ্রহণের প্রবণতা প্রচুর।
যদি মুন্সিগঞ্জের অবস্থা বিশেষভাবে বিশ্লেষণ করা হয়, বলা যায়- জেলায় যুবসমাজের শিক্ষাগত, সামাজিক এবং কর্মসংস্থানের অবস্থা মাদকসেবনের ঝুঁকি বাড়িয়ে তুলছে বলে মনে করা হচ্ছে। অনানুষ্ঠানিক আলোচনায় বাবা-মা, শিক্ষক ও সমাজকর্মীরা জানিয়েছেন তাদের সন্তানরা বন্ধু সমাজের চাপ, বেকারত্ব ও কৌতূহলের কারণে 'একবার না করলেই নয়' এমন মনোবল নিয়ে মাদক-চক্রের সাথে বন্ধুত্ব গড়ে তুলছে।
তবে সরকারি কোনো শালীন পরিসংখ্যান জেলায় মাদকসেবনের সুনির্দিষ্ট হার প্রকাশ করে না। তথাপি পুলিশ ও মিডিয়া রিপোর্ট থেকে বোঝা যায় শেষ কয়েক বছরে ইয়াবা ও অন্যান্য নিষিদ্ধ ড্রাগের বাজারে তরুণদের অংশ নিয়মিত বাড়ছে।
মাদক নিয়ন্ত্রণে শুধু পুলিশ অভিযানই যথেষ্ট নয়, বিচার ব্যবস্থাও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। উদাহরণস্বরূপ, মুন্সিগঞ্জে এক কিশোরকে মাদকসহ ধরা পড়ায় এক বছর বন্দি ও জরিমানা উভয় সাজাই দিয়েছে মোবাইল কোর্ট, যদিও এটি ২০২৩ সালের ঘটনা। এই ঘটনা দেখায় যে, জেলা-ভিত্তিক ব্যবস্থাও কঠোর হতে পারে, তবে তারও পরিমাণ সচেতন থাকতে হবে।
জাতীয় পর্যায়ের গবেষকরা বলছেন মাদক সমস্যা শুধু আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর পক্ষে মোকাবেলা করার নয়, এটি সামাজিক, পরিবারিক ও জনস্বাস্থ্য ইস্যু, যেখানে পুনর্বাসন, চিকিৎসা ও সচেতনতা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে।
গ্রামের শিক্ষার্থী ও যুব সমাজের কাছে মাদক এখন শুধু নিষিদ্ধ দ্রব্য নয়, কিছু ক্ষেত্রে এটি বন্ধুদের সঙ্গে বহিরাগত হালকা মিশন বা দুর্বল মানসিক স্তর থেকে উত্তরণের পথ হিসেবে দেখা হচ্ছে। ফলে পরিবার ও সমাজ একযোগে কাজ না করলে এ সমস্যার সমাধান হবে না, যা অবশ্যই স্থানীয় ও জাতীয় পর্যায়ে সমন্বিত পরিকল্পনার দাবি রাখে।
একটা উদ্বেগজনক দিক হলো যে, মাদকসেবন কেবল ব্যবহারেই সীমাবদ্ধ থাকে না। অনেক সময় তরুণেরা জড়িত হয়ে পড়ছে অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে। যেমন- চুরি, ডাকাতি বা সহিংস ঘটনা। এ ব্যাপারে যদিও সরাসরি মুন্সিগঞ্জ-ভিত্তিক গবেষণা বা কমপ্লিট পরিসংখ্যান নেই, অন্যান্য এলাকার অভিজ্ঞতা ও মিডিয়া রিপোর্ট বলছে, যুব সমাজ মাদক গ্রহণের জন্য অর্থ জোগাতে অপরাধে জড়িয়ে পড়ছে।
মাদকবিরোধী অতিরিক্ত কার্যক্রম (যেমন, সচেতনতা প্রচার, স্বাস্থ্য ও পুনর্বাসন কেন্দ্র স্থাপন, পরিবার-সম্পর্কের দৃঢ়তা এবং স্কুল-কলেজ পর্যায়ে সুস্থ কার্যক্রম) মাদক প্রবণতা কমাতে সাহায্য করবে।
এছাড়া পুলিশ ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে শুধু গ্রেফতার ও রেইডের ওপর ভিত্তি করে নয়, বরং কিশোরদের জন্য নতুন সুযোগ, কোথায় সাহায্য পাবেন, সে বিষয়ে শিক্ষা ও উপদেশ-প্রদান চালাতে হবে।
আশির দশকে আমাদের দেশে হেরোইনের আগ্রাসন ঘটে। ওই দশকের শেষ দিকে ফেনসিডিল মাদক রাজ্যের চালিকাশক্তি হিসেবে আবির্ভূত হয়। নব্বইয়ের দশকের শেষ দিকে ইয়াবার আগমন ঘটে মাদক রাজ্যে। প্রথম দিকে এ আগ্রাসনকে তেমন গুরুত্ব দেওয়া হয়নি। এখন ইয়াবার থাবায় আক্রান্ত দেশের প্রায় প্রতিটি এলাকা। জেলার অভিজাত যুবসমাজের একটি উল্লেখযোগ্য অংশ ইয়াবা নেশায় আসক্ত। যেকোনো পরিবার এবং সমাজের জন্য মাদকাসক্ত ব্যক্তি হুমকিস্বরূপ। মাদকাসক্ত ব্যক্তি অন্যায় কাজ করতে দ্বিধা বোধ করে না। তারা সমাজের অনেক ক্ষতি করে থাকে। মাদকাসক্তির কারণেই চাঁদাবাজি, ছিনতাই-রাহাজানি, ডাকাতি ও খুনখারাবির ঘটনা বৃদ্ধি পাচ্ছে এবং অপরাধের সঙ্গে জড়িয়ে পড়ে; যা সমাজে অপরাধপ্রবণতা বৃদ্ধিসহ বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করে।
বর্তমানে মাদক ব্যবসায়ী ও মাদকসেবীর তালিকা দিনে দীর্ঘ হচ্ছে। কোনভাবে থামানো যাচ্ছেনা এ অবৈধ মাদককারবার। ফলে সব চেয়ে ক্ষতি গ্রস্থ হচ্ছে যুব সমাজ। মাদকের বিস্তৃতি ভয়াবহ রূপ নিয়েছে। যুবসমাজ ব্যাপক হারে মাদকাসক্ত হয়ে পড়ছে। মাদকে আক্রান্ত যুবসমাজ ধ্বংসের পথে। বর্তমান সমাজে মাদক জন্ম দিচ্ছে একের পর এক অপরাধ। শুধু মাদকের কারণে ছেলের হাতে বাবা মা ভাই ও খুন স্ত্রী হাতে স্বামী, স্বামীর হাতে স্ত্রী, প্রেমিকের হাতে প্রেমিকা, প্রেমিকার হাতে প্রেমিক খুন হওয়ার কথা পত্র পত্রিকায় খবর বের
জেলায় মাদকের বিস্তৃতি ভয়াবহ রূপ নিয়েছে।যুবসমাজ ব্যাপক হারে মাদকাসক্ত হয়ে পড়ছে। মাদকে আক্রান্ত যুবসমাজ ধ্বংসের পথে। বর্তমান সমাজে মাদক জন্ম দিচ্ছে একের পর এক অপরাধ। মাদকের ছোঁয়ায় সম্ভাবনাময় যুবসমাজ অধঃপতনের চরম শিখরে উপনীত হচ্ছে। মাদক এখন সহজলভ্য। শহর-নগর, গ্রামসহ মফস্বল এলাকায়ও হাত বাড়ালেই পাওয়া যায়। প্রজন্ম থেকে প্রজন্ম বিধ্বংসকারী মাদকের বিস্তার সমাজে যেভাবে বৃদ্ধি পাচ্ছে তাতে সচেতন অভিভাবক মহল উদ্বিগ্ন।
বিশ্লেষকরা বলছেন, মাদক ব্যবস্থাপনা শুধু আইনী কঠোরতার মাধ্যমেই সমাধান হবে না, বরং সমাজ, পরিবার ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের অংশগ্রহণ প্রয়োজন।
মুন্সিগঞ্জে মাদক প্রবণতা বৃদ্ধি একটি সংবেদনশীল ও জটিল ইস্যু। এখানকার তরুণ সমাজকে রক্ষা করতে হলে এখনই বিভিন্ন সামাজিক, শিক্ষা ও স্বাস্থ্য ব্যবস্থা জোরদার করতে হবে। শুধু আইনশৃঙ্খলা বাহিনী অভিযান নয়, পরিবার, শিক্ষক, মনোবিদ ও সমাজকর্মীদের সমন্বিত উদ্যোগ এখন অতীব জরুরী।
সম্পাদক - আশরাফ ইকবাল, নির্বাহী সম্পাদক - বর্ষন মোহাম্মদ
© স্বত্ব সংরক্ষিত © ২০২৬ দৈনিক মুন্সিগঞ্জের বার্তা