সব শ্রেণির মানুষের মধ্যে দায়িত্ববোধ থাকা উচিত। আপনি যে পেশায় থাকুন না কেনো-দায়িত্ববোধ থাকা, নীতি নৈতিকতাবোধ থাকা, অন্যায় দেখলে প্রতিবাদ ও প্রতিরোধ করা মানুষের দায়িত্ব। যখন একজন মানুষ এ দায়িত্বগুলো এড়িয়ে চলেন, তখন প্রশ্ন থেকে যায় এ মানুষ কতোটুকু পরিশুদ্ধ। মানুষকে আল্লাহ সৃষ্টি করেছেন আশরাফুল মাখলুকাত হিসেবে। এ কারণে বলা হয় মানুষ সৃষ্টির সেরা জীব। আর সেরা মানুষ হওয়ার জন্য মানুষের কাজগুলোও সেরা হতে হয়, সঠিক হতে হয়। এখানে একটা কথা থাকে মানুষ ভুল করবে, শিখবে এটা স্বাভাবিক। তবে একই ভুল যখন বারবার ঘটে তখন ভুল আর ভুল থাকে না। সেখানে প্রশ্নের উদ্ভব হতে পারে।
সামাজিকভাবে সবচেয়ে সম্মানজনক ও সচেতন পেশা ধরা হয় শিক্ষকতাকে। একজন শিক্ষক শুধু নিজস্ব কোন প্রতিষ্ঠানের বা ব্যক্তির শিক্ষক নয়। তিনি সমাজ ও রাষ্ট্রেরও শিক্ষক। সর্বত্র তাকে সম্মানের দৃষ্টিতে দেখা হয়। শিক্ষকদের জন্য ভারতবর্ষে আলাদা বংশীয় পদবী ব্যবহার করা হতো। যারা শিক্ষকতা পেশায় থাকতেন কেবল তারাই এ পদবী ব্যবহার করতেন। বাঙালি মুসলমান শিক্ষকরা তাদের বংশীয় পদবী হিসেবে খন্দকার, আকন্দ ও নিয়াজী প্রভৃতি ব্যবহার করতেন। আর সনাতন ধর্মাবলম্বীরা ব্যবহার করতেন দ্বিবেদী, ত্রিবেদী ও চর্তুবেদী প্রভৃতি। এ পদবীগুলো অন্য কারো ব্যবহারের সুযোগ ছিল না। বাঙালি বংশ পদবীর ব্যবহার শুরু হয়েছে একমাত্র কর্মের উপর ভিত্তি করে। মহারাজা বল্লাল সেনের আমল হতে এ পদবী ব্যবহার শুরু। এখন অবশ্য শিক্ষকতা পেশায় জড়িতদের আগের মতো নিদিষ্ট বংশীয় পদবী নেই। নানা বংশীয় পদবীধারী এখন শিক্ষকতা পেশায় আছেন। বংশীয় পদবী আলাদা হলেও পেশার সম্মান কিন্তু আগের মতোই রয়েছে। সে সম্মান শিক্ষক সমাজকে ধরে রাখতে হবে খুব সচেতনভাবে।
এসএসসি পরীক্ষা ২০২৫ এর উত্তরপত্র মূল্যায়নে দায়িত্বহীনতা ও অবহেলার কারণে ঢাকা শিক্ষাবোর্ডের অধীনস্থ ৭১ জন শিক্ষককে গত ২০ আগষ্ট ২০২৫ খ্রিস্টাব্দ, নথি নং ২২২/মাধ্য/পরী/রিপোটেড/(অংশ-২)/২৯২৫(৭৮) পত্রের মাধ্যমে কালো তালিকাভুক্ত করা হয়েছে। যারা আগামী পাঁচ বছর প্রধান পরীক্ষক, পরীক্ষক ও নিরীক্ষক হতে পারবেন না। এ ৭১ জন শিক্ষকের মধ্যে নরসিংদীর ৬ জন, ফরিদপুর ৯ জন, রাজবাড়ী ৬ জন, মুন্সিগঞ্জ ৫ জন, মাদারীপুর ২ জন, ঢাকা মহানগর ১০ জন, নারায়ণগঞ্জ ৪ জন, টাঙ্গাইল ১৮ জন, কিশোরগঞ্জ ৩ জন, রাজবাড়ী ১ জন, গাজীপুর ২ জন, গোপালগঞ্জ ২ জন, মানিকগঞ্জ ২ জন ও ঢাকা জেলার ১ জন। বিষয়গুলো হলো বাংলা প্রথম ১ জন ও দ্বিতীয় ২ জন, ইংরেজি প্রথম ১৬ জন ও দ্বিতীয় ৪ জন, গণিত ১১ জন, ইসলাম শিক্ষা ১ জন, উচ্চতর গণিত ৪ জন, পদার্থ বিজ্ঞান ৬ জন, রসায়ন ৬ জন, জীব বিজ্ঞান ৩ জন, ব্যবসায় উদ্যোগ ২ জন, হিসাব বিজ্ঞান ১ জন, বাংলাদেশ ও বিশ্ব পরিচয় ১৩ জন ও ফিন্যান্স ও ব্যাংকিং ১ জন।
গত ১০ জুলাই ২০২৫ খ্রিস্টাব্দ এসএসসি ২০২৫ সালের ফলাফল ঘোষণা করা হয়। এতে ৯টি সাধারণ শিক্ষাবোর্ড এবং মাদ্রাসা ও কারিগরি বোর্ডের অধীনে এসএসসি ও সমমান পরীক্ষায় সব মিলিয়ে ৬ লাখ ৬৬০ জন শিক্ষার্থী অকৃতকার্য হয়। এরমধ্যে ছাত্র ৩ লাখ ২৪ হাজার ৭১৬ জন ও ছাত্রী ২ লাখ ৭৫ হাজার ৯৪৪ জন। জিপিএ-৫ পাওয়া শিক্ষার্থীর সংখ্যাও কম ছিল। বিগত ১৬ বছরের মধ্যে পাসের হার এ বছর সর্বনিম্ন হয়। আন্ত: শিক্ষা বোর্ড ১১ জুলাই হতে ১৭ জুলাই ফলাফল পুন: র্নিরীক্ষণের আবেদনের সময় দেয়।
ফলে এবার বিপুলসংখ্যক শিক্ষার্থী পুনঃর্নিরীক্ষণের আবেদন করে। অনেকে দুই বা তার বেশি বিষয়ের খাতা চ্যালেঞ্জ করে আবেদন করে। শুধুমাত্র ঢাকা মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক শিক্ষা বোর্ডে দুই লাখ ২৩ হাজার ৬৬৪টি খাতা চ্যালেঞ্জ করে শিক্ষার্থীরা। যা গত বছরের তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে বেশি। আবেদনকারীর সংখ্যা বেড়েছে প্রায় ২১ হাজার, আর চ্যালেঞ্জ হওয়া খাতার সংখ্যা বেড়েছে প্রায় ৪০ হাজার। সবচেয়ে বেশি আবেদন পড়ে গণিত বিষয় ৪২ হাজার ৯৩৬টি খাতা, ইংরেজি প্রথম ও দ্বিতীয় পত্র ১৯ হাজার ৬৮৮টি খাতা, পদার্থবিজ্ঞানে ১৬ হাজার ২৩৩টি এবং বাংলা প্রথম ও দ্বিতীয় পত্রে ১৩ হাজার ৫৫৮টি খাতার পুনঃর্নিরীক্ষণ হয়েছে। অন্যান্য বিষয়গুলোও রয়েছে তুলনামূলকভাবে। এসএসসি ২০২৫ পুন: র্নিরীক্ষণ ফলাফলে ঢাকা শিক্ষাবোর্ডে দেখা যায় ২ হাজার ৯৪৬ জনের গ্রেড পরিবর্তন হয়েছে। এরমধ্যে ফেল থেকে পাশ করে ২৯৩ জন। নতুনভাবে জিপিএ-৫ পেয়েছে ২৮৬ জন। এমনকি ফেল থেকেও ৩ জন জিপিএ-৫ পেয়েছে।
পূর্বের প্রকাশিত ফলাফলে অনেক শিক্ষার্থীর জীবনে বিপর্যয় নেমে এসেছিল, যা পুন: র্নিরীক্ষণের ফলে অনেক শিক্ষার্থীর জীবন বিপর্যয় থেকে রক্ষা পায়। দায়িত্ববোধে সামান্য ক্রুটি কতোগুলো শিক্ষার্থীর জীবন নষ্ট হওয়ার উপক্রম হয়েছিল, ভাবা যায়! 
সব কাজেই জবাবদিহিতা ভালো। এতে কাজে গতিশীলতা সৃষ্টি হয়। ঢাকা শিক্ষাবোর্ডের পরীক্ষা নিয়ন্ত্রকের পক্ষ থেকে যে পদক্ষেপ নেওয়া হলো ৭১ জনকে কালো তালিকাভুক্ত করে তা নিছক কোন শাস্তি নয়। এতে তাদের কাজে যেমন দায়িত্ববোধ গভীর হবে অন্যদের ক্ষেত্রেও সচেতনতা সৃষ্টি হবে। আমরা যদি কর্মকে ধর্মজ্ঞান মনে করি তাহলে দায়িত্বে অবহেলা কখনো তৈরি হবে না। ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র ভালো কাজের মধ্যদিয়েই বৃহৎ ভালো তৈরি হয়। তাই ক্ষুদ্র ভালোর দিকে সবাই সচেতন হবো, একটু যত্নবান হবো। সর্বোপরি দায়িত্বশীল আচরণ করবো এতেই কল্যান রয়েছে।
লেখক: শিক্ষক ও গবেষক।
সম্পাদক - আশরাফ ইকবাল, নির্বাহী সম্পাদক - বর্ষন মোহাম্মদ
© স্বত্ব সংরক্ষিত © ২০২৬ দৈনিক মুন্সিগঞ্জের বার্তা