ইঞ্জি. শাহিদ শাওন:
যখন কেউ বলে, "আমি মুন্সিগঞ্জ থেকে এসেছি", তখন অনেকেই বলে ফেলেন—"ওহ, বিক্রমপুর!" অথচ এই দুটি শব্দ সমার্থক নয়। ইতিহাস, সংস্কৃতি ও ভৌগোলিক পরিপ্রেক্ষিতে বিক্রমপুর আর মুন্সিগঞ্জ এক হলেও একই নয়। বরং, একটির শিকড় অতীতে, আরেকটির বাস্তবতা বর্তমান কালের প্রশাসনিক মানচিত্রে।
এই দুটি নাম নিয়ে দ্বিধাদ্বন্দ্ব নতুন কিছু না। অনেকেই ভাবে দুটো এক জিনিস, আবার কেউ কেউ চট করে ঠিক পার্থক্যটা বুঝেও উঠতে পারেন না। আমিও পারতাম না—যতদিন না স্কুল পেরিয়ে ইতিহাসের পাতায় পা রেখেছি।
বিক্রমপুর শুধু একটা নাম নয়, একটা অনুভব, একটা লম্বা ইতিহাসের সাক্ষী, প্রসিদ্ধ সংস্কৃতি, একটা সময়ের গল্প, একটা মাটির ঘ্রাণ। পাল ও সেন রাজাদের আমলে এই অঞ্চল ছিল এক কথায় বাংলার প্রাণ। রাজা বল্লাল সেন, আব্দুল হাকিম বিক্রমপুরী—এসব নাম আমরা বইয়ে পড়ি, কিন্তু তারা তো এখানকারই সন্তান। তখন তো মুন্সিগঞ্জ বলে কিছু ছিল না। ছিল বিক্রমপুর। খাল-বিল, গাছ-গাছালি আর সরল মানুষের বাস ছিল এখানে।
কিন্তু সময় বদলায়। দেশভাগ, প্রশাসনিক পুনর্বিন্যাস, সরকারি কাজের সুবিধা—এসব কিছু মিলিয়ে ১৯৮৪ সালে মুন্সিগঞ্জ নামে নতুন এক জেলার জন্ম হয়। সেই মুন্সিগঞ্জের ভেতরেই রয়ে গেল আমাদের পুরনো বিক্রমপুর। আমাদের আবেগ ভালোবাসার সেই নাম।
প্রশাসনিক দিক থেকে মুন্সিগঞ্জ এখন আলাদা জেলা। সিরাজদিখান, টংগিবাড়ি, লৌহজং, গজারিয়া, শ্রীনগর ও মুন্সিগঞ্জ সদর নিয়ে যার রয়েছে ছয়টি উপজেলা। কিন্তু ‘বিক্রমপুর’ বলতে এখনো আমরা বুঝি ঐতিহাসিক ও সাংস্কৃতিক এক জনপদ। এই পার্থক্য বইয়ের পাতায় হয়তো বড় কিছু না, কিন্তু আবেগে বেশ গভীর।
মুন্সিগঞ্জ মানে এখন পদ্মা সেতুর পিলার, সদর হাসপাতাল, রিকশার লাইনে দাঁড়িয়ে থাকা মানুষ, সরকারি কাগজপত্রে লেখা পরিচয়। আর বিক্রমপুর মানে? দাদুর মুখে শোনা গল্প, মাটির নিচে লুকিয়ে থাকা ইতিহাস, আর নিজের শিকড়ের এক সুপ্ত গর্ব।
আমার কাছে মনে হয়, বিক্রমপুর আর মুন্সিগঞ্জ এক গাছের দুই ডাল। কেউ যদি এখন বলে "আমি মুন্সিগঞ্জ থেকে এসেছি", শুনে ভালো লাগে। কিন্তু যখন কেউ বলে "আমি বিক্রমপুরের লোক", তখন বুকের ভেতর যেন একটা কোমল ঢেউ লাগে।
নাম বদলায়, মানচিত্রও বদলায়। কিন্তু যে মাটিতে দাঁড়িয়ে আমরা বড় হই, তার গল্প কখনো বদলায় না। মুন্সিগঞ্জ এখনকার পরিচয়, আর বিক্রমপুর আমাদের অস্তিত্বের ছাপ।
তাই আমি যখন নিজের পরিচয় দিই, বলি—"হ্যাঁ, আমি বিক্রমপুরের ছেলে। তবে, আপনি চাইলে মুন্সিগঞ্জও বলতে পারেন।"
লেখক: সহকারী সম্পাদক, দৈনিক মুন্সিগঞ্জের বার্তা ও সাংগঠনিক সম্পাদক, ঝিকুট ফাউন্ডেশন।
সম্পাদক - আশরাফ ইকবাল, নির্বাহী সম্পাদক - বর্ষন মোহাম্মদ
© স্বত্ব সংরক্ষিত © ২০২৬ দৈনিক মুন্সিগঞ্জের বার্তা