গোলাম আশরাফ খান উজ্জ্বল:
বাংলা ভাষিক সাহিত্যিকগণ মুন্সীগঞ্জের বিশিষ্টজনদের নিয়ে সাহিত্য রচনা করেছেন। ইতিহাস, ঐতিহ্য, শিক্ষা, সংস্কৃতি ও ব্যবসা বাণিজ্যে দেশের সেরা একটি জেলা। এ জেলার মানুষগুলো অতিথি পরায়ন। তাদের রসনা বিলাস দেশ জোড়া। মুন্সিগঞ্জে এমন কিছু মানুষের জন্মস্থান যাদের নাম ডাক যশ বিশ্ব জোড়া। এদের মধ্যে জ্ঞান তাপস অতীশ দিপঙ্কর, বিজ্ঞানী জগদীশ চন্দ্র বসু, ব্যারিস্টার চিত্তরঞ্জন দাশ, ড. অঘোর নাথ চট্টোপাধ্যায়, আব্দুল জব্বার খান, মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় অন্যতম। যাদের নিয়ে বাংলা সাহিত্যের লেখকরা কবিতা, গল্প লিখেছেন। বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, কাজী নজরুল ইসলাম, কবি সত্যেন্দ্রনাথ দত্ত কবিতা গল্প ও চিঠি লিখেছেন। কবি গুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের “গল্প গুচ্ছ” তার ছোট গল্পের বিখ্যাত সমাহার। গল্পগুচ্ছের ক্ষু-িধত পাষান গল্পের মূল চরিত্রই হলো মুন্সীগঞ্জের বিখ্যাত সন্তান ড. অঘোরনাথ চট্টোপাধ্যায়(১৮৫০-১৯১৫)অঘোরনাথ চট্টোপাধ্যায় লৌহজংয়ের ব্রাহ্মণগাঁও জন্ম গ্রহণ করেন। রবীন্দ্রনাথ তাকে কথক রূপে ক্ষুধিত পাষাণ ছোট গল্পে স্থান দিয়েছেন। অঘোরনাথ চট্টোপাধ্যায় হলেন রাজনীতিক নাট্যকার সরোজিনী নাইডুর বাবা। ছন্দের জাদুকর বলে খ্যাত কবি সত্যেন্দ্রনাথ দত্ত, তিনি মন্সীগঞ্জের বিখ্যাত ব্যক্তি বিশ্বজোড়া যার খ্যাতি সেই শ্রীজ্ঞান অতীশ দীপঙ্করকে নিয়ে কবিতা লিখলেন-“বাঙালি অতীশ/লঙ্ঘিল গিরী/তুষারে ভয়ঙ্কর/জ্বালিল জ্ঞানের দীপ/তিব্বতে বাঙালি দীপঙ্কর।” বাংলাদেশের বিখ্যাত পন্ডিত দার্শনিক শ্রীজ্ঞান অতীশ দীপঙ্কর ৯৮২ খ্রিস্টাব্দে মুন্সীগঞ্জের বজ্রযোগিনী গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। তিনি ৭৩ বছর বয়সে ১০৫৪ খ্রিস্টাব্দে তিব্বতের নাথাং বিহারে মৃত্যুবরণ করেন। কবিগুরু রবীন্দ্র নাথ ঠাকুর এ জেলার আরো অনেক বিখ্যাত ব্যক্তিকে নিয়ে কবিতা লিখেছেন। তিনি হলেন দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাশ। চিত্তরঞ্জন দাশ ১৮৭০ সালে জেলার টঙ্গীবাড়ী তেলিরবাগ গ্রামে জনামগ্রহণ করেন। তিনি ইংরেজদের বিরুদ্ধে অসহযোগ আন্দোলন করেন। তিনি ১৯২৫ সালের ১৬ জুন মারা যান। তার মৃত্যুর দিন রবীন্দ্র নাথ ঠাকুর লিখলেন, “ এনেছিলে সাথে করে মৃত্যুহীন প্রাণ, মরণে তাহাই তুমি করে গেলে দান/” আমাদের জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম তাঁর “চিত্তনামা” কবিতাটি দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাশকে উৎসর্গ করে লিখেছিলেন। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের খুব কাছের বন্ধু ছিলেন মুন্সীগঞ্জে শ্রীনগর উপজেলার স্যার জগদীশ চন্দ্র বসু। দুই বন্ধুর সখ্যতা ছিল গাঢ় ও সুদৃঢ়। তাদের মধ্যে হতো চিঠি দেয়া নেয়া। রবীন্দ্রনাথের আরেক বন্ধুু হলো সোনারংয়ের ক্ষীতিমোহন সেন। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের শান্তি নিকেতনের অধ্যাপক ছিলেন ক্ষীতিমোহন সেন। ১৮৬৫ সালে মুন্সীগঞ্জের সাবডিভিশনাল অফিসার ছিলেন মিস্টার ক্লে। এই ইউরোপিয়ান ছিলেন একজন সাহিত্যিকও বটে। তিনি মুন্সীগঞ্জকে নিয়ে একটি ইংরেজি কবিতা লেখেন। যা ড. মুন্তসীর মামুন অনুবাদ করেন। কবিতাটির নাম মুন্সীগঞ্জের উদ্দেশ্যে “ কি করেছি আমি নিঠুর ভাগ/যার জন্য আমাকে ছুড়ে ফেললে এখানে/ঘোড়া, কুকুর, মানুষ থেকে দূরে/যরা ছিলো আমার পরমপ্রিয়/ বারান্দায় আছি বসে/ চুরুট খেতে খেতে/ উপসংহার পৌঁছলাম এই যে/ সত্যিই আমি এক হতভাগা/ কোন ইউরোপিয়কে এখানে পাঠানো মানেই নিষ্ঠুরতা/ কারণ, এ হলো এক বন্দি জীবন।” ১৮৯৬ সালে অক্সফোর্ড ইউনিভার্সিটির ম্যাক মিলান প্রকাশনী মুন্সিগঞ্জ সাব ডিভিশনাল অফিসারের একটি কবিতা প্রকাশ করে। কবিতাটি কবের লেখা তা আমাদের জানা নেই। কবিতাটি এই রকম-“ ও মুন্সিগঞ্জ, তুমি খুব প্রিয় জায়গা। ধান- পাখি ও হাঁসদের বিচরণ ভূমি; যেখানে সব ভূমি পানিতে নিমজ্জিত, এবং সব কিছুই পানির শেওলা; যেখানে অতি দূর থেকে একজন সাহেব পৌঁছাতে পারে না।” অশোক মিত্র(১৯১৭-১৯৯৯) একজন গবেষক, সুসাহিত্যিক, ঐতিহাসিক ব্যক্তি। তার জন্মস্থান পশ্চিম বঙ্গের হুগলি জেলার পান্ডুয়া গ্রামে। তিনি ১৯৪২-১৯৪৪ সালে মুন্সীগঞ্জের মহকুমা প্রশাসক হিসেবে কর্মরত ছিলেন। তাঁর দুঃস্বপ্নের দু’টি বছর প্রবন্ধ থেকে এখানে কয়েকটি ছত্র তুলে ধরা হলো- “মুন্সীগঞ্জ ঘাট দেখে হতাশ হলুম। বিক্রমপুরের নামে যে মহিমাময় ঐতিহ্য মনশ্চক্ষে ভেসে উঠে তার উপযুক্ত তোরণ মোটেই নয়। লক্ষ্যা আর ধলেশ্বরীর পশ্চিম পাড়ে, বালির চরায় আমাদের ছোট স্টিমারটি একটি পুরনো মরচে পড়া গাধা বোটের গায়ে লাগলো...।” শরৎ চন্দ্র চট্টোপাধ্যায় ১৯২৫ সালে মুন্সীগঞ্জে এসেছিলেন। তখন মুন্সীগঞ্জের বিখ্যাত রাজনীতিক আব্দুল হাকিম বিক্রমপুরী তাকে একটি গল্প লেখার অনুরোধ করেন। সে অনুরোধ শরৎ চন্দ্র রক্ষা করেছিলেন। তার অনুরোধের গল্পটির নাম “মহেশ।” এ তথ্যটি প্রদান করেন সরকারি হরগঙ্গা কলেজের বাংলা বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক মাহ্ফুজা বেগম।
কীর্তিমানরা গেয়েছেন কীর্তিমানদের কথা। শত বছর পরও তাদের স্মরণ করি। তাদের কার্যকলাপ দেশ জাতির উন্নতির জন্য। তাই তো শত বছর নয় হাজার বছর পরও তাদের নিয়ে লেখা হবে, স্মরণ করা হবে।
সম্পাদক - আশরাফ ইকবাল, নির্বাহী সম্পাদক - বর্ষন মোহাম্মদ
© স্বত্ব সংরক্ষিত © ২০২৬ দৈনিক মুন্সিগঞ্জের বার্তা