প্রিন্ট এর তারিখঃ জুলাই ৭, ২০২৬, ৩:৫১ পি.এম || প্রকাশের তারিখঃ জানুয়ারী ৮, ২০২৬, ১০:৫০ পি.এম
বিক্রমপুরের থেকে বিশ্বজয়: পুলিৎজারজয়ী প্রথম বাংলাদেশি মোহাম্মদ পনির হোসেন
শোভন সারোয়ার
ইছামতীপাড়ের শান্ত জনপদ সিরাজদিখান। এই মাটির গন্ধ, সরল মানুষজন ও নদীর বয়ে চলার মাঝেই জন্মেছিলেন বাংলাদেশের গর্ব মোহাম্মদ পনির হোসেন।
১৯৮৯ সালের ১০ মে বিক্রমপুর- মুন্সিগঞ্জের সিরাজদিখানের গুয়াখোলা গ্রামে জন্ম নেওয়া এই তরুণ আজ ইতিহাস সৃষ্টি করেছেন। সাংবাদিকতার অস্কারখ্যাত পুলিৎজার পুরস্কার অর্জন করে তিনি হয়েছেন প্রথম বাংলাদেশি, যিনি দেশের নামকে বিশ্বমঞ্চে নতুন মর্যাদায় পৌঁছে দিয়েছেন।
পনিরের বেড়ে ওঠা ছিল একেবারেই সাধারণ। বাবা মোহাম্মদ জামাল উদ্দিন ও মা আলিজা বেগমের পাঁচ সন্তানের মধ্যে তিনি তৃতীয়। কিন্তু মফস্বলের সেই সাধারণ পরিবেশই তাঁকে শিখিয়েছে গভীর মনোযোগ, পর্যবেক্ষণশক্তি আর মানুষের কষ্টের প্রতি আন্তরিক উপলব্ধি। তাঁর আলোকচিত্রের শুরুটা ঘটেছিল অনেকটা হঠাৎই। ২০০৯ সালে নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ে বিপণনে পড়াশোনার সময় ফটোগ্রাফি ক্লাবের একটি কর্মশালায় অংশ নিয়েছিলেন তিনি। সেখানেই হাতে আসে প্রথম আনুষ্ঠানিক ক্যামেরা, আর শুরু হয় আলোকচিত্রের যাত্রা। ২০১০ সালে নিজের ক্যামেরা হাতে পাওয়ার পর ছবি তোলা ধীরে ধীরে শখের বাইরে পেশার পথে এগিয়ে যায়। জুমা প্রেসে ছবি সংবাদদাতা হিসেবে কাজ করা, বিভিন্ন আন্তর্জাতিক মাধ্যমে তাঁর ছবি প্রকাশ পাওয়া—সব মিলিয়ে তিনি হয়ে ওঠেন একজন পেশাদার আলোকচিত্রী।
ফেসবুকে তাঁর নিয়মিত ছবি শেয়ার করা একসময় নজরে আসে রয়টার্সের এশিয়া ফটো এডিটর-ইন-চার্জ আহমাদ মাসুদের। পনিরের পোর্টফলিও দেখে তাঁকে ২০১৬ সালের ১ জুলাই রয়টার্সে নিয়োগ দেওয়া হয়। একই সময় তিনি অ্যাটিনিও ম্যানিলা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ভিজ্যুয়াল জার্নালিজমে স্নাতকোত্তর ডিপ্লোমা অর্জন করেন, যা তাঁর কাজকে আরও সমৃদ্ধ করে। ২০১৬ সালে সনি ওয়ার্ল্ড ফটোগ্রাফিতে জাতীয় পর্যায়ে দ্বিতীয় স্থান অর্জন করে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে নিজের উপস্থিতির জানান দেন আমাদের পনির হোসেন।
তবে পনির হোসেনের ফটোজার্নালিজমের প্রকৃত শক্তি প্রতিফলিত হয় ২০১৭ সালের রোহিঙ্গা সংকট কাভার করতে গিয়ে। সেই বছর তিনি শাহপরীর দ্বীপে ছবি তুলছিলেন। স্থানীয় এক চালক থেকে খবর পান যে একটি নৌকা ডুবে গেছে। কয়েক কিলোমিটার পথ পায়ে হেঁটে গিয়ে তিনি পৌঁছান ঘটনাস্থলে। সেখানেই তিনি দেখেন এক মায়ের কোলে নিথর পড়ে আছে তাঁর সন্তান। মিয়ানমারের সেনাবাহিনীর নির্যাতন থেকে পালাতে গিয়ে নৌকাডুবিতে প্রাণ গেছে রোহিঙ্গা শিশুটির। সেই মুহূর্তটি তিনি ক্যামেরায় ধারণ করে ফেলেন, যা পরবর্তীতে বিশ্ব বিবেককে নাড়িয়ে দেয়। পরবর্তীতে নিজের অভিব্যক্তি জানিয়ে তিনি বলেছিলেন, “ছবিগুলো যখন তুলি তখন আবেগ নিয়ন্ত্রণে ছিল, কিন্তু হোটেলে ফিরে ল্যাপটপে দেখার পর আর চোখের পানি ধরে রাখতে পারিনি। রোহিঙ্গা ইস্যু কাভার না করলে মানুষের এতো কষ্ট এভাবে বুঝতে পারতাম না।”
তার আরও একটি ছবিতে দেখা যায়, ভেলায় চড়ে নদীপথে বাংলাদেশে প্রবেশ করছে একদল অসহায় ও ক্লান্ত রোহিঙ্গা, যাদের চোখেমুখে বাঁচার করুণ আকুতি। এই ছবিগুলোই পরবর্তীতে আন্তর্জাতিক মহলে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু হয়ে ওঠে। মানবিকতার গভীরতম মুহূর্তগুলোকে যে নিরাবরণ সত্যের মতো জাগিয়ে তোলে, পনিরের ছবিগুলো ছিল ঠিক তেমনই শক্তিশালী।
মানবিকতাবোধের স্বীকৃতি হিসেবে তিনি অর্জন করেন বিশ্বের সবচেয়ে মর্যাদাপূর্ণ সাংবাদিকতা পুরস্কার। এই অর্জন কেবল তাঁর ব্যক্তিগত সাফল্য নয়, বাংলাদেশের ভিজ্যুয়াল সাংবাদিকতার ইতিহাসে এক নতুন অধ্যায়। বিক্রমপুরের মাটিতে জন্ম নেওয়া এই তরুণের সাফল্যের গল্প নতুন প্রজন্মকে দেখিয়ে দেয়, প্রতিভা কখনো আড়ালে থাকে না; নিষ্ঠা থাকলে মফস্বল থেকে উঠে এসেও বিশ্বজয় করা যায়।
মোহাম্মদ পনির হোসেন আজ দেশের গর্ব। তাঁর ক্যামেরায় ধরা পড়ে মানুষের জীবন, সংগ্রাম এবং বেঁচে থাকার আকুতিগুলো বিশ্বকে ভাবায়, থমকে দেয়, আবার মানবিকতার আলোয় পথও দেখায়।
সম্পাদক - আশরাফ ইকবাল, নির্বাহী সম্পাদক - বর্ষন মোহাম্মদ
© স্বত্ব সংরক্ষিত © ২০২৬ দৈনিক মুন্সিগঞ্জের বার্তা