সিরাজদিখান প্রতিনিধি:
ব্যবসায়ের পাশাপাশি বিভিন্ন দেশ ঘোরার শখ ছিল তাঁর। আর সেই ভ্রমণের সুবাদেই একেক দেশ থেকে সংগ্রহ করতেন ফলদ চারা ও সায়ন। প্রথমে কেবলই নিজের আঙিনায় শখের বশে বিদেশি ফল চাষের যে স্বপ্ন বুনেছিলেন, আজ তা বাণিজ্যিক উদ্যোগে রূপ নিয়েছে। তিনি মুন্সীগঞ্জের সিরাজদিখান উপজেলার জৈনসার ইউনিয়নের খিলগাঁও এলাকার সফল ফল চাষি আজিজুল হাকিম রিপন (৪৭)। মঙ্গলবার (২৮ জুলাই) সকাল সাড়ে ১০ টায় গাছ থেকে ফল হার্ভেস্ট করতে দেখা যায়।
বর্তমানে তাঁর ১ একরের নিজ বাড়ির বাগানে শোভা পাচ্ছে প্রায় ৩২০ প্রজাতির বিদেশি ফলের গাছ। এর মধ্যে ৮০ প্রজাতির কাঁঠাল, ৪০ প্রজাতির ছবেদা, ১০ প্রজাতির ম্যাংগোস্টিন ফ্যামিলির ফল, ৩০ প্রজাতির আতা, ৫ প্রজাতির পার্সিমন, ৪০ প্রজাতির ব্ল্যাক ও হোয়াইট সাপোটে এবং ১০ প্রজাতির লংগানসহ হরেক রকমের বিদেশি ফল গাছ রয়েছে। যেখানে কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে এলাকার অন্তত ১০ জন বেকার মানুষের।
আজিজুল হাকিম রিপন বলেন, "৭ বছর ধরে আমি এই বাগান করছি। শুরুতে নিজের শখ ছিল বিদেশি চারা দিয়ে একটি বাগান করব, নিজে ফল খাব। সেখান থেকেই আজকের এই বাণিজ্যিক পথচলা। প্রথমে বিভিন্ন দেশ থেকে চারা এনে বাড়ির এক একর জমিতে রোপণ করি। যে গাছের ফলন ও মান ভালো, সেগুলো রেখে বাকি অনুন্নত জাতের গাছ কেটে ফেলি।"
বর্তমানে আমার বাগানে পুষ্টিগুণে সমৃদ্ধ এবং ওষুধি গুণসম্পন্ন ‘সুপার ফ্রুট’ অ্যাভোকাডো প্রায় ১০০ প্রজাতির গাছ রয়েছে। রিপন জানান, অ্যাভোকাডো সাধারণত দেশি ফলের মতো স্বাদের হয় না। কিছু জাত তেতো ও পানসে হয়। তাই দীর্ঘ পরীক্ষা-নিরীক্ষার পর ৩৫টি ফলে ধরা জাতের মধ্যে থেকে মাত্র ১১টি মিষ্টি ও ক্রিম জাতীয় সেরা জাত নির্বাচন করে বাগানে রেখেছি, বাকিগুলো কেটে ফেলেছি। বর্তমানে বাগানের পাইকারি অ্যাভোকাডো প্রতি কেজি ৭৫০ টাকা দরে বিক্রি করছি।
এই সফলতার পর আজিজুল হাকিম রিপন তাঁর কার্যক্রম আরও বাড়ি আছে । ইতিমধ্যেই গাজীপুরের মাওনায় ৭ বিঘা জমিতে আরেকটি উচ্চ ফলনশীল ও মিষ্টি জাতের অ্যাভোকাডোর বাগান সম্প্রসারণ করছেন। পাশাপাশি সিরাজদিখানেও আরও বড় পরিসরে বাগান করার পরিকল্পনা রয়েছে তাঁর।
নতুন উদ্যোক্তাদের পরামর্শ দিতে গিয়ে এই অভিজ্ঞ চাষি বলেন, "নতুনরা যেন চারা কিনে প্রতারিত না হন, সেজন্য আপনারা প্রথমে পরীক্ষিত ও ফলন্ত বাগানগুলো সরজমিনে দেখুন। এরপর সেখান থেকে চারা সংগ্রহ করুন। আমার বাগান থেকেও চাইলে উদ্যোক্তারা সরাসরি এসে কিংবা অনলাইনের মাধ্যমে বিশ্বস্ত ও পরীক্ষিত চারা সংগ্রহ করতে পারেন।"
তবে এই বিশাল অর্জনের পেছনে কিছু সীমাবদ্ধতা ও আক্ষেপের কথাও জানিয়েছেন এই সফল চাষি। তিনি বলেন, "সিরাজদিখান উপজেলা কৃষি অফিস থেকে আমি কোনো ধরনের সহযোগিতা বা পরামর্শ পাচ্ছি না। ফল মেলা হলে আমার বাগান থেকে অ্যাভোকাডো ঠিকই নেওয়া হয়, কিন্তু কাজের জন্য কোনো বাস্তব উৎসাহ বা টেকনিক্যাল সাপোর্ট দেওয়া হচ্ছে না। সরকারি সহযোগিতা ও পরামর্শ পেলে আমি আরও অনেক দূর এগিয়ে যেতে পারতাম।"
তিনি সরকারের কাছে আহ্বান জানিয়ে বলেন, দেশে বিপুল পরিমাণ অনাবাদি ও খাস জমি পড়ে রয়েছে। সরকার যদি সেই জমিগুলো লিজ বা বরাদ্দ দেয়, তবে তিনি সেখানে উচ্চ ফলনশীল বিদেশি ফলের বিশাল বাগান গড়ে তুলতে পারবেন। এতে যেমন দেশে নতুন নতুন উদ্যোক্তা তৈরি হবে, তেমনই এই দামি ফল বিদেশে রপ্তানি করে বিপুল পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন করা সম্ভব হবে। এছাড়া, বাগানের অমৌসুমী ফলগুলো যথাযথভাবে সংরক্ষণ করে ন্যায্য মূল্য পাওয়ার জন্য একটি ‘মিনি কোল্ড স্টোরেজ’ (হিমাগার) স্থাপনে সরকারের সহায়তা কামনা করেন তিনি।
সিরাজদিখান উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা রফিকুল ইসলাম চাষির এই সফলতার বিষয়টিকে ইতিবাচক হিসেবে নিয়ে তিনি বলেন, আমি সরজমিনে গিয়ে দেখব এবং প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করব।
সম্পাদক - আশরাফ ইকবাল, নির্বাহী সম্পাদক - বর্ষন মোহাম্মদ
© স্বত্ব সংরক্ষিত © ২০২৬ দৈনিক মুন্সিগঞ্জের বার্তা