শেখ রাসেল ফখরুদ্দীন:
বিক্রমপুরে রাজাবাড়ী নামে একটি প্রসিদ্ধ গ্রাম ছিলো । ইতিহাস সাক্ষ্যদেয় এই গ্রামে একটি সুবিশাল মঠ ছিলো। মঠটির নাম “চাঁন্দা মুনির মঠ ” বা ” চাঁন্দা মিয়ার মঠ ” । তবে মঠটি ” রাজাবাড়ীর মঠ ” নামেই সমাধিক প্রসিদ্ধ ছিলো।
মঠটি মোগল আমলের একটি অনন্য স্থাপত্য কীর্তি। আমার ধারনা হয়তো মঠটি খ্রিস্টীয় সপ্তদশ শতকের মধ্যভাগের কোন এক সময় নির্মাণ করা হয়। বিক্রমপুরের ইতিহাসের বিভিন্ন গন্থ ঘেটে জানা যায় যে , মঠটি ছিলো পূর্বদারী । মঠের ভিতরে প্রবেশেে একটি মাত্র প্রবেশদ্বার ছিলো । মঠটির উচ্চতা ছিলো ৮০ ফুট। ভিত্তিটি ছিলো ৩০× ৩০ ফৃট বর্গাকার । প্রতিটি দেয়াল ছিলো ১১ ফুট পুরু। নিম্ম থেকে ত্রিশ ফুট উপর পর্যন্ত নানা আকারের ইট দিয়ে বিচিত্র ফুলের চিত্রে শোভিত ছিলো। মঠে ব্যবহৃত ইটের আয়তন ৮ ইন্চি × ৮ ইন্চি× ১.৫ ইন্চি। মঠটির চূড়া ছিলো অসমাপ্ত। চূড়ার নিচে একটি ছোট বদ্ধ কক্ষ ছিলো।
মঠটির নির্মাতা ও নির্মাণ কাল নিয়ে পরস্পর বিরোধী জনশ্রুতি লিখিত ও প্রচলিত আছে।জেমস রেনেলের বিবরণীতে সর্ব প্রথম রাজাবাড়ী মঠের সর্বপ্রথম লিখিত বিবরণ দেখতে পাওয়া যায়। তিনি ১৭৬৫ খ্রিস্টাব্দে নিম্ম বঙ্গ জরিপ করেন ।তিনি তাঁর নকশায় রাজাবাড়ী গ্রামের পাশে এই মঠটির চিত্র অংকন করেন। তিনি লিখেন, Rajabari is situated on the western side of the meghna in lat. 23.- 21.n.an old pagoda stands 3/4 of a mile to the south west of it. the village has for merly been large, but is now reduced to a small bazar only.
এছাড়াও ১৮৭৪ খ্রিস্টাব্দে ড . জেমস ওয়াইজ JRASB – তে এই মঠটি নিয়ে একটি চমৎকার বর্ণনা দিয়েছেন।
তিনি লিখেছেন, There is the lofty Rajabari math which is a prominent landmark for miles around, on the left bank of the river padma.(সংক্ষিপ্ত ভাবে তুলে ধরা হলো) ।
এছাড়াও বিক্রমপুরের সন্তান শ্রী যতীন্দ্রমোহন রায় লিখেন, কেহ কেহ বলেন চান্দ মিয়া নামক জনৈক খ্যাতনামা মোসলমান হিন্দু পদ্ধতি অনুসারে স্বীয় জননীর সমাধির উপর ইহা নির্মাণ করান। আবার কেহ কেহ ইহা পালবংশীয় বৌদ্ধ নরপতি গনের একতম কুর্তি বলিয়াও নির্দেশ করিয়া থাকেন। এই মঠটি মঠটি পূর্বদ্বারী বলিয়াই এই সমূদয় অলীক কিম্বদন্তীর সৃষ্ট হইয়াছে সন্দেহ নাই।
বিক্রমপুরের ইতিহাস গ্রন্থের প্রণেতা যোগেন্দ্রনাথ গুপ্ত লিখেন, ” এই মঠের গাত্রস্থিত ইস্টক সমূহে অতি সুন্দর বিচিত্র ফুলকাটা ছিলো। এইরুপ গঠনের মঠ বাংলাদেশে আর ছিলোনা।
এই জন্য কেহ কেহ এটাকে বৌদ্ধ বিহার বা মঠ বলিতেও ইতস্তত বোধ করেন নাই ” ।
মঠটির নির্মাতা বা নির্মাণকাল নিয়ে
পরস্পর বিরোধী বহু বক্তব্য, তথ্য পাওয়া যায়। কোন কোন লেখক এই মঠটিকে বাংলার পাল বংশীয় রাজাদের কৃর্তি মনে করেন। আবার কেউ কেউ সেন বংশের রাজা বল্লাল সেন কৃর্তি মনে করেন। । আবার কেউ মনে করেন শ্রীপুরের রাজা কেদার রায় ইহা নির্মাণ করেন। কেউ বলেন রাজা দ্বিতীয় বল্লাল সেন মঠটির নির্মাতা। তবে সর্বশেষে আমরা দেখতে পাই বিক্রমপুরের বেশনাল গ্রামের বাসিন্দা বিক্রমপুরের ইতিহাসের অন্যতম লেখক ও গবেষক জয়নাল আবেদীন খান তিনি প্রমান করতে চেষ্টা করেছেন মহারাজা বল্লাল ওরফে নবাব আবুল ওরফে বাদশাহ মঙ্গৎ রায় মঠটির প্রতিষ্ঠাতা।
১৮৯১ খ্রিস্টাব্দে ঢাকার কালেক্টর মিঃ ফোল্ডারের নির্দেশে এবং ভাগ্যকুলের জমিদার শ্রীনাথ কুন্ডুর অর্থ্যানুকুল্যে মঠটির সংস্কার কাজ সম্পূর্ণ হয়।
১৯২৩ খ্রিস্টাব্দের ৮ সেপ্টেম্বর প্রমত্তা পদ্মার ভাঙ্গনে গর্ভে মঠটির সলিল সমাধি ঘটে।
সম্পাদক - আশরাফ ইকবাল, নির্বাহী সম্পাদক - বর্ষন মোহাম্মদ
© স্বত্ব সংরক্ষিত © ২০২৬ দৈনিক মুন্সিগঞ্জের বার্তা