প্রিন্ট এর তারিখঃ জুলাই ৭, ২০২৬, ৬:১৬ পি.এম || প্রকাশের তারিখঃ অগাস্ট ৩১, ২০২৫, ৯:৪১ এ.এম

কয়েকজন বন্ধু মিলে একদিন বের হলাম। চোখ ধাঁধাঁনো পোড়া মাটির প্রাসাদের নিচে দাঁড়িয়ে গেলাম। আলোহীন বনের ভেতর এত সুন্দর প্রাচীন রাজপ্রাসাদ দেখে সবাই ‘থ’। ধাতস্ত হতে সময় লাগলো। বিকট আওয়াজের সাথে সাথে প্রাসাদের ফটক খুলে যাচ্ছে। অদ্ভুত দৃশ্য, রূপকথায় যেমনটা পড়েছি।
দরজা খুললে আলো বের হওয়ার কথা। কিন্তু উল্টোটা ঘটলো। চারদিকে ঘুটঘুটে অন্ধকারে ছেয়ে গেলো। আমাদের অন্তরাত্মা শুকিয়ে কাঠ। ভয়ে আর বিষ্ময়ে সবার শরীর হিমশীতল। কারো মুখে কোনো কথা নেই। পাশেই দুই হাত মুষ্ঠিবদ্ধ করে বুকে ফুঁ দিয়ে চোখ বন্ধ করে আছি। মাথা নিচু করে বিড়বিড় করে দোয়া পড়ছে বর্ষন। কিন্তু শিহাব আর রাকিব অট্ট হাসিতে ফেটে পড়ছে ভাবে বুঝা গেল। ভয় ঢাকার চেষ্টা আরকি।
অদূরেই কোটাল হিসেবে এক অপরূপা ডানাকাটা পরী দাঁড়ানো। স্বর্গের অপ্সরা দেখিনি, শুনেছি। এমনই হবে হয়ত ! তার কুহকে আমি আটকা পড়ে গেলাম। পরীর ধবধবে আলোর সরপোশে অন্ধকার পৃথিবী যেন উদ্ভাসিত। হাত বাড়িয়ে আমাদেরকে ভিতরে আসার সাদর আমন্ত্রণ জানাল। জংলা জায়গাটা নির্জন-বিজন হওয়ায়; ভূতের ভয়ে অনেকেই পড়িমরি। কেউ সাড়া না দিলেও নিজেকে সামলাতে পারলাম না। বর্ষন বিষয়টি আঁচ করলো। নিষেধ করলো যেতে। গায়ে মাখলাম না।
পরীর হাত ধরে ভিতরে ঢুকতেই দরজা বন্ধ হয়ে গেল। পরীকে দেখে ভয় উবে গিয়েছিলো। এখন আবার শুরু হলো। বিভিন্ন ধরনের হাতিয়ার সমেত বলবত্তর সান্ত্রীরা দাঁড়িয়ে। কেউ কোন টুশব্দ বা একদম নড়াচড়া করল না। ডানপিটে হলেও আমার মনের রাজ্যে অজানা শঙ্কা আর ভয় ভূতেরা দখল করে নিল।
সামনে এগুতেই তখতে-তাউসে উপবিষ্ট বিশাল কলেবরে এক রাজার দেখা। পরী কোন কথা না বলে আমার হাত ধরে সামনে এগুচ্ছে। তার হাতের ছোঁয়ায় এক অন্যরকম আবেশ তৈরি হল আমার মনে। মালঞ্চের ভিতর দিয়ে যাচ্ছিলাম। বিচিত্র ফুলের ঘ্রাণে মাতাল আমার হৃদয়। কাছেই দাড়িয়ে আছে চোখ জুড়ানো মন কাড়া নানা রঙবেরঙ্গের বিশাল বিশাল দালান-কোটা। যেনো এক কল্পপুরী।
পরীর হাাটার গতি বাড়তে লাগলো। কি উদ্দেশ্যে কোথায় নিয়ে যাচ্ছে তা কিছুই বলছে না। আমি মন্ত্রমুগ্ধের মতো তার পিছুপিছু হাঁটিছি তো হাঁটছি। চোখের সার্চলাইট এদিক ওদিক ঘুরছে। তারপর যেখানে পোঁছুলাম সেটা এক বদ্যির ডেরা। রাজ্যের একমাত্র বদ্যির কাছে আমাকে সমর্পণ করেই পরী উধাও। তারপর কি হল কিছুই খেয়াল নেই।
জ্ঞান ফেরার পর আমি পুরাতন প্রাসাদের সরু গলিতে। অন্ধকারের ভিতরেই আনমনে হাটছি আর হাঁটছি। আশেপাশে জঙ্গল। ভয়ে গা ছমছম করছে। কিছুদূর যেতে না যেতেই আচমকা দাউ দাউ করে জ্বলে ওঠা আগুনের রুমে ঢুকে স্বস্তির নিশ্বাস ছাড়লাম। কিম্ভূতকিমাকার দশাসই চেহারার এক ভূতের উদয় হল আমার সামনে। হঠাৎ বাজখাঁই রকমের আওয়াজ ছাড়ল। আমি ভেবেই নিলাম একদম তাদের রাজ্যের গ্যাঁড়াকলে আটকে গেছি। নিজেকে শত চেষ্টা করেও ভূতের চক্কর থেকে বের করতে পারছি না। উপায়ান্ত না পেয়ে কথা বলা শুরু করে দিলাম ভূতের সাথে। আমার কথা ভাল লাগায় কোনো ক্ষতি করল না তারা। অনেকদিন ভূতটির সব অদ্ভুত কর্মবিধি পর্যবেক্ষণ করলাম। একদিন বিশাল বড় এক কড়াই নিয়ে কয়েক টন তেল ঢেলে চুলায় আগুন দিয়ে গরম করছে। আর অনেক উঁচুতে দুই গাছের সাথে ডাল বেধে ফাঁসির মঞ্চ তৈরি করছে। উদ্দেশ্য অপরাধীদের উপযুক্ত শাস্তি দেয়া। বোঝা গেল ভূতটি দণ্ডমুন্ডের কর্তা। সে অনেক বিশাল কাহিনী এখানে বলা অবান্তর।
একপর্যায়ে তার সাথে গভীর বন্ধুত্ব গড়ে উঠল। তাদের রাজ্য ঘুড়ে দেখার অভিপ্রায় ব্যক্ত করায় আমাকে মাটির নিচে একটি সুরঙ্গ পথ দেখিয়ে দিল। বিদায় মূহুর্তে বলে রাখল বিপদ ঘটলে আমার নাম বলবে তখন সব ঠিক হয়ে যাবে। তার নাম শুললে সবাই ভয়ে থরথর করে কাঁপে। এমনকি রাজাও। আমি ভূতের নাম জিজ্ঞেস করায় বলল, আমার নাম হাওরংত গডমন্ড।
এঁধো গলিতে মশাল হাতে অসিম সাহস নিয়ে হাঁটছি। একটাই উদ্দেশ্য, ভূত কোথায় থাকে, কীভাবে থাকে, কী খায় ও কী করে তা নিজের চোখে দেখা। সামনে এগুতেই ইয়া বড় এক ছাদ দেখতে পেলাম। ব্যবিলনের ঝুলন্ত উদ্যান হবে! নিচেই অনেকগুলো ভূত একসাথে বসে আছে। অনেক ভূত সম্মিলিতভাবে চিৎকার-চেচামেচি, হুড়োহুড়ি করছে। আমাকে দেখে তেড়ে আসতে শুরু করলো কেউ কেউ। সসংকোচে বন্ধুর নাম বললাম। তারা চলে গেলো। হাওরংত গডমন্ড এর মর্ম বুঝলাম।
এ রাজ্যে অতিথিদের তুলশিপাতা দিয়ে আপ্যায়ন করা হয়। এক ভূত অনেকগুলি তুলশিপাতা এনে দিল। আমি কাচাই কচকচ করে চিবিয়ে খেলাম। কষ্ট ও ঘৃণাবোধ কিছুই কাজ করছিল না তখন। তুলশিপাতা খাওয়া শেষে কোথা থেকে যে হাতে এসে হাড়গোড় জমা হল তা টের না পেলেও ভয় ঠিকই পেলাম। নিয়ম হল এগুলি তাদের কবরে রেখে আসতে হবে। কবরটি ভূতের আস্তানার এক সাগর পরেই। আমি সাগর পার হয়ে পৌঁছুলাম। ঠিক আমাদের মতই কবর। তবে কোন মাটি নেই সবক’টি পাকা করা। কবরস্থানে গিয়েই বিভিন্ন ধরনের অদ্ভুত শব্দ ও গুমরে কাঁদার আওয়াজ কর্ণকুহরে পৌঁছল। আমি হাড়গোড় রেখে ওদের রেস্ট হাইজে গিয়ে বসলাম। একটি প্রবেশ দ্বার ছাড়া আলো-বাতাস ঢোকার মতো কোন বাতায়ন-ঘুলঘুলি লক্ষ্য করা গেল না।
অনেকদিন হল কোন ঘুম নেই। এখানে অবস্থান নেয়ার পর কেন যেন খুব করে ঘুম জেকে বসল। উৎকট হৃদয় নাড়ানো ঘ্রাণে মাতোয়ারা হয়ে তড়াক করে উঠে বসলাম। সেই নগরের কোটাল পরির দেখা পেয়ে কিছুটা আশ্বস্ত হলাম। পরী আমাকে সাগরের কিনারে নিয়ে গেল। দুজনেই জম্পেশ বসে মাছের খেলাধুলা উপভোগ করতে লাগলাম। আমার ইচ্ছে জাগল পরীর মত নীল আকাশে উড়তে। তা কি সম্ভব? মানুষের ঘ্রাণ পেয়ে একদল কবররক্ষী ভূত গিলোটিন নিয়ে আমাকে দাবড়িয়ে বেড়াচ্ছে। ঘোর বিপদের মূহুর্তে ভূত বন্ধুর নামটি বেমালুম ভুলে গেলাম। পরী আমাকে দুটি পাখনা দিয়ে চলে গেল। আর ফিরে এলোনা। এটিই তার সাথে শেষ দেখা হবে আমি কল্পনাও করিনি।
মানুষের চেয়েও মোটা মোটা তীর আমার দিকে তাক করে আছে ভূতের কমান্ডো বাহিনী। আমি দমে যাবার পাত্র নই! ওদের তীর আমার দিকে আসতেই খপ করে ধরে ওদের দিকেই ফিরিয়ে দিলাম। ধরাশায়ী হয়ে তড়পাতে থাকল অনেকে। অনেকেই মারা পড়ল। ভূতদের অবস্থা বেগতিক দেখে ওদের আস্তানায় খবর পাঠালো। দলে দলে ভূত আসতে দেখে পরীর দেয়া ডানা মেলে দিলাম নীল আকাশে।
সত্যি সত্যি আমি আকাশে উড়ছি! পরীর রাজ্যে ফিরে যাব। ভাবছি আর পুলকিত হচ্ছি।
মায়ের ডাকাডাকিতে ঘুম থেকে উঠলাম। ‘ইশ! মা তুমি আমার স্বপ্নটাই শেষ করে দিলে।’ ফজরের নামাজ শেষে মাকে স্বপ্নে যা যা দেখছি আদ্যোপান্ত খুলে বললাম।