ইব্রাহীম নিরব:
জুলাইয়ের উত্তাল দিনগুলো আমাদের মনে আছে। ইতিহাসের এ এক অমোচনীয় অধ্যায়— যখন যুগব্যাপী নিপীড়ন আর নির্যাতনের বিরুদ্ধে একদল তরুণ বুক পেতে দাঁড়িয়েছিল। এই অভ্যুত্থান নিছক কোনো রাজনৈতিক আন্দোলন ছিল না; ছিল মুক্তির আকাঙ্ক্ষা, স্বাধীনতার আর্তনাদ। অথচ আজ, যে আন্দোলনের ফসল কিছু গুটিকয়েক ছাত্রদল বিএনপি কর্মী ভোগ করেছে, সেই আন্দোলনকেই তারা 'তথাকথিত' বলে অবজ্ঞা করছে। ইতিহাসের এমন নির্মম বিকৃতি দেখলে বিস্ময়ের সীমা থাকে না।
প্রথম দিকে, বিএনপি, যুবদল ও ছাত্রদল সবাই মিলে লাশের সংখ্যা নিয়ে রাজনীতি করলো। কারা কোথায় মরলো, কার কত রক্ত ঝরলো — তার হিসাব দিয়ে রাজপথে কান্নার রাজনীতি সাজানো হলো। লাশের রাজনীতি, মৃত্যুর মিছিল, সহানুভূতির ব্যাঙ্ক বানিয়ে তারা ক্ষমতার ফটক খুলতে চেয়েছিল। তখন অভ্যুত্থান ছিল "গৌরবময়", "মুক্তির লড়াই", "তাজা প্রাণের ত্যাগ"। আজ, যখন সময় বদলেছে, যখন রাজনীতির ব্যারোমিটার অন্যদিকে ঘুরছে, তখন তারা নিজেরাই নিজেদের ইতিহাস অস্বীকার করছে।
কী অদ্ভুত মিল, তাদের কথার সুর আজ আওয়ামী লীগের সাথে একেবারে অভিন্ন! যে আওয়ামী লীগ জুলাইয়ের অভ্যুত্থানকে 'টেররিস্ট মুভমেন্ট' হিসেবে আখ্যায়িত করতে মরিয়া, আজ তারাই ছাত্রদলের বিবৃতিতে, বিএনপির কণ্ঠে "তথাকথিত আন্দোলন" শব্দবন্ধ শুনতে পায়। ভাষা আলাদা হলেও মনোবৃত্তি এক — মুক্তির ইতিহাসকে পুঁজি করে নিজেদের স্বার্থ সিদ্ধি, তারপর সুবিধামতো অস্বীকার।
এটাই রাজনৈতিক দেউলিয়াত্ব। যে অভ্যুত্থান ছাত্রদলের শত শত তরুণকে বন্দিশালার অন্ধকার থেকে টেনে বের করেছিল, যে আন্দোলনের কারণে নির্যাতিত নেতা-কর্মীদের মুক্তির আশা জেগেছিল— সেই আন্দোলন আজ তাদের কাছে লজ্জার, অনাকাঙ্ক্ষিত এক অধ্যায়! তাদের বিবৃতি পড়ে মনে হয়, যেন তারা কখনও লড়েইনি, যেন সবকিছু ছিল কেবলই ভুলের ফল। আত্মপরাজয়ের এই মহড়া দেখে কেবল করুণা জাগে।
রাজনীতির সংকীর্ণতা এখানে নির্মমভাবে উন্মোচিত। নিজেদের ইতিহাস অস্বীকার করে কোনো জাতি এগোয় না, কোনো সংগঠনের আত্মমর্যাদা গড়ে ওঠে না। ইতিহাসকে পণ্য বানিয়ে সুবিধা নেওয়া আর সুবিধা ফুরালে তাকে 'তথাকথিত' বলার এই সংস্কৃতি একদিন বিএনপি-ছাত্রদলের অস্তিত্বকেই প্রশ্নবিদ্ধ করবে।
জুলাইয়ের অভ্যুত্থান ছিল সময়ের দাবি। ভুল-ত্রুটি থাকতেই পারে; তবে সেটাকে অস্বীকার করে ইতিহাসকে মুছে ফেলা যায় না। যারা নিজেদের রক্তের ঋণ ভুলে যায়, তারা ভবিষ্যতের কাছে ক্ষমা পায় না। ছাত্রদল আজ শুধু নিজেদের নয়, পুরো একটি প্রজন্মের সাহস ও আত্মত্যাগের প্রতি চরম অবমাননা করেছে। সময়ের কাঠগড়ায় তাদের এই দ্বিচারিতা রায় পাবে। আর ইতিহাস, সেই তো শেষ বিচারক।
লেখক : সমন্বয়ক ও নির্বাহী সদস্য, বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন
সম্পাদক - আশরাফ ইকবাল, নির্বাহী সম্পাদক - বর্ষন মোহাম্মদ
© স্বত্ব সংরক্ষিত © ২০২৬ দৈনিক মুন্সিগঞ্জের বার্তা