ইঞ্জি. মো. শাহিদুল হাসান শাওন
একটি গ্রামের নাম—খাসমহল বালুচর। সেখানকার এক সাধারণ কৃষক পরিবারে ১৯৫৮ সালের ২রা মে জন্ম নিয়েছিলেন এক শিশু, যাঁর ভবিষ্যৎ একদিন ছুঁয়ে যাবে জাতিসংঘের সদর দপ্তর। তিনি জনাব নজরুল ইসলাম—বর্তমানে ঝিকুট ফাউন্ডেশন সাধারণ পরিষদের সভাপতি, আর অনেকের কাছে অনুপ্রেরণার এক বাস্তব প্রতিচ্ছবি।
শৈশব ছিল সাদামাটা, সুযোগ ছিল সীমিত। কিন্তু স্বপ্ন ছিল বিস্তৃত। শিক্ষার প্রতি অদম্য আগ্রহই তাঁকে এগিয়ে নিয়েছে ধাপে ধাপে। ১৯৭৩ সালে এসএসসি, ১৯৭৫ সালে এইচএসসি, ১৯৭৭ সালে বিএসসি এবং ১৯৮১ সালে ফলিত গণিত ও কম্পিউটার সায়েন্সে এমএসসি সম্পন্ন করেন। যে সময় কম্পিউটার বিজ্ঞান ছিল খুবই সীমিত পরিসরের একটি বিষয়, সে সময়েই তিনি এই নতুন ধারার জ্ঞানকে নিজের ভবিষ্যৎ হিসেবে বেছে নেন। এই সিদ্ধান্ত তাঁর দূরদৃষ্টি ও আত্মবিশ্বাসের পরিচয় বহন করে।
শিক্ষাজীবনের পর তিনি পেশাজীবন শুরু করেন শিক্ষকতা দিয়ে। ১৯৭৮ সালে নিজ এলাকার খাসমহল বালুচর উচ্চবিদ্যালয়ে শিক্ষকতা করেন প্রায় এক বছর। পরে বাংলাদেশ মিলিটারি একাডেমিতে চার বছর শিক্ষক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। ছাত্রদের সঙ্গে কাটানো এই সময় তাঁকে শুধু একজন শিক্ষকই বানায়নি; গড়ে তুলেছে একজন দায়িত্বশীল পথপ্রদর্শক হিসেবে।
উচ্চতর শিক্ষার লক্ষ্যে তিনি থাইল্যান্ডের এশিয়ান ইনস্টিটিউট অব টেকনোলজি (অওঞ), ব্যাংককে অধ্যয়ন করেন। সেখান থেকে উচ্চতর ডিগ্রি অর্জনের পর তিনি তথ্যপ্রযুক্তি খাতে পেশাগত জীবনকে এগিয়ে নেন। কৃষিব্যাংক, প্রশিকা, এলজিইডি এবং কানাডিয়ান হাই কমিশনে কম্পিউটার বিশেষজ্ঞ হিসেবে দক্ষতা ও সততার সঙ্গে দায়িত্ব পালন করেন।
১৯৯৮ সালে ইন্টারন্যাশনাল সিভিল সার্ভিস কমিশনে উত্তীর্ণ হয়ে তিনি জাতিসংঘে যোগ দেন আইসিটি বিশেষজ্ঞ হিসেবে। জাতিসংঘের সদর দপ্তরসহ বিভিন্ন দেশের আঞ্চলিক কার্যালয়ে প্রায় ২০ বছর দায়িত্ব পালন করেন। এসময় জাতিসংঘের পাসপোর্ট নিয়ে পৃথিবীর বহু দেশ ভ্রমণ করেন, বহুজাতিক পরিবেশে কাজ করেন এবং প্রযুক্তির মাধ্যমে আন্তর্জাতিক প্রশাসনে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখেন। অবশেষে তিনি জাতিসংঘের পেনশনভুক্ত কর্মকর্তা হিসেবে অবসর গ্রহণ করেন।
তবে তাঁর পরিচয় কেবল আন্তর্জাতিক সাফল্যের গণ্ডিতে সীমাবদ্ধ নয়। নিজের শেকড়ের প্রতি তাঁর দায়বদ্ধতা সবসময়ই স্পষ্ট। ১৯৯৫ থেকে ১৯৯৯ সাল পর্যন্ত খাসমহল বালুচর উচ্চবিদ্যালয়ের এক সংকটময় সময়ে সভাপতির দায়িত্ব পালন করে প্রতিষ্ঠানটির উন্নয়ন ও স্থিতিশীলতায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন। বর্তমানে তিনি ঝিকুট ফাউন্ডেশনের মাধ্যমে নানা সামাজিক ও মানবকল্যাণমূলক কর্মকাণ্ডে সম্পৃক্ত রয়েছেন।
পারিবারিক জীবনেও তিনি অনুকরণীয়। দুই পুত্রের জনক তিনি। বড় ছেলে অর্থনীতিতে এমএসসি ডিগ্রি অর্জন করে বর্তমানে কানাডায় প্রতিষ্ঠিত। ছোট ছেলে কম্পিউটার সায়েন্স অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে স্নাতক শেষ করে অস্ট্রেলিয়ার ইউনিভার্সিটি অব টেকনোলজি সিডনিতে এমএস অধ্যয়নরত। তাঁদের সাফল্যের পেছনেও রয়েছে একজন শিক্ষিত, মূল্যবোধসম্পন্ন পিতার প্রেরণা ও দিকনির্দেশনা।
জনাব নজরুল ইসলামের জীবন আমাদের মনে করিয়ে দেয়—জন্মপরিস্থিতি নয়, মনোবল ও অধ্যবসায়ই মানুষের ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করে। খাসমহল বালুচরের মাটি থেকে উঠে এসে তিনি প্রমাণ করেছেন, বড় স্বপ্ন দেখতে জানলে এবং তা অর্জনে নিরলস পরিশ্রম করলে, বিশ্বমঞ্চও একদিন নাগালের মধ্যে আসে। তাঁর জীবনগাথা আজকের তরুণ প্রজন্মের জন্য এক শক্তিশালী বার্তা—পরিশ্রম, সততা ও শিক্ষাই সাফল্যের প্রকৃত চাবিকাঠি।
সম্পাদক - আশরাফ ইকবাল, নির্বাহী সম্পাদক - বর্ষন মোহাম্মদ
© স্বত্ব সংরক্ষিত © ২০২৬ দৈনিক মুন্সিগঞ্জের বার্তা