ফারহানা সুলতানা:
২০১২ সালের ২৭ সেপ্টেম্বর, শরৎকাল ছিল সেদিন। ভ্রমণের ব্যাপারে আগেই বলে রেখেছিল দৈনিক মুন্সিগঞ্জের বার্তার সম্পাদক বন্ধু আশরাফ ইকবাল। আই এফ সি বাংলাদেশ নদী ও পরিবেশ কমিটি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শাখা থেকে মুন্সিগঞ্জ ভ্রমণে যেতে হবে। আই এফ সি হলো একটা সংস্থা (ইন্টারন্যাশনাল ফারাক্কা কমিটি) যেটা নদীবিধৌত বাংলাদেশের নদীবিষয়ক সমস্যা নিয়ে ভাববার চেষ্টা করে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কিছু ছেলেমেয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের বাসে (বাসের নাম 'বিক্রমপুর। বাস কমিটির সভাপতি তখন মো. মুরাদ হোছাইন) করেই যাবো, আবার বিকেলে ফিরে আসবো। বন্ধু বলেছিল সাথে করে দুএকজন বান্ধবিকে নিয়ে আসতে। সেই দুএকজন শেষমেষ ছয়জনে গিয়ে ঠেকলো! সবাই মিলে ক্লাস শেষ করে দুপুরের দিকে দলবেধে টিএসসিতে হাজির হলাম। সেখানে আইএফসি ও বাস কমিটির সভাপতি মো. মুরাদ হোছাইন, প্রধান অতিথি ডেইলি নিউ নেশনের সাবেক সম্পাদক মোস্তফা কামাল মজুমদার, জাতিসংঘের পানি গবেষক ড. এস আই খান এবং আরো অনেকে মূল্যবান বক্তৃতা দিলেন। তারপর বাসে উঠলাম একে একে। প্রচন্ড ঠাসাঠাসি। তিল ধারনেরও ঠাই নেই। বুঝলাম, আমার মতো সবাই দুজনের স্থলে ছ'সাতজন নিয়ে উপস্থিত হয়েছে! আর গুটিকতক হলেই ছাদে বসতে হত। এই ভিড়ের মধ্যেই হৈ হুল্লোর করতে করতে ছুটলো আমাদের বাস। তখন আবার শুরু হল ঝমঝম বৃষ্টি। আনন্দ যা পাচ্ছি তারই ছবি তুলছি আমরা। আর এই ‘আমরা’ মানে আমি, হলের বেডমেট শাম্মী, বান্ধবি সহকারি জজ নাজনীন, সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট তাসমিনা মালা, সাদিয়া শিলা ও মারুফা। বিক্রমপুর থেকে আগত উম্মে হাবিবা বিনতে আবদুল্লাহকে পেয়ে আনন্দের মাত্রা আরেকটু বেড়ে গেল। বৃষ্টির পানিতে জানালার কাচে ছোট ছোট জলকণা জমছে আর আমরা তার উপর নিজেদের নাম লিখে মজা করছিলাম। আবহাওয়ারও বলিহারি। খানিক ঝমঝমে বৃষ্টির ধারা, পরক্ষণেই ঝলমলে রোদ। ভাবলাম আজ আমরা আসব বলে মুন্সিগঞ্জের সব শেয়াল ভায়ারা যুক্তি করে ছাদনা তলায় বসল নাকিরে বাবা! এমনি করেই অকারণ হাসি ঠাট্টায় মেতে উঠে আর রাস্তার দুপাশের সৌন্দর্য দেখতে দেখতে পৌঁছে গেলাম মুন্সিগঞ্জে, তারপর পদব্রজে পদ্মা পাড়ে। এই সেই পদ্মা! যাকে নিয়ে কত ঔপন্যাসিক উপন্যাস লিখেন, শিল্পী ছবি আঁকেন আর গায়ক গায় গান,-
'পদ্মার ঢেউ রে
তোর শূন্য হৃদয় পদ্ম নিয়ে, যা যারে'
ভরা বর্ষার পর পানিতে থৈ থৈ করছে পদ্মার বুক । আমরা যখন পদ্মার এই রূপ দেখে একেকজন খাবি খাচ্ছি, তখন খবর এলো আমাদের নাকি ট্রলারে করে পদ্মা রিসোর্ট নিয়ে যাওয়া হবে। আমাদের মাঝে আরেকবার আনন্দের বন্যা বয়ে গেল। কলরব করতে করতে ট্রলারে উঠলাম। সবাই সারিবেঁধে বসলাম। পদ্মার বড় বড় ঢেউ কাটিয়ে অনতিবিলম্বে ট্রলার এগিয়ে যেতে লাগল রিসোর্ট পানে। ১৫ মিনিটের মধ্যেই পৌঁছে গেলাম গন্তব্যস্থলে। একটা বাঁশের ব্রিজের ধার ঘেঁষে দাঁড়াল ট্রলার। হুড়মুড় করে ট্রলার থেকে নেমে ব্রিজে উঠলাম। একটুও তর সইছিলনা যেন। আমাদের মুহুর্মুহু পদসঞ্চালনে ব্রিজ ভেঙে পড়ার উপক্রম। তারপর আমরা যা দেখলাম তার জন্য কেউই প্রস্তুত ছিলাম না। যে পদ্মা আষাঢ়ে প্রলয়ঙ্কারী রূপ ধারন করে সেই স্রোতস্বিনী পদ্মা, যে কিনা শীতকালে হয়ে ওঠে চাষীর লাঙলের ন্যায় কৃশকায়; শরতের পড়ন্ত বিকেলে সূর্যের ম্লান আলোয় সেই পদ্মারই অলৌকিক অভূতপূর্ব সৌন্দর্যে আমরা এতটা অভিভূত হয়ে পড়ব তা কে জানত! পুরো রিসোর্টটি একটা চরের মধ্যে বাঁশ আর কাঠের কাঠামোর উপর দাঁড় করানো, তার নিচে হাটু অবধি পানি। আর পুরো চর জুড়ে ধবধবে শাদা কাশ! শরৎকাল বুঝি পূর্ণতা পেয়েছে এখানে। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ‘আমাদের ছোট নদী' নামে খুব চমৎকার একটা কবিতা লিখেছিলেন। সেখানে দুটো লাইন ছিল এরকম- 'চিকচিক করে বালি কোথা নাই কাদা, দুই ধারে কাশবন ফুলে ফুলে শাদা'। আচ্ছা, রবীন্দ্রনাথের ছোট নদীর কাশবনও কি এত সুন্দর ছিল? নিশ্চয়ই ছিল, নইলে এত সুন্দর কবিতা তিনি লিখলেন কেমন করে? “কিরে ছবি তুলবিনা?' সাদিয়ার ডাকে সম্বিৎ ফিরে পেলাম। আমি তখন বিষ্ময়ে কিংকর্তব্যবিমূঢ়। কি করব বুঝতে পারছিনা। ঝটপট কিছু ছবি তুলে ফেললাম।
রিসোর্ট সম্পর্কে একটু বর্ণনা দেয়া যাক। বিশাল বিস্তৃত চর প্রকৃতির এক অপার সৌন্দর্য নিয়ে গড়ে উঠেছে পদ্মা রিসোর্ট। রিসোর্টটি চারদিকে পদ্মা নদী প্রবাহিত হওয়ায় সার্বক্ষণিক মৃদুমন্দ ঠান্ডা বাতাস বিরাজ করছে। ভ্রমণ পিপাসুরা এখানে এসে শান্ত নদীতে গোসল করে। কেউ কেউ শখের বসে ছিপ দিয়ে মাছ ধরে। খানিক দূরেই দেখা যায় চরাঞ্চলের গ্রাম্যজীবন। বালুচরে ইজি চেয়ার বা দোলনা চেয়ারে বসে সূর্যাস্ত বা ভোরের সূর্যোদয় দেখার সুযোগ রয়েছে। ইচ্ছে করলেই ঘোড়ার পিঠে চড়া যায়। ঢিঙি/ পাল তোলা/ ইঞ্জিন চালিত নৌকা, কান্ট্রি বোট, ফিশিং বোট, রাবার বোট বা স্পিড বোটে ঘোরা যায় পদ্মার আশ-পাশ। এসব রাইড বা আনন্দের ক্ষেত্রে রিসোর্টের নিজস্ব চার্জ দিয়ে যে কেউ উপভোগ করতে পারবে নিরবিচ্ছিন্ন আনন্দ। ভাগা-ভাগি করে নিতে পারবে নিজ নিজ পরিবার, বন্ধু-বান্ধব বা অফিস সহকর্মীদের সাথে। এখানে আছে ১৬টি ডুপ্লেক্স কটেজ। প্রতিটি কটেজে আছে একটি বড় বেডরুম, দুটি সিঙ্গেল বেডরুম, একটি ড্রইংরুম। আছে দুটি ব্যালকনি এবং একটি বাথরুম। শীতে কটেজের চারপাশ রঙ-বেরঙের ফুলে ভরে ওঠে আর বর্ষায় পানিতে টইটুম্বুর। রিসোর্ট রেস্টুরেন্টে টাটকা ইলিশ পাওয়া যায়। রিসোর্টের ভিতরে বেশ অনেকখানি জায়গা জুড়ে আছে সুসজ্জিত রেস্টুরেন্ট। এখানে ১২০ জনের মতো বসার জায়গা আছে। এখানে বন্ধুদের সাথে খেলাধুলায় মেতে উঠার জন্য রয়েছে - ফুটবল, বিচ ভলিবল, ব্যাডমিন্টন, ঘুড়ি উড়ানো, ফ্রিজবি, এমনকি দেশীয় খেলা হাডুডুর ব্যবস্থা। রিসোর্টের ভেতরে রয়েছে আরো বিস্ময়ের পালা । প্রতিটা ঘর একটা করে ঋতু আর বাংলা মাসগুলোর নাম দিয়ে নামাঙ্কিত। বৈশাখ, জ্যৈষ্ঠ, আষাঢ়, গ্রীষ্ম, বর্ষা, শরৎ ইত্যাদি। নামে যেমন সুরুচির ছোঁয়া, তেমনি সাজসজ্জাতেও। বিচিত্র সব ফুলগাছ, অর্কিড আর মানিপ্লান্ট দিয়ে রিসোর্টের শোভা আরো বাড়ানো হয়েছে। সূর্যদেব ততক্ষণে ঢলে পড়েছেন পশ্চিম দিগন্তে। যেন এক কনক প্রতিমা আমাদের বিদায় জানাচ্ছে আবার আসবার প্রতিশ্রুতি নিয়ে। এবার ফেরার পালা। সবাই ট্রলারে উঠে বসলাম। আমাদের চোখে মুখে মুগ্ধতা মিশ্রিত ক্লান্তি। ততক্ষণে ক্ষিধেয় আমাদের পেট মহা আড়ম্বরে ঢ্যাঁড়া পিটিয়ে যাচ্ছে। এতসব কিছুর মাঝে কখন লাঞ্চটাইম পেরিয়ে গেছে খেয়ালই করিনি।
লেখক : সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট ও ঝিকুট ফাউন্ডেশনের উপদেষ্টা।
সম্পাদক - আশরাফ ইকবাল, নির্বাহী সম্পাদক - বর্ষন মোহাম্মদ
© স্বত্ব সংরক্ষিত © ২০২৬ দৈনিক মুন্সিগঞ্জের বার্তা