সাইদ হাসান আফরান
সর্ষের ভেতরেই ভূত। সাধারণ মানুষের ব্যক্তিগত তথ্যের সবচেয়ে সংবেদনশীল ভাণ্ডার নির্বাচন কমিশনের (ইসি) সুরক্ষিত সার্ভারই হয়ে উঠেছিল অসাধু চক্রের অবৈধ আয়ের উৎস। জাতীয় পরিচয়পত্রের (এনআইডি) তথ্য জালিয়াতির মাধ্যমে নাগরিকদের গোপন তথ্য অবৈধভাবে বিক্রির অভিযোগে গজারিয়া উপজেলা নির্বাচন অফিসের দুই কর্মচারীকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি)।
গ্রেপ্তাররা হলেন গজারিয়া উপজেলা নির্বাচন অফিসের সহকারী কাম কম্পিউটার অপারেটর মো. হাবীবুল্লাহ (৪১) এবং আউটসোর্সিংয়ের মাধ্যমে নিয়োজিত ডাটা এন্ট্রি অপারেটর মো. আলামিন (৩৯)।
বৃহস্পতিবার (১৫ জানুয়ারি) দুপুরে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে সিআইডির সাইবার পুলিশ সেন্টারের (সিপিসি) ডিআইজি মো. আবুল বাশার তালুকদার এসব তথ্য জানান।
সিআইডি জানায়, মাত্র ৩০ দিনে চক্রটি ৩ লাখ ৬৫ হাজার ৬০৮টি এনআইডি তথ্য অবৈধভাবে সরবরাহ করেছে। প্রতিটি তথ্য ২০০ থেকে ৩০০ টাকা দরে বিক্রি করে তারা প্রায় ১১ কোটি টাকা হাতিয়ে নেয়।
ডিআইজি আবুল বাশার তালুকদার বলেন, গোপন তথ্যের ভিত্তিতে বুধবার (১৪ জানুয়ারি) রাত সাড়ে ১০টার দিকে রাজধানীর আগারগাঁও নির্বাচন অফিস এলাকা থেকে মো. আলামিনকে গ্রেপ্তার করা হয়। তার দেওয়া তথ্য অনুযায়ী একইদিন দিবাগত রাত ১২টা ১০ মিনিটে মোহাম্মদপুরের চন্দ্রিমা হাউজিং এলাকা থেকে মো. হাবীবুল্লাহকে গ্রেপ্তার করা হয়। এ সময় তাদের কাছ থেকে দুটি মোবাইল ফোন জব্দ করা হয়।
প্রাথমিক তদন্তে জানা গেছে, মো. আলামিনের কাছে নির্বাচন কমিশনের একটি গোপন আইডি ও পাসওয়ার্ড ছিল, যার মাধ্যমে সারা দেশের নাগরিকদের এনআইডি তথ্য যাচাই করা সম্ভব। পূর্বপরিচয় ও ঘনিষ্ঠতার সূত্রে তিনি সেই আইডি ও পাসওয়ার্ড হাবীবুল্লাহকে সরবরাহ করেন। এর বিনিময়ে প্রতি সপ্তাহে চার থেকে পাঁচ হাজার টাকা উৎকোচ নিতেন।
অন্যদিকে, হাবীবুল্লাহ ওই গোপন আইডি ব্যবহার করে দেশের বিভিন্ন নাগরিকের সংবেদনশীল এনআইডি তথ্য জনপ্রতি ২০০ থেকে ৩০০ টাকার বিনিময়ে বিক্রি করতেন। তারা ওটিপি ট্রান্সফার পদ্ধতিতে নির্বাচন কমিশনের সার্ভারে প্রবেশ করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমকে প্ল্যাটফর্ম হিসেবে ব্যবহার করতেন।
জাতীয় নির্বাচন কমিশনের অনুসন্ধানে দেখা গেছে, মাত্র এক সপ্তাহে এক লাখ ১২ হাজার ১৫০টি এবং ৩০ দিনে ৩ লাখ ৬৫ হাজার ৬০৮টি এনআইডি তথ্য সরবরাহ করেছে চক্রটি। প্রতিটি তথ্য ৩০০ টাকা হিসেবে হিসাব করলে অবৈধ আয়ের পরিমাণ দাঁড়ায় প্রায় ১১ কোটি টাকা।
ডিআইজি আবুল বাশার তালুকদার জানান, এই অর্থ দিয়ে হাবীবুল্লাহ ঢাকায় নিজস্ব ফ্ল্যাটসহ স্থাবর ও অস্থাবর সম্পত্তি গড়ে তুলেছেন এবং বিলাসবহুল জীবনযাপন করতেন।
গ্রেপ্তার ব্যক্তিরা প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে অপরাধের বিষয়টি স্বীকার করেছেন। এ ঘটনায় পল্টন মডেল থানায় দায়ের করা মামলার তদন্তে তাদের গ্রেপ্তার দেখানো হয়েছে।
এ দিকে সাংবাদিকদের অভিহিত করার জন্য উপজেলা নির্বাচন অফিসার মোছা. মোমিনুর জাহান তার স্বাক্ষরিত একটি নথিতে জানান ,গজারিয়া উপজেলা নির্বাচন কর্মকর্তা মোছা. মোমিনুর জাহান জানান, অফিস সহকারী কাম কম্পিউটার মুদ্রাক্ষরিক মো. হাবীবুল্লাহ ২০২৫ সালের ২৮ এপ্রিল অত্র কার্যালয়ে যোগদান করেন। গত ১৪ জানুয়ারি ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের মালামাল জেলা নির্বাচন অফিস থেকে উপজেলা পর্যায়ে পৌঁছে দিয়ে অফিস সময় শেষে তিনি কর্মস্থল ত্যাগ করেন।
সিআইডি জানিয়েছে, এই চক্রে আরও কেউ জড়িত থাকলে তদন্তের মাধ্যমে তাদেরও আইনের আওতায় আনা হবে।