এ.জেড.এ মুকুল
বাংলাদেশের মতো ৩য় বিশ্বের দেশে সরকার মূলত প্রয়োজন হয় দরিদ্র, নিম্নবিত্ত ও মধ্যবিত্ত শ্রেনীর। যারা রাষ্ট্র থেকে মৌলিক অধিকার পাবার প্রত্যাশা করে। বাংলাদেশে ১ম ও প্রধান সমস্যা-সকল সেক্টরে দুনীর্তির করাল গ্রাস। এখান থেকে সত্যিকার অর্থে মুক্তি পেতে হলে মানুষের কর্মসংস্থানকে সহজ করতে হবে আর দুনীর্তিকে কঠিন করতে হবে যেমন-জাপানে লাখ টাকা আয় করা সহজ কিন্তু ১ টাকা দুনীর্তি করা কঠিন। দুনীর্তি দমন এ কাজটি শুধু সরকারের একার পক্ষে সম্বব নয়, সকল রাজনৈতিক দলের ঐক্যমত দরকার পাশাপাশি নেতা-কর্মীদের ও সাধারন মানুষের সম্পূর্ণ সম্পৃক্ত দরকার। আমলাতন্ত্র, বেকার ও ব্যবসায়ীদের রাজনীতিতে বেশি সম্পৃক্ত করলে দুনীর্তি বাড়বে বলে সাধারন মানুষ বিশ্বাস করে যার প্রমান বিগত সরকার নিজেই। সুতরাং এ বিষয়ে অবশ্যই প্রত্যেকটি দলকে সতর্ক হতে হবে ও জিরো টলারেন্সের বার্তা দিতে হবে তৃণমূলকে।
১৯৯১ সালে বিএনপি ক্ষমতায় এসে আমদানি-রপ্তানি নীতি সহজীকরণ এবং বেসরকারি খাতকে উন্মুক্ত করার মাধ্যমে জিডিপির প্রবৃদ্ধি ৫ শতাংশের উপরে নিয়ে গিয়েছিল। গত কয়েক দশকে অর্থ পাচার এবং খেলাপি ঋণের কারণে অর্থনীতি যে চোরাবালিতে আটকে গেছে, সেখান থেকে বের হতে বিএনপি আবার ‘বাজারমুখী’ দর্শনে ফিরতে চায়। তবে এবারের বাজারমুখী হওয়াটা হবে অনেক বেশি প্রযুক্তি ও উদ্ভাবননির্ভর।
১৭ বছর পর লন্ডন থেকে দেশে ফিরে গত ২৫ ডিসেম্বর, ২০২৫ইং পূর্বাচলে গণসংবর্ধনা মঞ্চে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান বলেন, ‘আই হ্যাভ আ প্ল্যান’। দেশের মানুষের ভাগ্য ও উন্নয়নে এই পরিকল্পনা বাস্তবায়নে তিনি সবার সহযোগিতা চেয়েছেন। এর পর থেকে নানা আলোচনা শুরু হয়েছে বিএনপির প্ল্যান নিয়ে সকল জল্পনা-কল্পনা। বিএনপির আসন্ন ইশতেহারে সবচেয়ে গুরুত্ব পাচ্ছে তরুণ প্রজন্ম ও ক্ষুদ্র উদ্যোক্তারা। দলটি মনে করে, শুধু বড় শিল্পকারখানা দিয়ে বেকারত্ব দূর করা সম্ভব নয়। তাই ফ্রিল্যান্সিং, স্টার্টআপ, আইটি সেক্টর এবং সৃজনশীল পেশাজীবীদের জন্য বিশেষ পলিসি ফ্রেমওয়ার্ক তৈরি করা হচ্ছে। এটি অবশ্যই তরুণ প্রজন্মের জন্য পজিটিভ দিক।
বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী একটি সেমিনারে এ প্রসঙ্গে ব্যাখ্যা করেছেন, অর্থনীতির প্রতিটি অংশকে জিডিপিতে অবদান রাখার সুযোগ করে দিতে হবে। আমরা একে বলছি ‘ক্রিয়েটিভ ইকোনমি’। আমাদের এবারের ইশতেহারে এই সৃজনশীল অর্থনীতির বিস্তারিত রোডম্যাপ থাকবে, যেখানে মেধা ও প্রযুক্তির সঠিক মূল্যায়ন হবে।
বর্তমানে বাংলাদেশের ব্যাংক খাত এক ভয়াবহ সংকটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। খেলাপি ঋণের পাহাড় এবং অব্যবস্থাপনা দূর করতে বিএনপি চাচ্ছে আমূল পরিবর্তন। দলটির পরিকল্পনা অনুযায়ী, ক্ষমতায় গেলে সরকারের ‘আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগ’ তুলে দেওয়া হবে। বর্তমানে ব্যাংকগুলোর ওপর অর্থ মন্ত্রণালয় এবং বাংলাদেশ ব্যাংক—উভয়ের নিয়ন্ত্রণ থাকায় এক ধরণের ‘দ্বৈত শাসন’ চলে, যা স্বচ্ছতা নষ্ট করে। বিএনপি চায়, কেন্দ্রীয় ব্যাংকই হবে অর্থনীতির একমাত্র প্রধান নিয়ন্ত্রক বা ‘ওয়াচডগ’। ব্যাংকিং সেক্টরে রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ বন্ধ করে একে সম্পূর্ণ স্বাধীনভাবে কাজ করতে দেওয়া হবে।
ব্যাংকগুলোর ওপর বড় ঋণের চাপ কমাতে বিকল্প হিসেবে শক্তিশালী পুঁজিবাজার ও বন্ড মার্কেট চালুর পরিকল্পনা করছে বিএনপি। বড় বড় মেগা প্রকল্পের জন্য ব্যাংক থেকে টাকা না নিয়ে বন্ডের মাধ্যমে পুঁজি সংগ্রহের ব্যবস্থা করা হবে। এতে ব্যাংকিং খাতে তারল্য সংকট কমবে এবং সাধারণ মানুষও লাভজনক বিনিয়োগের সুযোগ পাবে।
নিত্যপণ্যের বাজারে সিন্ডিকেটের দাপট এবং চাঁদাবাজি বন্ধ করা বিএনপির অন্যতম বড় চ্যালেঞ্জ। দলটি মনে করে, প্রচলিত পদ্ধতিতে বাজার নিয়ন্ত্রণ সম্ভব নয়। তাই সাপ্লাই চেইন বা পণ্য সরবরাহ ব্যবস্থায় কৃষক থেকে ভোক্তা পর্যন্ত প্রতিটি ধাপে ‘ডিজিটাল নজরদারি’ চালু করা হবে। এর ফলে মধ্যস্বত্বভোগী বা অপ্রয়োজনীয় দালালদের দৌরাত্ম্য কমবে। চাঁদাবাজির বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স নীতি গ্রহণ করে সরাসরি প্রযুক্তি ব্যবহারের মাধ্যমে বাজার পরিস্থিতি স্থিতিশীল রাখার প্রতিশ্রুতি দিচ্ছে দলটি।
চার কোটি পরিবার পাবে ‘ফ্যামিলি কার্ড’ যার মাধ্যমে প্রতি মাসে ২০০০ থেকে ২৫০০ টাকার আর্থিক সহায়তা অথবা খাদ্য সুবিধা চাল, ডাল, তেল, লবণসহ নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য দেওয়া হবে। কৃষক কার্ডের মাধ্যমে ন্যায্যমূল্যে সার, বীজ, কীটনাশক, সরকারি ভর্তুকি ও প্রণোদনা, স্বল্প মূল্যে কৃষি যন্ত্রপাতি সুবিধা, স্বল্প ব্যয়ে সেচ সুবিধা, সহজ শর্তে কৃষিঋণ, কৃষিবীমা সুবিধা, ন্যায্যমূল্যে কৃষি পণ্য বিক্রয়ের সুবিধা, কৃষি বিষয়ক প্রশিক্ষণের সুবিধা পাবেন।
জানা যায়, একজন শিক্ষার্থী যখন দশম বা ১২তম ক্লাস পাস করবে, অন্তত দুটি বিদেশি ভাষা লিখতে ও পড়তে সক্ষম হয়, শিক্ষা খাতে এমন ব্যবস্থা নেবে বিএনপি।
শিক্ষায় মুখস্থবিদ্যায় নয়, চাহিদাভিত্তিক শিক্ষা এবং দক্ষতা ও প্রযুক্তিনির্ভর শিক্ষার মাধ্যমে তরুণদের ভবিষ্যৎ উন্নত করা হবে। দমবন্ধ করা এই শহরে খেলার মাঠ নেই। বিএনপি ক্ষমতায় গেলে খেলার মাঠ তৈরির উদ্যোগ নেওয়া হবে। ক্রীড়ার ক্ষেত্রে বলা হয়েছে, ক্রীড়াকে শুধু শখ নয়, পেশা হিসেবেও গ্রহণযোগ্য করতে বিএনপি সর্বস্তরে খেলাধুলার উন্নয়নকে অগ্রাধিকার দেবে। স্কুল ও কলেজে খেলাধুলাকে বাধ্যতামূলক করা হবে এবং পর্যাপ্ত ক্রীড়া শিক্ষক ও প্রশিক্ষক নিয়োগ দেওয়া হবে।
খতিব, ইমাম-মুয়াজ্জিনগণের সামাজিক মর্যাদা ও জীবনমান উন্নয়নে মাসিক সম্মানী প্রদান করা হবে। অন্যান্য ধর্মের (হিন্দু, বৌদ্ধ, খ্রিস্টান ও অন্যান্য) উপাসনালয়ের প্রধানদেরও এই মাসিক সম্মানীর আওতায় আনা হবে। ইশতেহার প্রণয়নের সঙ্গে বিএনপির সংশ্লিষ্ট নেতারা বলছেন, সারা দেশে অন্তত ২০ হাজার কিলোমিটার খাল ও নদী খনন-পুনঃখনন করে পানি প্রবাহ নিশ্চিতকরণ করা হবে।
বিএনপির এতো পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করতে গেলে বিশাল অংকের বাজেটের প্রয়োজন হবে। সেই রাজস্বের উৎস কোথায় হবে সেটি এখনও স্পষ্ট নয়।
বিএনপির এই অর্থনৈতিক পরিকল্পনাগুলো ভোটারদের মাঝে কতটা ইতিবাচক প্রভাব ফেলে, এখন সেটিই দেখার বিষয়। দলটির দাবি, তাদের এই পরিকল্পনা বাস্তবায়ন হলে বাংলাদেশ কেবল মধ্যম আয়ের দেশ নয়, বরং একটি প্রকৃত আধুনিক অর্থনীতির রাষ্ট্রে পরিণত হবে। তারা বাংলাদেশকে সিঙ্গাপুর, মালয়েশিয়া, কানাডা, আমেরিকা বানাতে চায় না, স্বনির্ভর বাংলাদেশ গড়তে চায়।
সম্পাদক - আশরাফ ইকবাল, নির্বাহী সম্পাদক - বর্ষন মোহাম্মদ
© স্বত্ব সংরক্ষিত © ২০২৬ দৈনিক মুন্সিগঞ্জের বার্তা