
কাজী নজরুল ইসলাম বাবুল:
গভীর রাত ঘুম আসছে না। মনে পরে গেল একটি ভুলের কথা। আসলে ইচ্ছে করেতো ভুল করিনি, সময়ের প্যাঁচে ঘটে যাওয়া ঘটনা। আমার বয়স তখন ২১। থাকি ঢাকায়, অনেকদিন পর দু সপ্তাহের সময় পেয়ে বিক্রমপুর গ্রামের বাড়ী এসেছি। আমাদের গ্রামে অনেক হিন্দু পরিবার রয়েছে। আমরা হিন্দু-মুসলিম একসাথে মিলেমিশে চলাফেরা করি, একে অন্যের বাড়ি যাই খাই। আমাদের মধ্যে খুব মিল ইত্যাদি ইত্যাদি। কলেজ বন্ধের এক সপ্তাহ চলে গেল। কোথাও বেড়াতে যাওয়ার খুব ইচ্ছে ছিল। হঠাৎ করে আমার বন্ধু অতুল আমাকে বলল, আমি ও সুশান্ত বৌদির সাথে বৌদিদের বাড়ী বেড়াতে যাব। তুই তো বলেছিলি কোথাও বেড়াতে যেতে পারলে ভাল হত। যদি যাস তাহলে কাল সকাল ৯ টায় প্রস্তুতি নিয়ে আমাদের বাড়ীতে চলে আসবি কিন্তু। মনে রাখবি তিন দিন থাকতে হবে। বড় পুঁজো হবে, মেলা বসবে। তাই তোর কি কি প্রয়োজন সাথে নিয়ে নিস। আমিও মহা খুশি বৌদির সাথে বৌদির বাড়ী বেড়াতে যাব। বৌদি আমাদের সব সময় খু-উ-ব আদর করে।
পরদিন সকাল সকাল ৮ টার মধ্যে অতুলদের বাড়ি চলে গেলাম। আগের রাতেই আমার ব্যাগ গুছিয়ে রেখেছিলাম। গিয়ে দেখি ওরা মাত্র প্রস্তুতি নিচ্ছে। পাশের বাড়িতেই সুশান্ত, ছোটবেলা থেকেই ওর মামার বাড়ি এখানে থেকে লেখা পড়া করছে। ৯টা পার হয়ে ১০টা ছুঁই ছুঁই। বৌদির বড় বড় ব্যাগ গুছাতে একটু দেরি হয়ে গেল। এরপর আমরা বেড়িয়ে পরলাম। তালতলা লঞ্চঘাট হতে দাড়াশিকো লঞ্চে চড়ে বেলা ১টায় নারায়গঞ্জ পৌঁছালাম। ওখান থেকে টেম্পু করে কাঁচপুর, সেখান থেকে বাসে দাউদকান্দি নেমে আবার ট্রলারে চড়ে বৌদিদের বাজারে নামলাম। বাজার থেকে কাঁচা রাস্তায় প্রায় ১ কি.মি. হেঁটে বৌদিদের বাড়ী পৌঁছালাম। ৪টা বেঁজে গিয়েছে, আমার খুব ক্ষিধে পেয়েছে। যদিও লঞ্চে আমরা তিন বন্ধু ঝাল মুড়ি খেয়েছি আর বৌদি খেয়েছে বরিশালের আমড়া।
বৌদিদের বাড়ি অনেক লোকজন। দূর-দূরান্তের আত্মীয়-স্বজন, কোলকাতা থেকেও অনেকে এসেছে। বিরাট বাড়ি, নারকেল-সুপারির বাগান, বড় বড় পুকুর, যেন জমিদার বাড়ি। আমাদের খাবারের ব্যাবস্থা হলো, আমরা তিন বন্ধু তিন মাদুরে বসলাম। বড় প্লেটে ভাত-সবজী, কড়লা-পটল-বেগুন ভাঁজা ও ডাল দিয়ে আমাদের খেতে দেওয়া হলো। আমি দুই বন্ধুকে অনুস্মরণ করে ভালোই চালিয়ে গেলাম। ওফ! বলতে ভুলে গেছি যাওয়ার সময় রাস্তায় বৌদি আমাকে বলেছিল, দাদা আপনি যে মুসলমান সেটা আমাদের বাড়িতে কাউকে বলবেন না। আমি বুজেছি আমাকে হিন্দু সাঁজতে হবে! খাওয়া শেষে ওবাড়ির বিভিন্ন আত্মীয়- স্বজনের সাথে কিছুক্ষণ পর পর পরিচয় হচ্ছি।
সন্ধ্যা হয়ে গেল। বাড়ির পাশেই তাদের নিজস্ব মন্দিরে পূঁজো চলছে । ভাবলাম দেখে আসি। মন্দিরের দু’পাশ সারি সারি চেয়ার, মধ্য দিয়ে মন্দিরে প্রবেশের রাস্তা, অনেক লোক চেয়ারে বসে আছে। কলকাতার দাদু পূঁজো করছেন ঘন্টা বাঁজিয়ে। সামনে গেলাম, বিকালেই দাদুর সাথে পরিচয় হয়েছিল। দাদু আমাকে দেখে বলে, দাদু আস কিছুক্ষণ চালাও। আমি বললাম দাদু অনেকদিন পর বেড়াতে এসেছি আপনিই চালিয়ে যান। মানে দাদু আমাকে পূঁজো করতে বলেছিল। কারণ আমার পরিচয় দেওয়া হয়েছে বাবুলাল চক্রবর্ত্তি। আসলে আমাকে বাবু নামেই সকলে ডাকে। আমার বন্ধু অতুল চন্দ্র গোস্বামী ও আরেক বন্ধু সুশান্ত চন্দ্র দাস। কে জানে চক্রবর্ত্তি বললইে আমিও ব্রাহ্মণ হয়ে যাব। কি যে মহা বিপদে পরেছি বৌদির কথা রাখতে গিয়ে। যাই হোক রাত আটটা, অতুল ও সুশান্তকে খুঁজে পাচ্ছি না। পূঁজো মন্ডপের সামনের চেয়ারে বসলাম, তবে এক লাইনের চেয়ারের মাঝামাঝি। জানিনা কখন কোথা থেকে কি শুরু হয়, না পারলে তো ধরাই পরে যাব। কিছুক্ষণ পর এক পর্বের পূঁজো শেষ, সপ্তপ্রদ্বীপ নিয়ে ঐ বাড়ীর আরেক বৌদি এক এক চেয়ার করে এগিয়ে আসছে। সবাই কি করে আমি ভাল মত খেয়াল করলাম। সপ্তপ্রদীপের তাপ দু হাত দিয়ে মুখমন্ডলে লেপন করছে এবং বাম হাতের উপর ডান হাত রেখে প্রসাদ নেয়, খেয়ে কপাল থেকে মাথার উপর হাত মুছে। আমিও তাই করলাম, ঘামে আমার শরীর ভিজে যাচ্ছিল।
রাতে খাওয়া দাওয়া সেরে আমরা তিন বন্ধু টিনশেড ঘরের এক কামরায় গল্প করতে করতে ঘুমিয়ে পরলাম। পরদিন খুব সকাল সকাল একটু কষ্ট হলেও উঠতে হল। টয়লেট সেরে কলের পাশে মাটিতে হাত ঘষে চাপকলে হাত মুখ ধৌত করলাম। যাই হোক স্নানে গেলাম পুকুরে। পুকুরের অপর প্রান্তে একটা মুসলমান বাড়ি, পাকা ঘাটে মুখ হাত ধৌত করছেন খুবই সুন্দরী একটি মেয়ে, আমার নজর কেড়ে নিল। ভাবলাম দু’দিন তো আছি খাতির করা যাবে। স্নান শেষে অতুল আমাকে একটা পৈতা ও ধুতি পরিয়ে দিল। এবার পুরো ব্রাহ্মণ বনে গেলাম।
সকাল হতে দূর-দূরান্ত থেকে এ বাড়ির ভক্তগণ আসতে লাগল বড় বড় চাঙ্গারি ও ঝুড়ি নিয়ে। সেখানে রয়েছে, কাপড়, গামছা, নাড়িকেল সহ বিভিন্ন ফল, চাল-ডাল। বাড়ির সামনে বড় আঙ্গিনা, সেখানে জড়ো হচ্ছে একর পর এক। উঠোনে কাঠের পিড়িতে দাড়িয়ে আশির্বাদ দিচ্ছে আমার বন্ধু অতুল ও বৌদির ছোট ভাই তপন। আমাদের আরেক বন্ধু সুশান্ত পেছনে চেয়ারে বসা। আরেকটি কাঠেরপিড়ি খালি রয়েছে। আমার খালি গায়ে পৈতা ও ধুতি পরা অবস্থায় ওখানে যেতেই অনেকে বলে উঠল আপনি ঐ খালি পিড়িটায় দাড়ান। আমি একটু থমকে গেলাম। কয়েক সেকেন্ড বুঝে নিলাম কি করতে হবে। দেখলাম ভক্তগণ মাটিতে উপুড় হয়ে নমস্কার দিচ্ছে আর ওড়া দু’জন হাত উঠিয়ে আশির্বাদ জানাচ্ছে। আমিও প্রায় ৫০ জনকে আশির্বাদ দিলাম। বেলা প্রায় ১১টায় আশির্বাদ পর্ব শেষ, মন্দিরে ধুমছে পুঁেজা চলছে।
বিকালে আমরা তিন বন্ধু আশপাশ ঘুরলাম। গ্রামটা খুব ভাল লাগল। গ্রামের লোকরা বেশ সহজ সরল। আমাদের খুব সন্মান করল। আজ পূজোঁর শেষ দিন, এলাকার হিন্দু-মুসলিম, চেয়ারম্যান-মেম্বার থেকে শুরু করে ধনী-গরিব অনেকেই এসেছে। বিকেল ৫টা, মেলায় ঘুরছি হঠাৎ নজরে পরল বৌদির ছোট বোন শেফালীর সাথে, সকালে দেখা পুকুরের ওপারের সেই মেয়েটি! আমার বুকের ভেতর কেমন যেনো করে উঠল। শেফালী আমার সাথে পরিচয় করিয়ে দিল। নাম মুক্তা দশম শ্রেণীতে পড়ে। কথায় কথায় খুব ফ্রি হয়ে গেলাম। আমরা তিন বন্ধু শেফালী ও মুক্তা মেলায় ঘুরলাম এবং নাগর দোলায় উঠলাম। বার বার ইচ্ছে হলো আমার আসল পরিচয়টা মুক্তাকে দিয়ে দেই। কিন্তু বৌদির কথা ভেবে আর পারলাম না।
রাত ১০টা পূঁজো শেষ। খাওয়া-দাওয়া সেরে মুমোতে গিয়ে বার বার মুক্তার কথাই মনে পরছিল। ভাবছিলাম কাল চলে যাব অন্ততঃ যোগাযেগের একটা ঠিকানা দিয়ে যাব। ভাবতে ভাবতে কখন যে ঘুমিয়ে পরলাম। পরদিন সকালে আবার শেফালীর মাধ্যমে মুক্তার সাথে কথা বলার সুযোগ হল। কিন্তু বেশি গভীরের কথা প্রকাশ করতে পারিনি। কারণ বৌদির কথা মনে পরে গেল।
পূঁজো শেষ তাই বেশির ভাগ আত্মিয়-স্বজন যার যার গন্তব্যে চলে যাচ্ছে। আমরাও দুপুরের পর চলে যাব। নাস্তা সেরে, আমরা তিন বন্ধু ও বৌদি ছোট ভাই তপন, বাজারে গেলাম ঘুরতে। বাজারে গিয়ে আমি যেন তিন দিনের অভিনয়ের কথা ভুলেই গিয়েছি। “খাচাঁর বন্ধি পাখি মুক্তি পেলে খোলা আকাশে যেমনটি করে আমিও মনে হয় তেমনটি করেছিলাম। তপন আমাকে বুঝে ফেলল। তাই অতুলকে ডেকে নিয়ে প্রশ্ন করল, বাবুকি মুসলমান? অতুল এড়িয়ে গেল। এরপর আমাকেই তপন জিজ্ঞেস করল, আচ্ছা বিয়াই একটা সত্য কথা বলবেন? আপনি কি মুসলমান? একটু থেমে ভাবলাম, হোটেলে খাওয়া এই এক ঘন্টার চলাফেরায় ও আমাকে আঁচ করে ফেলেছে। তাই আর মিথ্যা বলে লাভ নেই। আমিও সরাসরি বলে দিলাম হ্যাঁ। ওর মাথায় বাঁজ পরল। ভাবে বুঝা গেল।
বৌদিও কথা রাখতে পারলাম না। বিকেলে বৌদি ও আমরা তিন বন্ধু ফেরত চলে এলাম। পথে বৌদির মনটা খুব খারাপ মনে হচ্ছিল। আমার জন্য বৌদি হয়ত তার বাড়ির কারো কাছ থেকে অনেক কষ্ট পেয়েছে।
অনেক দিন হয়, বৌদিদের কারো সাথে যোগাযোগ নেই। জানিনা তারা কলকাতায় চলে গেলেন কিনা। যদি দেখা হতো তাহলে “বৌদির কাছে ক্ষমা চাইতাম”।
লেখক: সভাপতি, বিক্রমপুর টেলিভিশন জার্নালিস্ট এসোসিয়েশন ও উপদেষ্টা, ঝিকুট ফাউন্ডেশন।
সম্পাদক - আশরাফ ইকবাল, নির্বাহী সম্পাদক - বর্ষন মোহাম্মদ
© স্বত্ব সংরক্ষিত © ২০২৬ দৈনিক মুন্সিগঞ্জের বার্তা