
শীত বিদায় নিচ্ছে, কিন্তু কষ্ট নয়
ত্বাইরান আবির
শীত ধীরে ধীরে বিদায় নিচ্ছে। কুয়াশার চাদর সরে গিয়ে আকাশে ফিরছে রোদের উষ্ণতা। কিন্তু ঋতু বদলালেও বদলায়নি দেশের লক্ষ লক্ষ দরিদ্র, অসহায় ও পথশিশুর জীবনসংগ্রাম। শীত তাদের কষ্ট দৃশ্যমান করে তোলে, আর গ্রীষ্ম-বর্ষা এই কষ্টকে দীর্ঘস্থায়ী করে দেয়। শীতের শেষে কম্বলের প্রয়োজন ফুরালেও ক্ষুধা, অনিশ্চয়তা, বাসস্থানের অভাব এবং নিরাপত্তাহীনতা থেকে যায় বছরের পর বছর।
দেশের বড় শহরগুলোতে ফুটপাত, রেলস্টেশন, বাস টার্মিনাল, নদীর পাড় কিংবা নির্মাণাধীন ভবনের ছায়ায় এখনও অসংখ্য পথশিশু রাত কাটায়। কারো বয়স পাঁচ, কারো দশ- কিন্তু জীবনের বোঝা তাদের বয়সের চেয়ে অনেক ভারী। দিনের বেলা কেউ কুড়ায় প্লাস্টিক, কেউ গাড়ির কাচ পরিষ্কার করে, কেউ ভিক্ষা করে, আবার কেউ বা অপরাধচক্রের শিকার হয়। শীতের প্রকোপ কমলেও তাদের জীবনে কষ্টের কোনো বিরতি নেই। এর শুরু দারিদ্র্য থেকেই।
দারিদ্র্য শুধু আয়ের অভাব নয়, এটি শিক্ষা, স্বাস্থ্য, পুষ্টি, নিরাপত্তা ও মর্যাদার অভাবের সমষ্টি। দরিদ্র পরিবারের শিশুরা বিদ্যালয়ের বদলে জীবিকার সংগ্রামে নেমে পড়ে খুব অল্প বয়সেই। অনেক পরিবারই ন্যূনতম প্রয়োজন মেটাতে ব্যর্থ হওয়ায় সন্তানদের পড়াশোনা বন্ধ হয়ে যায়। ফলাফল- শিশুশ্রম, অপুষ্টি, ঝরে পড়া শিক্ষাব্যবস্থা এবং এক প্রজন্ম থেকে আরেক প্রজন্মে দারিদ্র্েযর উত্তরাধিকার।
বিশেষজ্ঞদের মতে, পথশিশুরা সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠী। তারা শারীরিক ও মানসিক নির্যাতনের শিকার হয় বেশি, স্বাস্থ্যসেবা থেকে বঞ্চিত থাকে এবং সামাজিক সুরক্ষা ব্যবস্থার বাইরে পড়ে যায়। মেয়েশিশুরা আরও বেশি ঝুঁকিতে রয়েছে। যৌন নির্যাতন, মানবপাচার ও জোরপূর্বক শ্রম তাদের নিত্যদিনের আতঙ্ক।
প্রতি বছর শীত মৌসুমে ব্যক্তি ও বিভিন্ন সংগঠন শীতবস্ত্র বিতরণে এগিয়ে আসে। এটি নিঃসন্দেহে মানবিক ও প্রশংসনীয় উদ্যোগ। তবে বাস্তবতা হলো- শীত চলে গেলে এই সহায়তার ধারাবাহিকতা অনেক ক্ষেত্রেই থেমে যায়। দরিদ্র ও পথশিশুদের জীবন উন্নয়নে প্রয়োজন মৌসুমি নয়, বরং দীর্ঘমেয়াদি ও কাঠামোগত পদক্ষেপ।
বিশেষজ্ঞ ও সমাজকর্মীরা বলছেন, কেবল দাননির্ভর উদ্যোগ দিয়ে এই সংকটের সমাধান সম্ভব নয়। প্রয়োজন রাষ্ট্রীয় নীতি, স্থানীয় সরকার, বেসরকারি সংস্থা ও সমাজের সম্মিলিত উদ্যোগ। যেমন-
১। শিক্ষা নিশ্চিতকরণ- পথশিশু ও দরিদ্র শিশুদের জন্য বিশেষ স্কুল, ভ্রাম্যমাণ শিক্ষা কার্যক্রম এবং পুনঃভর্তির সুযোগ বাড়াতে হবে। শিক্ষা উপকরণ ও মিড-ডে মিল কার্যক্রম বাধ্যতামূলক করা জরুরি।
২। পুষ্টি ও স্বাস্থ্যসেবা- বিনামূল্যে স্বাস্থ্য পরীক্ষা, টিকাদান, পুষ্টিকর খাবার এবং মানসিক স্বাস্থ্য সহায়তা নিশ্চিত করতে হবে। বিশেষ করে অপুষ্টি রোধে নিয়মিত খাদ্য কর্মসূচি প্রয়োজন।
৩। আশ্রয় ও নিরাপত্তা- পথশিশুদের জন্য নিরাপদ আশ্রয়কেন্দ্র, রাত্রীকালীন সুরক্ষা এবং নির্যাতন থেকে রক্ষায় কার্যকর মনিটরিং ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে।
৪। দক্ষতা উন্নয়ন ও কর্মসংস্থান- কিশোর বয়সী পথশিশু ও দরিদ্র তরুণদের জন্য কারিগরি প্রশিক্ষণ ও দক্ষতা উন্নয়ন কর্মসূচি চালু করে আত্মনির্ভরতার পথ তৈরি করতে হবে।
৫। পরিবারভিত্তিক সহায়তা- দরিদ্র পরিবারগুলোকে সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনীর আওতায় এনে নগদ সহায়তা, খাদ্য সহায়তা ও কর্মসংস্থানের সুযোগ বাড়ালে শিশুরা পথেঘাটে নামতে বাধ্য হবে না।
৬। সচেতনতা ও সামাজিক দায়বদ্ধতা- সমাজকে পথশিশুদের প্রতি করুণার চোখে নয়, অধিকারভিত্তিক দৃষ্টিতে দেখতে হবে। নাগরিক হিসেবে আমাদের দায়িত্ব শুধু সাহায্য করা নয়, নীতিনির্ধারকদের জবাবদিহিতার আওতায় আনা।
শীত চলে যাওয়া মানে কষ্টের অবসান নয়। দরিদ্র, অসহায় ও পথশিশুদের জীবনযুদ্ধ বছরের পর বছর চলতে থাকে নীরবে, অবহেলায়। একটি রাষ্ট্রের মানবিকতা বিচার হয় সে তার সবচেয়ে দুর্বল নাগরিকদের জন্য কী করে, তার মাধ্যমে। মৌসুমি সহানুভূতি নয়, প্রয়োজন স্থায়ী সমাধান। নচেৎ শীতের মতোই সহানুভূতিও আসবে আর যাবে, কিন্তু কষ্ট থেকে যাবে চিরস্থায়ী হয়ে।
সম্পাদক - আশরাফ ইকবাল, নির্বাহী সম্পাদক - বর্ষন মোহাম্মদ
© স্বত্ব সংরক্ষিত © ২০২৬ দৈনিক মুন্সিগঞ্জের বার্তা