
দেখা থেকে লেখা – ১
ক্ষণজন্মা জননন্দিত কিংবদন্তি রাজনীতিক আব্দুল হাইয়ের অপরিহার্যতা
সালেহীন তুহিন
বয়স অনধিক ৩৫। তারুণ্যোদীপ্ত ওই বয়সের ক্যারিশমাই তাকে অদ্যাবধি রাজনৈতিক অবিসংবাদিতের তকমা সেঁটে দিয়েছে। পরিপক্কতা ,অভিজ্ঞতা , দক্ষতা এবং দূরদর্শিতা সর্বোপরি রাজনীতিকে সেবার মহান ব্রতীতে রূপান্তর উল্লেখিত বয়স সীমাকে পশ্চাৎপদে বাধ্য করেছেন। বলছি ১৯৭৯ সালের কথা। নির্মহো সমাজনীতি এবং গণমানুষের প্রতি অকৃত্রিম ভালবাসা ছিল তার সোপান বা রাজনৈতিক মূলমন্ত্র। গণমানুষের দুঃখ দৈন্যতার আকুতি খুব সহসাই তাকে আলোড়িত করত। সুতরাং পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠীর প্রতি তার নিষ্কণ্টক নিবেদন হৃদয় নিংড়ানো আর্তি হিসেবে অসংখ্যবার প্রতিফলিত হয়েছে , যার ভুরি ভুরি দৃষ্টান্ত এখনো মানুষের
মুখে মুখে ফিরে। কে তিনি ? তিনি বাংলাদেশের জাতীয়তাবাদী দল তথা বিএনপির মুন্সীগঞ্জ জেলার একদা রাজনৈতিক অভিভাবক আলহাজ্ব আব্দুল হাই।
তিনি তদানীন্তন মুন্সিগঞ্জ ৪ আসনের ( বর্তমান ৩ আসন ) সর্বকালের জননন্দিত জননেতা হিসেবে গণমানুষের নিকট পরীক্ষিত। তৎকালীন সময়ে সৃজনশীলতায় ,মননশীলতায় , সৃষ্টিশীল মানসিকতার এক অভিনব রাজনীতিক হিসেবে খুব সহজেই গণমানুষের মাঝে নিজেকে মেলে ধরতে সক্ষম হয়েছিলেন। যার ফলে সাফল্যের পিছনে তাকে কখনো দৌড়ঝাঁপ করতে হয়নি বরং সাফল্যই বারংবার তার কাছে ধরা দিয়েছে। মাত্র ৩৫ বছর বয়সী একজন তরুণ জীবনের প্রথম পরীক্ষায় বিপুলভাবে উত্তীর্ণ। ১৯৭৯ সালের দ্বিতীয় জাতীয় সংসদ নির্বাচনে , তিনি বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল বিএনপির মনোনয়নে মুন্সিগঞ্জ ৪ আসনে ধানের শীষ প্রতীক নিয়ে প্রতিদ্বন্দ্বিতায় অবতীর্ণ হন। তার প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থী বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের মনোনয়নে নৌকা প্রতীক নিয়ে অংশগ্রহণ করেন মোহাম্মদ মহিউদ্দিন। তদানীন্তন সময়ে মোহাম্মদ মহিউদ্দিন সম্বন্ধে দু চারটি কথা উল্লেখ না করলে নির্বাচনী পরিবেশ প্রতিবেশ সুস্পষ্ট হবে না। তিনি তখন মুন্সিগঞ্জ মহকুমা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক। তদুপরী তিনি জীবদ্দশায় বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের অত্যন্ত আস্থাভাজন এবং একান্ত স্নেহধন্য ছিলেন। বঙ্গবন্ধুর মৃত্যু অব্দি তিনি তার প্রধান নিরাপত্তা কর্মকর্তার দায়িত্ব প্রতিপলন করেছেন। ফলে নবীন আব্দুল হাইয়ের তুলনায় এই আসনে মোহম্মদ মহিউদ্দিন সমধিক পরিচিত যা বলাই বাহুল্য। কিন্তু অধিক পরিচিতি কোন তারতম্য ঘটাতে পারে না তা আব্দুল হাই নির্বাচনী বৈতরনী অতিক্রান্তে প্রমাণ করেছেন। ১৯৭৯ সালের ১৮ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত হয় বাংলাদেশের ইতিহাসের দ্বিতীয় জাতীয় সংসদ নির্বাচন। এই নির্বাচনে আব্দুল হাই বিপুল ভোটের ব্যবধানে বিজয়ী হন। এই নির্বাচনী বিজয়ের ধারাবাহিকতায় আব্দুল হাইকে জাতীয় সংসদ নির্বাচনের প্রেক্ষাপটে আর কখনো পিছনে ফিরে তাকাতে হয়নি। পরবর্তীকালে ১৯৯১ , ৯৬ সালে দুই দফা এবং ২০০১ সাল সহ আরো ৪ বার এই আসন থেকে জাতীয় সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। তন্মাধ্যে ১৯৯১ সালে নির্বাচনে বিজয়ী হওয়ার পর তাকে স্থানীয় সরকার পল্লী উন্নয়ন এবং সমবায় মন্ত্রণালয়ের উপমন্ত্রীর দায়িত্ব অর্পণ করা হয়। উপমন্ত্রীর দায়িত্ব গ্রহণ করার পর তিনি পশ্চাৎপদ মুন্সীগঞ্জ ৪ আসনে উন্নয়নের মহাসড়কে উন্নীত করেন। তিনি বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল বিএনপির কেন্দ্রীয় কার্য নির্বাহী কমিটির অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ কোষাধ্যক্ষের দায়িত্ব পালন করেন। ২০০১ সালে পুনরায় বিএনপি ক্ষমতায় আসলে তিনি প্যানেল স্পিকারের দায়িত্বও পালন করেন। আপাদমস্তক একজন জনবান্ধব রাজনীতিকের জ্বলজ্যন্ত দৃষ্টান্ত আব্দুল হাই। মুন্সিগঞ্জের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে তার কিছু মোজেজা উল্লেখ না করলে তার দূরদৃষ্টি সম্পন্ন রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড প্রতিীয়মান সম্ভব নয়। তাকে যতদূর মুন্সিগঞ্জের মানুষ জন চিনে বা জানে তিনি কখনোই প্রতিপক্ষ রাজনৈতিক দলের জন্য প্রতিহিংসা পরায়ণ ছিলেন না। প্রতিশোদে বিশ্বাস করতেন না। ব্যাপক জননন্দিত এবং জনপ্রিয়তার কারণে হিংসা-বিদ্বেষ , ক্ষোভ – ক্রোধের পথে কখনোই তাকে হাটতে হয়নি। তিনি দল মত ধর্ম বর্ণ নির্বিশেষে সকলের জন্য ছিলেন ন্যায়পরায়ন এবং মহানুভব। যেকোনো ব্যক্তি মজলুম হিসেবে তার দ্বারস্থ হলে সঠিক এবং উপযুক্ত বিচার করতে আব্দুল হাই কখনো পিছপা হননি। অনেক সময়ই দেখা গেছে এ সকল ক্ষেত্রে তার নিজ দলের নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে তাকে যেতে হয়েছে । কিন্তু তিনি ইস্পাত কঠিন দৃঢ়তায় অবিচল থেকেছেন। এক কথায় তিনি ন্যায় এবং সত্যের অভিযাত্রী ছিলেন। এতে করে কোন কোন ক্ষেত্রে দলীয় নেতাকর্মীরা তার উপর বিক্ষুব্ধ হতেন , পক্ষান্তরে সাধারণ মানুষের ভালোবাসায় তিনি সিক্ত হতেন।
তার সুদীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনের মাত্র ১টি ঘটনা উল্লেখ করলেই তিনি যে কতটা অন্যায়ের বিরুদ্ধে সোচ্চার ছিলেন তা সহসাই প্রতিপন্ন হবে। ২০০১ সালে বিএনপির পুনরায় ক্ষমতায় আসলে সংশ্লিষ্ট আসনের বিভিন্ন স্থানে বিক্ষিপ্তভাবে সন্ত্রাসের বিস্তার লাভ করে। যারপরনাই আব্দুল হাই এ সকল সন্ত্রাস কঠোর হস্তে দমন করেন। তন্মধ্যে উল্লেখযোগ্য তার আপন চাচাতো ভাই গোলাম হোসেন পঞ্চসার থেকে দুর্গাবাড়ি রাস্তায় মাঝামাঝি স্থানে একটি ইট ভাটা গড়ে তোলেন। এমপির আপন চাচাতো ভাই বলে কথা। ইট ভাটার আশপাশে বিভিন্ন মানুষজনের জায়গা জমি কেটে মাটি সংগ্রহ করে ইটভাটায় কাজে লাগান। এছাড়াও বিভিন্ন মানুষের জায়গা জমি দখল করেন। বিষয়টি আবদুল ভাইয়ের কান পর্যন্ত পৌঁছালে তিনি ব্যাপকভাবে ক্ষিপ্ত হয়ে উঠেন। তিনি এতটাই ক্ষিপ্ত হন যে নিজের আপন চাচাতো ভাইয়ের সম্পর্কের বিষয়টিও ভুলে যান। আকস্মিক তিনি কিছু নেতাকর্মী সমেত মুন্সিগঞ্জ সদর থানায় হাজির হন। থানা কম্পাউন্ডে পুলিশকে উদ্দেশ্য করে তিনি গোলাম হোসেনকে অপরাধী হিসেবে চিহ্নিত করে দ্রুত গ্রেফতারের দাবী জানান। এক পর্যায়ে তিনি থানা কম্পাউন্ডের রাস্তার মাটিতে বসে পড়েন। যতক্ষণ পর্যন্ত তাকে গ্রেফতার করা না হবে ততক্ষণ তিনি এখানেই বসে থাকবেন বলে আল্টিমেটাম দেন। থানার সর্বস্তরের কর্মকর্তারা তাকে বুঝানোর চেষ্টা করেন কিন্তু তাতে তিনি সন্তুষ্ট হতে পারেননি। এক পর্যায়ে তদানীন্তন পুলিশ সুপার তাকে কার্যকরী আশ্বাস প্রদান করলে তিনি স্থান ত্যাগ করেন। অবশেষে মাত্র ৪৮ ঘণ্টার মধ্যেই গোলাম হোসেনকে গ্রেফতার করতে সক্ষম হয় পুলিশ। পরবর্তীকালে সংসদ সদস্য আব্দুল হাইয়ের ব্যক্তিগত উদ্যোগে সমূলে উৎপাটিত হয় উক্ত ইটভাটা। খুব স্বাভাবিকভাবেই ভুক্তভোগী মানুষজনের মাঝে স্বস্তি ফিরে আসে। আজ থেকে প্রায় ২ যুগ পূর্বে নিজের পরিবারের বিরুদ্ধে এমন এ্যাকশন ব্যতিক্রমী দৃষ্টান্ত হিসেবে উপস্থাপিত যা তৎকালীন সর্ব মহলে ব্যাপক প্রশংসিত হয়। অত্যন্ত পরিতাপের বিষয় হচ্ছে সেই জননন্দিত নেতা আজ চরমভাবে অসুস্থ। জাতির এই ক্রান্তিকালে মাঠের রাজনীতিতে তার মত একজন ক্ষনজন্মা নেতার খুব প্রয়োজন। তার অসুস্থতায় তিনি এবং তার পরিবার অত্যন্ত দুর্ভাগ্যজনক সময় অতিক্রান্ত করছেন যা বলার অবকাশ রাখেনা। কিন্তু আব্দুল হায়ের মত একজন জন এবং সমাজহিতৈষী নেতার অভাব আজ সমাজের প্রতিটি রন্ধ্রে রন্ধ্রে পরিলক্ষিত হচ্ছে। মুন্সীগঞ্জের হাজার হাজার মানুষ অন্তরের অন্তস্থল থেকে দুহাত তুলে মহান সৃষ্টিকর্তার দরবারে প্রার্থনা করছেন তার দ্রুত আরোগ্যের জন্য। তিনি যেন দ্রুত সুস্থ হয়ে পুনরায় গণমানুষের সেবায় নিজেকে নিয়োজিত করতে পারেন সেই প্রার্থনা ও চলছে অবিরত। রাজনীতির মাঠের এবং অতীব সাধারণ মানুষের নেতা পুনরায় ময়দানে ফিরে আসুক এই প্রত্যাশাই করছেন সকলে। এদিকে অতি সম্প্রতি মুন্সীগঞ্জ জেলা বিএনপির রাজনীতিতে নেতৃত্ব বলয় কে কেন্দ্র করে স্বল্প পরিসরে হলেও দ্বিধা বিভক্তি দেখা যাচ্ছে। ক্রমবর্ধিষ্ণু ধারাবাহিকতায় এই বিভাজন সংকট আকারে প্রতিফলিত হচ্ছে।যদি আব্দুল হাই আজ রাজনীতির ময়দানের সরবতায় উপস্থিত থাকতেন তাহলে অনেক কিছুরই সরল সমীকরণে সমাধান সম্ভব ছিল। (চলবে)