বর্ষন মোহাম্মদ
সব সংগ্রাম দৃশ্যমান হয় না। কিছু লড়াই চলে নীরবে লোকচক্ষুর আড়ালে, প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে। সে লড়াই ক্ষমতা বা রাজনীতির নয়, সে লড়াই শিল্পকে বাঁচিয়ে রাখার। মাটি, প্রকৃতি ও মানুষের কাছ থেকে পাওয়া শিক্ষাকে ধরে রাখার এক নিরব সাধনা। নাগরিক সমাজ শিল্পের রূপটুকু দেখে মুগ্ধ হয়, তার দাম নির্ধারণ করে। কিন্তু সেই রূপের পেছনে যে আজীবন আত্মনিবেদন, তা তারা খুব কমই দেখন ।
ঠিক এমনই এক নিরব অথচ দীর্ঘ সংগ্রামের সাক্ষী হয়ে আছে মুন্সিগঞ্জ-এর কালিন্দীপাড়ার ঠাকুরবাড়ির আচার্য পরিবার। প্রায় সাড়ে চারশ বছর ধরে তারা আগলে রেখেছে বাংলার পটচিত্রের গৌরবময় ঐতিহ্য। আট পুরুষ ধরে বহমান এই শিল্পধারার বর্তমান ও একমাত্র কাণ্ডারি পটুয়া শম্ভু আচার্য্য।
পটচিত্র বাংলার প্রাচীনতম লোকচিত্র ঐতিহ্যগুলোর একটি। যখন বাংলায় কোনো প্রাতিষ্ঠানিক বা দরবারি শিল্পরীতি গড়ে ওঠেনি, তখন পটচিত্রই ছিল মানুষের শিল্পবোধের প্রধান বাহন। পটে আঁকা এই চিত্রগুলো কখনো একক (চৌকাপট), কখনো দীর্ঘ আখ্যানভিত্তিক (দীর্ঘপট)। কালিঘাটের পট ছিল এই ধারার প্রথম শ্রেণির নিদর্শন। আঠারো ও উনিশ শতকে কলকাতা নগরকেন্দ্রিক শিল্পরীতির বিকাশ ঘটলেও পাশ্চাত্য ধারার প্রভাবে কালিঘাটের পট ধীরে ধীরে বিলুপ্ত হয়ে যায়।
কিন্তু কলকাতায় হারিয়ে গেলেও বাংলাদেশে বংশপরম্পরায় টিকে থাকে পটচিত্র। সেই ধারার নবম উত্তরপ্রজন্মের প্রতিনিধি শম্ভু আচার্য্য।
শম্ভুর বাবা সুধীর আচার্য্য আঁকতেন গামছায়। আর শম্ভু আচার্য্য পটচিত্রকে নিয়ে এসেছেন মোটা ক্যানভাসে। তাঁর কাজে ব্যবহৃত উপকরণ আজও দেশীয় পদ্ধতির। ইটের গুঁড়া, চক পাউডার ও তেঁতুল বিচির আঠা মিশিয়ে তৈরি হয় ‘ডলি’—যা দিয়ে ক্যানভাসে পরত দেওয়া হয়। এরপর শুরু হয় রেখার টান, রঙের প্রয়োগ। এই রঙও তৈরি হয় ডিমের কুসুম, সাগুদানা, গাছের কষ, বেলের কষ, এলা মাটি, গুপি মাটি, রাজা নীল, সিঁদুর আর মশালের ধোঁয়া দিয়ে। তুলি বানানো হয় ছাগলের লোমে। এসব রঙ ও রেখায় ফুটে ওঠে লোকজ জীবন, পৌরাণিক কাহিনি আর মানুষের বিশ্বাস।
ধলেশ্বরী নদীর তীরে কালিন্দীপাড়ায় নয় পুরুষ ধরে আচার্য পরিবার বসবাস করছে। শতবর্ষী তমাল গাছের ছায়ায় এই বাড়িতেই প্রজন্মের পর প্রজন্ম পট এঁকেছেন। শম্ভু আচার্য্য বলেন, “আমাদের পূর্বপুরুষরা পটে ছবি আঁকতেন। পরে গামছা ও ক্যানভাসে আঁকা শুরু হয়। তাই এর নাম পটচিত্র।”
তবে এই শিল্পধারা একসময় বিলুপ্তির মুখে পড়েছিল। সংসারের দায়ে শম্ভু আচার্য্য নারায়ণগঞ্জে ছবি আঁকার দোকান দেন। পটচিত্র তখন ছিল শুধু পারিবারিক ঐতিহ্য রক্ষার প্রয়াস। সেই সময় লোককারুশিল্প গবেষক তোফায়েল আহমেদ ভারতের এক জাদুঘরে সুধীর আচার্য্যের পটচিত্র দেখে শিল্পীর সন্ধানে নামেন। দীর্ঘ অনুসন্ধানের পর গাজীর গানের দলের সূত্র ধরে তিনি খুঁজে পান এই আচার্য পরিবারকে। সেখান থেকেই নতুন করে আলোচনায় আসে পটচিত্র।
এই পুনর্জাগরণে আরেকজন গুরুত্বপূর্ণ মানুষ ছিলেন রামেন্দু মজুমদার। তাঁর উৎসাহেই শম্ভু আচার্য্য পূর্ণ মনোযোগে পটচিত্রে ফিরে আসেন। ২০০৩ সালে হয় তাঁর প্রথম একক প্রদর্শনী। তার আগে ১৪ মাস তিনি কেবল ছবি এঁকেছেন সংসারের খরচ বহন করেছেন রামেন্দু মজুমদার। শিল্পী দেবদাস চক্রবর্তীসহ আরও অনেকে তাঁর পাশে দাঁড়ান।
২০০৬ সালে গ্যালারি কায়ার আয়োজিত কর্মশালায় শম্ভু আচার্য্য দেশীয় রং তৈরির প্রক্রিয়া প্রদর্শন করেন। কাইয়ুম চৌধুরী, মুর্তজা বশীরের মতো শিল্পীরা নিজেরাই সেই রং দিয়ে ছবি এঁকে বিস্মিত হন। তখনই নতুন করে স্বীকৃতি পায় পটচিত্রের দেশীয় রঙের স্থায়িত্ব ও বৈশিষ্ট্য।
শম্ভুর বাবা সুধীর আচার্য্য ১৯৮৯ সালে জাতীয় কারুশিল্প পরিষদের ‘শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদিন পুরস্কার’ লাভ করেন, তবে পুরস্কারটি হাতে পাওয়ার আগেই তাঁর মৃত্যু হয়। এই পরিবারে ধারাবাহিকভাবে পটচিত্র আঁকেছেন রামলোচন, রামগোপাল, রামসুন্দর, জগবন্ধু, রাসমোহন, প্রাণকৃষ্ণ, সুধীর ও শম্ভু আচার্য্য।
আজ শম্ভু আচার্য্য আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত শিল্পী। তাঁর পটচিত্র স্থান পেয়েছে ব্রিটিশ মিউজিয়াম, সাংহাই মিউজিয়াম, চীনের কুবিং মিউজিয়াম, জাপান ও ইন্দোনেশিয়ার বিভিন্ন জাদুঘরে।
ঐতিহাসিকদের মতে, বাংলায় পটশিল্পের সূচনা সপ্তম শতকে। যমপট থেকে গাজীর পট—এই ধারায় বৌদ্ধ, হিন্দু ও লোকবিশ্বাস মিলেমিশে গড়ে উঠেছে পটচিত্রের ভাষা। শম্ভু আচার্য্য সেই ঐতিহ্য বজায় রেখেই এনেছেন আধুনিক নগরজীবনের বিষয়বৈচিত্র্য। তাঁর ক্যানভাসে এখন কৃষক, জেলে, তাঁতী যেমন আছে, তেমনি আছে দিনমজুর নারীশ্রমিক, নাগরিক জীবন ও সমসাময়িক বাস্তবতা।
পটচিত্র প্রধানত দুই ধরনের দীর্ঘ জড়ানো পট ও চৌকো পট। উজ্জ্বল রং, সম্মুখমুখী অবয়ব, সরল রেখা—এই ঐতিহ্য মেনেই শম্ভু আচার্য্য আলো-ছায়া ও বিষয়বৈচিত্র্েযর সংযোজন করেছেন। বলা যায়, তিনি পটচিত্রের এক আধুনিক নগর সংস্করণ নির্মাণ করেছেন, যেখানে ঐতিহ্য হারায়নি, বরং নতুনভাবে প্রাণ পেয়েছে।
এই দীর্ঘ সংগ্রাম প্রমাণ করে—শিল্প টিকে থাকে শিল্পীর সাধনায়। চোখে না পড়া সেই লড়াইই একদিন হয়ে ওঠে ইতিহাস। আর সেই ইতিহাসের এক জীবন্ত নাম পটুয়া শম্ভু আচার্য্য ও মুন্সীগঞ্জ-এর আচার্য পরিবার।
সম্পাদক - আশরাফ ইকবাল, নির্বাহী সম্পাদক - বর্ষন মোহাম্মদ
© স্বত্ব সংরক্ষিত © ২০২৬ দৈনিক মুন্সিগঞ্জের বার্তা