প্রিন্ট এর তারিখঃ জুলাই ৭, ২০২৬, ৬:১৭ পি.এম || প্রকাশের তারিখঃ অগাস্ট ২৭, ২০২৫, ১০:০৩ এ.এম

আশরাফ ইকবাল
বিবিখানা পিঠা
মা-বোনদের পিঠাশৈলী আর রাত-দিনের অক্লান্ত পরিশ্রম সবার স্বাদ, তৃপ্তি আর স্বস্তির মধ্য দিয়ে সার্থক হয়। নানা রকমের পিঠা খেয়ে মন যেন হারিয়ে যেতো স্বপ্নরাজ্যে! পিঠা কেবল উপাদেয় খাবারই নয়। আমাদের লোকজ ও নান্দনিক সংস্কৃতিরও বহিঃপ্রকাশ। কেবল আগমনের প্রস্তুতি প্রকৃতি আর মানুষের মধ্যে যেমন দেখা যায়, তেমনটা অন্য কোনো ঋতুর বেলায় ঘটে না। আমাদের ঐতিহ্যে শীতের সমার্থক নানা আয়োজন থাকে। খাবার, পোশাক উৎসব সব মিলিয়ে শীত একটা অন্যরকম আনন্দ-আমেজ নিয়ে আবির্ভূত হয় আমাদের জীবনে। প্রযুক্তি আর পশ্চিমা জীবনধারার ছোঁয়ায় আবিষ্ট থাকলেও আমরা পুরোপুরি বিচ্ছিন্ন হইনি স্বকীয়তা থেকে। বাঙালির জীবনে পিঠা ছাড়া শীত ভাবাই যায় না। এদিকে বিক্রমপুরের মা-বোনরা অনেক অগ্রসর। বাহারি রকমের পিঠা তৈরিতে খ্যাতি রয়েছে। সারা দেশে আলোড়ন সৃষ্টিকারী বিক্রমপুরের বিখ্যাত পিঠা ‘বিবিখানা'। দেখতে অনেকটা কেকের মত। নতুন জামাই-শ্বশুরকে খুব আদর-আপ্যায়ন করে খাওয়ানো হয় । এই অঞ্চলের মা-বোনরা এ পিঠা বানাতে খুব পারদর্শী। প্রয়োজনীয় উপকরণ হচ্ছে: চালের গুঁড়া ২ কাপ, দুধ ১ কেজি, নারিকেল ১ কাপ, এলাচ গুঁড়া আধা চা চামচ, খেজুরের গুড় ২ কাপ, ডিম ২টা। যেভাবে করবেন: চাল গুঁড়া ভাল করে ভেজে নিন । প্রথমে ১ কেজি দুধ গরম করে আধা কেজি করে নিন, ডিম ভালো করে মিশিয়ে চালের গুঁড়ায় মিলিয়ে নিন। সব শেষে নারিকেল মিলিয়ে নিন। টিফিন বাটিতে ঘি ব্রাশ করে খামির ঢেলে বাটিতে ১ ঘণ্টা তাপ দিন মৃদু আঁচে। পরে ছুরি/কাঁটা চামচ দিয়ে দেখে নামিয়ে নিতে হবে। এরপর কেটে কেটে পরিবেশন করুন।
পাতক্ষীর
বিক্রমপুরের বিভিন্ন অঞ্চলে বিশেষভাবে সিরাজদিখান উপজেলার সন্তোষপাড়া গ্রামে তৈরি হয় বিশেষ এক ধরনের মুখরোচক খাবার পাতক্ষীর। গরুর খাঁটি দুধ দিয়ে তৈরি এই পাতক্ষীরের চাহিদা শুধু দেশেই নয়, সুদূর ইউরোপেও রয়েছে। কোন অনুষ্ঠানে খাবার তালিকায় এই পাতক্ষীর থাকবেনা তা কল্পনা করা যায় না। প্রতিদিন শত শত কেজি দুধ ব্যবহার হচ্ছে এ ক্ষীর তৈরিতে। সব মৌসুমেই এর চাহিদা থাকলেও শীতে এর চাহিদা অনেক বেশি। বিক্রমপুরের ঐতিহ্যের পাটিশাপটা পিঠা তৈরিতেও প্রয়োজন হয় পাতক্ষীরের। নতুন জামাইয়ের সামনে পিঠা-পুলির সাথে এ ক্ষীর ব্যবহার না করা যেনো বেমানান। গ্রামবাংলায় মুড়ির সাথেও এ ক্ষীর খাওয়ার পুরনো রীতি রয়েছে। সিরাজদিখান উপজেলার সন্তোষপাড়া গ্রামের পুলিনবিহারী দেব প্রথম স্ত্রীকে নিয়ে এই সুস্বাদু ক্ষীর তৈরি করেন। সেই শত বছর আগের কথা। এছাড়া ইন্দ্রমোহন ঘোষ, লক্ষ্মীরাণী ঘোষও তৈরি করতেন পাতক্ষীর। তারা সবাই প্রয়াত। এখন তার বংশধররা শুধু ঐতিহ্য টিকিয়ে রাখতেই বানাচ্ছেন এই ক্ষীর। কার্তিক চন্দ্র ঘোষ, ভারতী ঘোষ, সুনীল চন্দ্র ঘোষ রমেশ সাম ঘোষ, বিনয় ঘোষ, মদুসূদন ঘোষ, সমীর ঘোষ ও ধনা ঘোষ এখনও এ পেশায় রয়েছেন। সুনীল ঘোষের ৫ ভাই এ পেশায় জীবিকা নির্বাহ করেন। বিক্রমপুরের তথা বাংলাদেশের গন্ডি পেরিয়ে এখন আমেরিকা, ইতালি, জার্মানি, ফ্রান্স ও জাপানে এ ক্ষীরের চাহিদা রয়েছে। দুখ। দুধের সঙ্গে সামান্য (৫০ গ্রাম) চিনি ব্যবহার করা ছাড়া কিছুই ব্যবহার হয় না এতে। তবে ডায়াবেটিক প্রতি কেজি পাতক্ষীর তৈরিতে ৩ কেজি দুধ প্রয়োজন হয়। এক ঘন্টারও বেশি সময় ধরে গরম করতে হয় রোগীর জন্য বিশেষ অর্ডার থাকলে এতে চিনিও দেওয়া হয় না। দীর্ঘক্ষণ নরম করার সময় দুধ যখন ঘন হয় তখন মাটির পাতিলে রাখা হয়। ঘন্টাখানেক পর ঠান্ডা হলে তা কলা পাতায় পেঁচিয়ে বিক্রি করা হয়। তবে হাতের যশ আর কৌশলের গুরুত্ব বহন করে স্বাদের ক্ষেত্রে। ঘন করতে গেলে চুলোয় দুধে পোড়া লেগে যায়। তাই কাঠের বিশেষ লাঠি দিয়ে নাড়তে হয়। আর 'পাতা' নিয়েই এর নামকরণ। হ্যাঁ, তৈরি সম্পন্ন হওয়ার পর এ ক্ষীর কলা পাতায় জড়িয়ে থাকে বলেই এ ক্ষীরের নাম হয়েছে ‘পাতক্ষীর'। শুধু সুনীল ঘোষের বাড়িতেই প্রতিদিন এ ক্ষীর তৈরি হয় ৫০ টিরও বেশি। প্রতিটি ক্ষীরের ওজন প্রায় আধা কেজি। প্রতি পাতক্ষীরের মূল্য ২০০ থেকে ২৫০ টাকা। অর্থাৎ প্রতি কেজি হিসেব করলে ৪০০-৪৫০ টাকা পড়ে যায় ৷
সাগরানা
বিয়ের সময় বরকে যে থালায় আলাদা খাবার পরিবেশন করা হয় তাকে বিক্রমপুরের আঞ্চলিক ভাষায় সাগরানা বলে। সাগরানার বৈশিষ্ট ছিল তার মধ্যে অপ্রচলিত বিভিন্ন জিনিস দিয়ে লাড্ডু বানিয়ে তা সাগরানার খালায় দেয়া হত। এর মধ্যে ছিল ঘেচুর লাডু, কচুর লাড্ডু, দূর্বা ঘাসের লাড়ু, ঢেপের মোয়া ইত্যাদি । এখন আর আগের মতো সেসব জিনিস দেয়া হয় না। এখন শুধু পোলাওর সাথে আস্ত মুরগি, হাঁস অথবা খাসি ভুনা করে দেয়া হয়। তবে ইতিপূর্বে খাসির প্রচলন ছিল না। সম্ভবত যারা সৌদি আরবের প্রবাসী তারাই এটার প্রচলন করেছে। কারণ সৌদি আরবে বরকে আস্ত খাসি অথবা দুম্বা পরিবেশন করা হয়।
পান শরবত
বিক্রমপুরের আরেকটি ঐতিহ্যবাহী পানিয়ের নাম পান শরবত। যা পান, চিনি ও দুধ সহকারে তৈরি করা হয়। প্রথমে দুধের সাথে পানি মিশিয়ে তাতে পান কচলিয়ে সেটি সেকে নিয়ে তার সাথে চিনি মিশিয়ে শরবত তৈরি করে তা পরিবেশন করা হত। বিশেষ করে বিয়ের আকদের সময় এই পান শরবত একান্ত প্রযোজ্য ছিল। এই শরবত প্রথমে বরকে খেতে দেওয়া হত। শরবত বর পান করার পর অবশিষ্টাংশ কনেকে পান করতে দেওয়া হত। এখনও বিক্রমপুরের বিয়েতে শরবতের প্রচলন রয়েছে। তবে আগের মতো পানপাতার রস মেশানো হয় না।
পানসি নৌকা
নদী বেষ্টিত বিক্রমপুরে এক সময়ে যাতায়াতের মাধ্যম ছিল ছোট ছোট পানসি নৌকা। কিন্তু সময়ের বিবর্তনে আজ সেই নৌকা হারিয়ে যেতে বসেছে। এক সময় দূরে কোথাও যাতায়াতে কিংবা নতুন বৌকে বাবার বাড়ি থেকে স্বামীর বাড়ি আনতে পানসি নৌকার বিকল্প ছিল না। সে সময় মাঝি-মাল্লার ভাটিয়ালি আর মুর্শিদী গানে মন কেড়ে নিত সবার। তখন সর্বত্রই চলাচলের মাধ্যম ছিল পানসি নৌকা । কিন্তু আজ কালের বিবর্তনে নদী-খাল-বিল ভরাট হয়ে যাওয়ায় ক্রমে হারিয়ে যাচ্ছে পানসি নৌকাও । এখন আগের মত দেখা যায় না চিরচেনা সেই পানসি নৌকা । এখন পরিবর্তন হয়েছে যোগাযোগের মাধ্যম পানসি নৌকার পরিবর্তে এসেছে বাস, লঞ্চ ও স্টিমারসহ নানা যান। সেই সাথে জীবনমানে পরিবর্তন এসেছে অনেক। অধিকাংশ এলাকায়ই এখন সড়ক যোগাযোগ ব্যবস্থা উন্নত হয়েছে। এই এলাকার মাঝিরা বাপ- বাদার ঐতিহ্য হিসাবে এ পেশাকে অনেকে ধরে রাখার চেষ্টা করছেন।
আগে এ অঞ্চলে নৌকা বিক্রির ধুম পড়ে যেত। সারাদিন ধরে কারিগররা নৌকা তৈরিতে ব্যস্ত সময় কাটাতো। এখন আর আগের মতো নৌকার প্রচলন নেই। ফলে এই কারিগরদের কদরও নেই । এখন তারা ফার্নিচার তৈরিতে ব্যস্ত । আগে ঘাটে প্রতিদিন অসংখ্য নৌকা থাকত। এখন বর্ষার সময় কিছু নৌকা চললেও শুকনো মৌসুমে বেশি চলাচল করতে পারেনা। নদী ও খাল শুকিয়ে যাওয়ায় ও কচুরিপানায় নৌকা চলাচলের অনুপযোগী হয়ে পড়েছে নৌপথ। দূরে কোথাও অনুষ্ঠানে যাওয়ার প্রয়োজন হলে পানসি সাজিয়ে যাওয়া হত। বিয়েসহ বিভিন্ন অনুষ্ঠান ও হাটবাজারে পানসির খুব কদর ছিল। কিন্তু আজ আর সেই পানসি নেই । নদী-নালা, খাল-বিলের এই অঞ্চলে এক সময় নৌকা ছাড়া যাতায়াতের কথা চিন্তাই করা যেতো না। বিক্রমপুরের রজত রেখা, কাজল রেখা, পোড়াগঙ্গা, কালিদাস সাগর, ইছামতি, ধলেশ্বরি নদী ও বিভিন্ন শাখা নদীগুলোতে ছোট বড় পানসি নৌকা চলাচল করত। এ সব নদীতে মাছ ধরার কাজেও পানসি নৌকা ব্যবহার হতো। বর্তমানে নদীগুলো মরে যাওয়ায় এখন আর আগের মত পানসি নৌকা দেখা যায়না, মাছ ও ধরেনা। এখনও কিছুটা স্বোতস্বিনী নদী যদি সরকার খনন কাজ দ্রুত হাতে না নেয় তাহলে ভবিষ্যতে এই এলাকা নদী শূন্য হয়ে পড়বে।
পালকি
পালকির সঙ্গে মিশে ছিল মধুময় এক স্বপ্ন। গাঁয়ের পথে পালকি করে নববধুকে নিয়ে যাওয়ার দৃশ্য দেখতে ছেলে-মেয়েরা রাস্তায় আর বৌ-ঝিয়েরা বাড়ির ভিতর থেকে উঁকি-ঝুকি মারত। পালকির মধ্যে বসা নববধূকে দেখে তারাও হারিয়ে যেত কল্পনার রাজ্যে। ছয় বেয়ারা পালকি কাঁধে নিয়ে ছন্দ তুলে বৌকে নিয়ে যেত বাংলার শ্যামল মেঠো পথ ধরে। এ যুগের বধূরা খুব একটা পালকিতে লজ্জারাঙা মুখে শ্বশুর বাড়িতে যায় না। শ্যামল বাংলা, সেই মেঠো পথ, নতুন বধূ সবই থাকবে, কিন্তু যান্ত্রিক যুগে হারিয়ে যাচ্ছে সেই পালকি । পালকি নামটির উৎপত্তি ফারসি ও সংস্কৃত উভয় ইন্দো ভারতীয় ভাষা থেকে। আর সেই সাথে ফরাসি থেকেও। সংস্কৃতে পলাঙ্কিকা। পালকি দেখতে অনেকটা কাঠের বাক্সের কাঠামো। দৈর্ঘ্য ৬ ফুট প্রস্থ তার অর্ধেক কাঠামো লম্বা দুপাশে বাঁশের সাহায্যে গাঁথা। পালকির উপরে দামী কাপড় দ্বারা পর্দা টাঙানো থাকে । তৎকালীন বিক্রমপুরের সংস্কৃতিতে পালকির ছিল। আগের দিনে বিত্তশালী পরিবারগুলোতে নিজস্ব পালকি ও বেয়ারা থাকত। আর নিম্নবিত্তরা তাদের বৌ-ঝিদের আনা নেয়ার জন্য ভাড়া করত পালকি। অন্যসব কাজে পালকি ব্যবহার হলেও বিয়ে-সাদিতে পালকির ব্যবহার ছিল অপরিহার্য্য। পালকির ব্যবহার কিভাবে কখন এদেশে শুরু হয়েছিল তার সঠিক ইতিহাস জানা যায়নি। তবে মোঘল ও পাঠান আমলে বাদশাহ, সুলতান, বেগম ও শাহাজাদীরা পালকিতে যাতায়াত করত বলে জানা গেছে। ইংরেজ আমলের নীলকররা পালকিতে করে এক স্থান থেকে অন্যস্থানে ঘুরে বেড়াতো। আর সেজন্যই পালকি অভিজাত শ্রেণীর বাহন হিসেবে গণ্য করা হতো। মুন্সিগঞ্জের বিভিন্ন উপজেলার বিভিন্ন গ্রামে এক সময় পালকির প্রচলন ছিল । গ্রামের বিভিন্ন অনুষ্ঠান ছাড়াও বিয়েতে অন্যতম বাহন ছিল পালকি । এই এলাকায় পালকি খুব একটা দেখা যায় না বললেই চলে । এখন কিছু এলাকায় প্রচলন না থাকলেও পালকি দেখা যায়। তার মধ্যে টঙ্গিবাড়ি উপজেলার দিঘিরপাড় বাজার, ভাঙ্গুনিয়া, হাসাইল বাজার, বালিগাও বাজার, আলদি, সিরাজদিখান উপজেলার ইছাপুরা বাজার, কুসুমপুর, নওপাড়া, সদরের ধলগাঁও বাজার, দরগা বাড়ি, মদিনা বাজার, চুরাইন ইত্যাদি। জাতীয় যাদুঘর ছাড়া পালকি দেখার সুভাগ্য ভবিষ্যতে থাকবে বলে মনে হয় না । পালকির প্রচলন না থাকায় এই ঐতিহ্যও এখন বিলুপ্তির পথে, যেদিন আমাদের নতুন প্রজন্ম পালকি নামক মানুষের ঘাড়ে চড়ে বসা কোন বাহনের কথা বই পুস্তকে পড়বে এবং লোকশিল্প যাদুঘরে গিয়ে সাজানো গোছানো কৃত্রিম পালকি দেখবে।
মাটির পাত্র
যুগ যুগ ধরে বিক্রমপুরের বিভিন্ন এলাকার মৃৎশিল্পীরা হাঁড়ি-পাতিল যেমন- মুড়ি ভাজা হাঁড়ি, রুটি বানানো তাওয়া, ধোঁওয়া-মোছার কাজে মালসা, পানির কলস, রসের ঠিলি, ভাড়, নান্দা, পাতিল, থালা-বাসন, কড়াই, পিঠার খোলা, ঝাঁজর-সাবনি, কাহা, সরা, লোটা, আউত্তা, মটকি, মাইট, দইয়ের তেলাইন, ফুলের টব, বিভিন্ন দেব দেবীর মূর্তি, গরুর ঘাস খাওয়ানোর গামলা, ডাবর, ঢাকনা, খাসা, মাটির ব্যাংক, প্রদীপ, গরু, পুতুল, মাটির আম, কাঠাল, তাল, খেলনা হাতি, ঘোড়াসহ বিভিন্ন ধরনের নিত্যব্যবহার্য জিনিসপত্র তৈরি করে আসছে। কালের আবর্তে ও আধুনিকতার ছোঁয়ায় মৃৎশিল্পীদের হাতে তৈরি তৈজসপত্রের চাহিদা কমে গেছে। সে খুব বেশি দিনের কথা নয়, ১০-১২ বছর আগেও মাঠে-ঘাটে, রাস্তার আশপাশ থেকে পর্যাপ্ত মাটি এমনিতেই পাওয়া যেতো। পাশাপাশি জ্বালানিও (খড়, কাঠের গুঁড়া, ধানের তুষ, আখের শুকনো পাতা) প্রচুর পাওয়া যেতো। এখন পাওয়া গেলেও চড়া দামে ক্রয় করতে হয়। আবার অনেক সময় টাকা দিয়েও মিলতে চায়না । এ কাজে পরিশ্রমও বেশি। শ্রমের তুলনায় উপযুক্ত দাম পায় না মৃৎশিল্পী- রা। এছাড়া আধুনিক জিত্রিসপত্রে যেমন প্লাস্টিক, এ্যালুমোনিয়াম, কাঁসা, সিলভার, কাঁচ, মেলামাইন, সিরামিক, স্টিলসহ বিভিন্ন ধরনের সামগ্রী মাটির তৈরী তৈজসপত্রের বিকল্প স্থান দখল করে নিয়েছে। ফলে মৃৎশিল্পীদের হাতের তৈরি জিনিসপত্রের চাহিদা কমে গেছে। তবে দইয়ের পাত্র ও নার্সারিতে ব্যবহৃত টবের চাহিদা রয়েছে। সরকারি ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠান যদি এ ব্যাপারে পৃষ্ঠপোষকতা করত তাহলে এই মৃৎ শিল্পীদের মানবেতর জীবন-যাপন হত না। ফলে মাটির পাত্রও টিকে থাকত বিক্রমপুরের ঐতিহ্য হিসেবে।
ইলিশ
ইলিশ অর্থনৈতিক ভাবে খুব গুরুত্বপূর্ণ গ্রীষ্মমন্ডলীয় মাছ। বাঙালির রসনাতৃপ্তির রসদ পদ্মার ইলিশের কথা শুনলে জিভে জল আসে না, এমন ভোজন রসিক কমই রয়েছেন। ইলিশ বাঙালির নজরে মাছের রাজারাণী। দুই বঙ্গেরই জাতীয় মাছ । পুরোনো ঢাকার বাসিন্দা, কবি বুদ্ধদেব বসু দেশচ্যূত হয়েও পদ্মার ইলিশের গন্ধে মেতে থাকতেন। তার একটি অসাধারণ কবিতায়- ‘তারাও জলের উজ্জ্বল শস্য । মহিমাময় মৎস্য বটে। এত ঝকঝকে, এত অভিজাত, জলজ সম্পদ আর কী আছে, জানা নেই। স্পর্শকাতর আর শিশুদের উচ্ছ্বাসের মতো নির্মল তাদের স্বভাব । সমুদ্রে অথবা মোহনায় জালে আটকে পড়ে যখন লাফিয়ে ওঠে, তখন মাঝরাতের, মাঝসমুদ্রের আঁধারেও চকচক করে ওঠে রাজারানীর ঔজ্জ্বল্য'। বঙ্গোপসাগরের ব-দ্বীপাঞ্চল, পদ্মা-মেঘনা থেকে প্রতি বছর প্রচুর ইলিশ ধরা হয়। এটি সামুদ্রিক মাছ ৷ কিন্তু এই মাছ বড় নদীতে ডিম দেয়। ডিম ফুটে গেলে ও বাচ্চা বড় হলে ইলিশ মাছ সাগরে ফিরে যায়। সাগরে ফিরে যাবার পথে জেলেরা এই মাছ ধরে । এই মাছের অনেক ছোট ছোট কাটা রয়েছে । তাই খুব সাবধানে খেতে হয়। পদ্মার ইলিশের স্বাদ সবচেয়ে ভালো বলে ধরা হয়। গরম গরম ভাজা পদ্মার ইলিশ দিয়ে পান্তাভাত খেতে যে স্বাদ তা আর কোন এলাকার ইলিশ মাছে পাওয়া যায় না। কিন্তু বর্তমানে পদ্মা নদীতে পলি জমে তা সংকুচিত হওয়ায় এখন আর আগের মত ইলিশ মাছ পাওয়া যায় না। যাও কিছু পাওয়া যায় তা সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে। একসময় ধাবন ও ভাদ্র মাসে মুন্সিগঞ্জ তথা বিক্রমপুরের মানুষ এক মালাই ও দু মালাই নৌকায় করে ছেলে মেয়ে বউ ঝিসহ ইলিশ মাছ নিয়ে আত্মীয় বাড়িতে বেড়াতে যেত এবং যাত্রা পথে যে আনন্দ ছিল তা থেকে বর্তমান প্রজন্ম বঞ্চিত। কারণ এখন বিভিন্ন স্থানে রাস্তাঘাট হওয়াতে অধিকাংশ এলাকায় নৌকা খেচল। পূর্বে এবাড়ি থেকে ওবাড়ি যেতেও নৌকা ছাড়া কোন গতান্তর ছিল না। এখন মানুষ রিক্সা, বেবি, অটোরিক্সা, সিএনজি, টমটম, মোটর সাইকেল, বাস, প্রাইভেটকার ও মাইক্রো নিয়ে বেড়াতে গেলেও নৌকায় চরে ইলিশ মাছ নিয়ে বেড়াতে যাওয়ার আনন্দই ছিল আলাদা। যা বর্তমান প্রজন্ম ভারতেও পারে
ইলিশ সংক্রান্ত বিদ্যা আমাদের খুব সীমিত, একথা অকপট স্বীকার করছি। ইলিশ ভাপে, ভেজে, সিদ্ধ করে, কচি কলা পাতায় মুড়ে পুড়িয়ে, সরিষা দিয়ে, জিরা, বেগুন, আনারস দিয়ে এবং শুঁকিয়ে শুটকি করে, আরো বিভিন্ন প্রণালীতে রান্না করা হয়। বলা হয়, ইলিশ মাছের প্রায় ৫০ রকম রন্ধনপ্রণালী রয়েছে। ইলিশের ডিমও খুব জনপ্রিয় খাবার। এই মাছ রান্না করতে খুব অল্প তেল প্রয়োজন হয়। কারণ ইলিশ মাছে প্রচুর তেল থাকে। অনেক বাঙালি হিন্দু পরিবার বিভিন্ন পূজার শুভ দিনে জোড়া ইলিশ বা দুই টি ইলিশ মাছ কেনে। সরস্বতী পূজা ও লক্ষ্মী পূজায় জোড়া ইলিশ কেনা খুব শুভ লক্ষণ মনে করা হয়। এছাড়া লবন দিয়ে নোনা বানিয়ে ইলিশ দীর্ঘদিন রেখে বিভিন্ন সবজির সাথে রান্না করা হয়।
বুরিন্দা/আলুর শুটকি
আলু কেটে টুকরো টুকরো করে সেদ্ধ করে শুকিয়ে বুরিন্দা বানানো হয়। এটি বিক্রমপুরের সুপ্রাচীন ঐতিহ্য। সাধারণত ফাল্গুন মাসে আলু সংগ্রহ করার সময় আলু কুচি কুচি করে কেটে টুকরো করা হয়। তারপর সেসব টুকরো সেদ্ধ করে সরাসরি পাটি, ঢেউ টিন, হোগলা বা বাঁশের চালুনিতে বিছিয়ে রোদে শুকানো হয় । ভালভাবে শুকানোর পর তাতে কোনো রস থাকে না, মচমচে না হলেও শুকিয়ে খটখটে হয়ে যায় । গৃহস্থরা এগুলো বায়ুবদ্ধ কৌটায় ভরে সংরক্ষিত করে। বিক্রমপুর এলাকায়ই এগুলোর বেশি প্রচলন রয়েছে। তেল দিয়ে ভেজে চিনি মিশিয়ে অতিথি আপ্যায়নের একটি গ্রামীণ জনপ্রিয় প্রথার প্রচলন রয়েছে। আলুর কষের পিঠা পিঠা কেবল উপাদেয় খাবার মাত্র নয় । আমাদের লোকজ ও নান্দনিক সংস্কৃতির বহিঃপ্রকাশ। আলু বোনার দিনে প্রচুর আলু কাটা হয়। আলু কাটার ফলে প্রচুর কষ বের হয়। যা একসাথে জমিয়ে রেখে দিলে পরিমাণে অনেক । এছাড়া আলু কুচিকুচি করে কেটে পানিতে ভিজিয়ে রাখলে নিচে অনেক কষ জমা হয়। সিদ্ধ করলে বার্লির মতো আঠালো হয়। রং মিশিয়ে রঙিন করা হয়। পাতার/কাকের পিঠার মতো বানানো হয়। তারপর রোদে শুকাতে হয়। পুষ্টি-স্বাধ কোনটিরই ত্রুটি হয় না। এ দিয়ে বিক্রমপুরে বিভিন্ন ধরনের খাবার আইটেম বানানো হয় ।
দোতলা ঘর
বিক্রমপুরের গ্রামাঞ্চলের কথা ভাবলেই চোখের সামনে ভেসে উঠে দোতলা ঘর। দিন যেভাবে বদলাচ্ছে তাতে কেবল কল্পনাতেই দেখতে হবে চোখ জুড়ানো এই ঘর । অঞ্চলের লৌহজং উপজেলায় এটি বেশি লক্ষ করা যায়। স্থানীয় বিত্তবানদের একটি দোতলা ঘর থাকা যেন অলিখিত নিয়ম। সৌন্দর্য বর্ধন করে কাঠের ও টিনের তৈরি বিভিন্ন কারুকার্য খচিত এই ঘর। অভিজাত্যেরও প্রতীক। তবে পরিবারে বেশি সদস্য থাকার ও সৌন্দর্যের জন্যও অনেকে দোতলা ঘর তৈরি করে থাকে। এক সময় এ অঞ্চলে অজস্র দ্বোতলা ঘর থাকলেও এর বেশির ভাগই এখন নেই। আধুনিকতা, আভিজাত্য আর রুচিশীলতার পরিচয় দিতে গিয়ে হারিয়ে যাচ্ছে বিক্রমপুরের ঐতিহ্যবাহী দোতলা ঘর । এখন অনেকেই পাকা ঘর তৈরি করছে। তবে এতেও রয়েছে ভিন্নতা এবং কারুকার্যের ছাপ।
মিঠুরি
মিঠুরি বিক্রমপুরের এক ঐতিহ্যবাহী খাবার। যা বাংলাদেশের আর কোথাও হতো না বা হয় না। একসময় বড় বড় ভোজে মিঠুরি ছাড়া পূর্ণতা পেত না। মিঠুরি তৈরি হয় আতপ চাউলের গুড়া, খেজুরের গুড় ও দুধ দিয়ে । প্রথমে দুধ ভালভাবে জাল দিয়ে তার মধ্যে চাউলের গুড়া, গরম মশলা, তেজপাতা দিয়ে ভালভাবে ফুটানো হয়। এরপর দেয়া হয় খেজুরের গুড়। এই দ্রব্যটি যখন ঘন হয়ে আঠালো হয় তখনই নামিয়ে রাখতে হয় । মিঠুরি রান্নার কারিগরও ছিল আলাদা। খাবার শেষে মিঠুরি ছাড়া আগত অতিথিদের খাবারের পূর্ণতাই পেত না। কিন্তু কালের বিবর্তনে ও আধুনিক সভ্যতার ছোঁয়ায় মিঠুরি এখন বিক্রমপুর থেকে উধাও। বর্তমান প্রজন্ম মিঠুরির নামও জানে না ।
মুন্সিগঞ্জের সাগর কলা
এক সময় মুন্সিগঞ্জের সাগর কলা অত্যন্ত প্রসিদ্ধ ছিল। এ এলাকায় উৎপন্ন সাগর কলার সাধও ভিন্ন ছিল। কিন্তু কালের স্রোতে সেই সাগর কলা কোথায় যেন হারিয়ে গেছে। মুন্সিগঞ্জের সাগর কলার স্বাদ ও ঘ্রাণই ছিল আলাদা। এখনও অবশ্য কিছু কিছু সাগর কলা মুন্সিগঞ্জের রামপালে উৎপন্ন হয়। তবে তা নেহায়েতই অপ্রতুল। এখন সাগর কলার বদলে হয় গোল আলুর চাষ। গোল আলু এখন ‘বিক্রমপুরের স্বর্ণপিন্ড' নামে খ্যাতি লাভ করেছে।
আড়িয়ল বিলের হলুদ
কই আড়িয়ল বিলের হলুদ কই মাছও এক সময় খ্যাতির শীর্ষে ছিল। এটিও ছিল বিক্রমপুরের ঐতিহ্য। কিন্তু বিভিন্নভাবে বিশেষ করে দূষিত পানির কারণে এখন আর আগের মত সেই হলুদ কই মাছ পাওয়া যায় না । এর একটি প্রধান কারণ হল আড়িয়ল বিলে বর্ষার পানির সংযোগ এখন নানা কারণে বাধাগ্রস্থ। তাছাড়া অনেক স্থানে এখন ধানের চাষ হচ্ছে। ফলে সংকুচিত হয়েছে মাছের বাসস্থান ৷
নারু-মোয়া
বিক্রমপুরের আরেকটি ঐতিহ্যবাহী খাবার হল নাড়ু ও মোয়া। বিক্রমপুরবাসী নাড়ু ও মোয়া খেতে খুবই পছন্দ করেন। বিশেষ করে শীতকালে এর চাহিদা বেড়ে যায়। তবে বর্তমানে আধুনিক সভ্যতার ছোবলে ও মা বোনদের অলসতার কারণে মুসলিম পরিবারে এখন নাড়ু মোয়া খুব একটা তৈরি হয় না। তবে লক্ষ্মীপূজা উপলক্ষে এ এলাকার হিন্দু সম্প্রদায় ঘরে ঘরে নাড়ু মোয়া তৈরি করে থাকেন। বিশেষ করে তিলের নাড়ু, নারকেলের নাড়ু, কাউনের নাড়ু এবং চালভাজা গুড়া করে নাড়ু তৈরি এবং চিড়া ও মুড়ির মোয়া তৈরি করা হয়।
হাতে টেপা সেমাই
একসময় বিক্রমপুরের হাতে টেপা সেমাই যাকে জিরা সেমাইও বলা হয় তা খুবই প্রসিদ্ধ ছিল। বিশেষ করে নতুন অতিথি ও বিয়ে সাধিতে এর খুবই কদর ছিল। পূর্বে বিক্রমপুরে টেপা সেমাই ছাড়া বিয়ের অনুষ্ঠান কল্পনাই করা যেত না। চালের গুড়া সিদ্ধ করে ভাল করে মথে নিয়ে বৃদ্ধাঙ্গুল ও তর্জনীর মাধ্যমে টিপে প্রায় জিরার আকারে তৈরি করে তা ভাল করে রোদে শুকিয়ে বোতলে ভরে রাখা হত। পরে দুধ ও চিনি সহকারে রান্না করা হত । বিশেষ করে মেয়ের বাড়িতে অর্থাৎ যাদের বিবাহযোগ্য মেয়ে থাকত তাদের ঘরে পূর্বাহ্নেই এই সেমাই তৈরি করে রাখা হত। কারণ কখন কোথা থেকে মেয়েকে দেখতে আসে এবং নতুন অতিথি আপ্যায়নে এই সেমাইর বিকল্প ছিল না।