
বর্ষন মোহাম্মদ:
‘তামা, কাঁসা, পিতল, সোনা চিনলি না রে, চিনলি না। চিনবি সেদিন, চোখে যেদিন তুই কিছুই দেখবি না।’ পথিক নবীর এই গানের মতই আমরা তামা, কাঁসা ও পিতলের শিল্পকে চিনি নাই, মূল্যায়ন করি নাই। যার কারণে এই শিল্পের বর্তমান অবস্থা করুন।বাঙালি জাতির ঐতিহ্যের সঙ্গে মিশে আছে কাঁসা-পিতলের ব্যাবহার। একসময় কাঁসা ও পিতলের জিনিসপত্র ব্যবহারের অনেক জনপ্রিয় ছিল। রান্নাঘরের তৈজসপত্র যেমন: কাঁসার থালা, বাটি, গ্লাস, ইত্যাদি ব্যবহার ছিল অনেক জনপ্রিয়। তামা কাঁসার জিনিসপত্র ব্যাবহারকে অভিজাতের প্রতিক হিসাবে দেখা হত। বর্তমানে এ্যাল্যুমিনিয়াম ও মেলামাইনের সস্তা পণ্যের যুগে কাঁসার তৈরি পণ্য হারিয়েছে তার সোনালি দিন। অবিভক্ত বাংলায় কাঁসা-পিতলের প্রচলন কখন, কিভাবে শুরু হয়েছিল তা নির্দিষ্ট করে জানা যায়নি। প্রত্নতাত্ত্বিকদের মতে, এটি প্রাচীন সভ্যতার আমলে শুরু, যখন ব্রোঞ্জশিল্প ছিল। আবার অনেকেই এই শিল্পকে মহাস্থানগড়কেন্দ্রিক সভ্যতার সঙ্গে সম্পৃক্ত বলে মনে করেন। আনুমানিক ১৫৭৬-১৭৫৭ খ্রিস্টাব্দে মোঘল আমলে উপমহাদেশে ব্যাপকভাবে কাঁসা-পিতলের ব্যবহার শুরু হয়। তখন এসব ধাতু দিয়ে ঢাল, তলোয়ার, তীর-ধনুক ইত্যাদি যুদ্ধ সরঞ্জাম তৈরি করা হতো। ব্রিটিশ শাসন আমলেও এ শিল্পের প্রসার ঘটে এবং বাংলার ঘরে ঘরে এর ব্যবহার জনপ্রিয় হয়ে ওঠে। সে সময় ঢাকার ধামরাই, শিমুলিয়া ছাড়াও টাঙ্গাইলের কাগমারী, জামালপুরের ইসলামপুর, বগুড়ার শিববাড়ী, চাঁপাইনবাবগঞ্জ, মুন্সীগঞ্জের লৌহজংয়ে কারখানা গড়ে উঠতে শুরু করে। অন্যদিকে, হাতুরির শব্দ আর ঝনঝনানি আওয়াজে আজ আর কারোও ঘুম ভাঙ্গে না। অথবা সময় হয়েছে কাজে যেতে হবে এমনটি ও মনে হয়না কারো। আজ আর পালের বাজার নেই, নাগের হাটের নাগ পরিরাও যেন ঘুমিয়ে পরেছে অনেক আগেই।স্বর্ণ নয়, কিন্তু তার মতই চকচকে। একসময় স্বর্ণের পরেই ছিলো অবস্থান । ছিলো আভিজাত্যের মর্যাদা। কিন্তু কালের পরিক্রমায় সেই কাঁসা-পিতলের ঐতিহ্যবাহী সামগ্রীর দৃশ্যের আড়াল হয়ে গেছে। মাত্র দু-তিন দশক আগেও এসব প্রাচীন ধাতব পণ্যের যে সমাদর ছিলো, তা যেন কালের অতলে হারিয়ে গেছে। খুঁজে পেতে রীতিমতো অনুসন্ধান করতে হয়।
কনকসার বাজারের কাসারু পট্টির মো. রিয়াজ মাল ৩০ বছর ধরে কারীকর হিসেবে এ পেশায় নিয়োজিত আছেন। মালিকরা অনেকেই এই ব্যবসা ছেরে দেয়ায় তিনি নিজেই মালিক হিসেবে এই ব্যবসার হাল ধরেছেন তাতেও যেন শেষ রক্ষা হচ্ছে না। কারন অর্থের অভাবে এই শিল্প এখন অনেকটাই মুখ থুবরে পড়েছে। তাছারা পদ্মার ভাঙ্গনে পালের বাজার বিলীন হওয়ার পর থেকেই এ ব্যাবসার অনেকটা ধস নেমেছে। মেলামাইন আর ঝকঝকে স্টিলের ব্যবহারে, তামা কাসা আর পিতলের ব্যাবহার এখন অনেকটাই হ্রাস পেয়েছে।পিতলসামগ্রী শিল্পের সঙ্গে যুক্ত সংশ্লিষ্টরা জানান, ব্যক্তিগত উদ্যোগে অভিবাসীরা তামা-কাঁসায় গড়া শিল্প পণ্য বিদেশে নিতে সাহস দেখান না, পাছে আবার পুরাকীর্তি পাচারের অভিযোগে আটক হন। আবার প্রয়োজনীয় ছাড়পত্র পেতে কখনো কখনো সময় লাগে এক থেকে দেড় বছর। ফলে বিদেশের বাজারে চাহিদা থাকা সত্ত্বেও এ পথে পা মাড়ান না অনেক আগ্রহী উদ্যোক্তা। এ ছাড়া চাহিদামতো কাঁচামাল না পাওয়ার পাশাপাশি নেই সরকারের কোনো সহযোগিতাও। সরকার সহযোগিতা করলে এ শিল্পপণ্য রপ্তানি করে দেশে প্রচুর বিদেশি মুদ্রা আয় করা সম্ভব।
এ ব্যাপারে সরেজমিনে কথা হয় লৌহজং নাগের হাটের গো সুরুজ বনিক বলেন সঙ্গে। প্রায় শত বছর ধরে তার পূর্বপুরুষরা এ পেশার সঙ্গে জড়িত। তিনি বলেন, ‘লৌহজংয়ে নোটা, ঘটি, হাড়ি-পাতিল, থালা, গ্লাস, বদনি ও বিভিন্ন শো-পিচ, দেবদেবী ও জীবজন্তুর প্রতিকৃতি জিনিসপত্র তৈরির জন্য স্বাধীনতার পূর্বেও প্রায় ৩০/৪০টি কারখানা ছিল। বর্তমানে এ কারখানা সংখ্যা ৪/৫টি মতো। সময়ের সাথে পাপ্লা দিয়ে প্লাস্টিক, লোহা ও স্টিলের তৈরি এসব জিনিসপত্র তৈরি হওয়ায় কাঁসা-পিতল কেনায় বেশ ভাটা পড়েছে।’ তিনি আরও বলেন, ‘কাঁসা-পিতলের তৈরি জিনিসপত্র একবার কিনলে তা ২০/৩০ বছরের বেশি সময় ব্যবহার করা যায়। শুধু তাই নয়, যে দামে কেনা হতো ব্যবহারের পর তার চেয়েও বেশি দামে বিক্রি করা যেত।‘এ প্রসঙ্গে তিনি আরো বলেন, ‘আগে এসব জিনিসপত্র রপ্তানির ক্ষেত্রে তেমন একটা বেগ পেতে হতো না। বর্তমানে রপ্তানি করতে গেলে নানা সমস্যার মুখোমুখি হতে হয়।’ জানা গেছে, কালের বিবর্তনে পিতলসামগ্রীর ব্যবহারের মাত্রা দিন দিন কমে গেলেও সৌখিন মানুষের কাছে এর চাহিদা রয়ে গেছে বৈকি! অন্দরসজ্জার উপকরণ হিসেবেও ইদানীং ঘরে শোভা পাচ্ছে পিতলের সামগ্রী। এসবের মধ্যে রয়েছে নানা রকম শো-পিস, ওয়াল ম্যাট, ফুলের টব, বিভিন্ন ধরনের গ্লাস, থালা, বাটি, কাজলদানি, চামচ, হুক্কা, কলস, পূজার ঘন্টা, গামলা, চামচ, বালতি, ডেগ, কড়াই প্রদীপ, বিভিন্ন দেবদেবীর মূর্তি, সঙ্গীত সাধনার যন্ত্র, খেলনা, আয়নার ফ্রেম ইত্যাদি তৈরি করতেন। তখনকার দিনে এসব জিনিসের সুনাম ছড়িয়ে পড়ে দেশের গণ্ডি পেরিয়ে বিদেশেও। ইতিহাস ঘেঁটে জানা যায়, কাঁসা ও পিতলের ব্যবহার জনপ্রিয়তা অর্জন করে মোঘল আমলে। এসব ধাতু দিয়ে ঢাল, তলোয়ার, তির-ধনুক, বন্দুক, কামান পর্যন্ত তৈরি করা হতো তখন। এরপর ধীরে ধীরে কাঁসা দিয়ে দৈনন্দিন নিত্যব্যবহার্য জিনিসপত্র তৈরি করা শুরু হয়। একসময় এ শিল্প থেকেই এসব এলাকার বহু বাসিন্দা তাদের সংসার চালাতেন। তবে বর্তমানে কাঁসার চাহিদা ক্রমাগত হ্রাস পাওয়ায় কারিগর ও ব্যবসায়ীরা সংসার চালাতে হিমশিম খাচ্ছেন।
কারখানার মালিকরা জানান, অর্থের অভাবে এই ঐতিহ্যবাহী শিল্পটি একসময় কালের গর্বে হারিয়ে যাবে। ব্যাবসায়ীদের দাবি তাদের আর্থিক সহযোগিতা দিতে সরকারী ব্যাংকগুলো এগিয়ে এলে এবং সহজ উপায়ে তাদের ব্যাংক লোনের ব্যাবস্থা করে দিলে এই শিল্পটি বাচিঁয়ে রাখা সম্ভব।
৩৫ বছর ধরে কাঁসা-পিতলের সঙ্গে জড়িয়ে আছেন রামকৃষ্টপুর এলাকার মেহের আলী (৫৫)। তিনি বলেন, আগে কাজ করে ভালো টাকাপয়সা পেতাম। দিন দিন তা কমছে। তবে করোনা এসে একেবারেই ধ্বংস হওয়ার মতো অবস্থা। কাজ না থাকায় সংসার চালার তাগিদে অনেকেই এই কাজ ছেড়ে দিয়েছে। এখন তারা কাজ ছেড়ে কেউ রিকশা-ভ্যান চালায়, কেউ যোগ দিয়েছে রাজমিস্ত্রির কাজে, কেউ আবার পাড়ি দিয়েছে প্রবাসে। সংসারের অন্যসব কাজ সেরে অবসর সময়ে এ কাজ করে ভাল আয়ও করছেন তারা। চাহিদা অনুযায়ী প্রতি সপ্তাহে ৮/১০ মন মাল তৈরি করতে পারে একজন ব্যাবসায়ী। বর্তমানে বাজারে তামার দর রয়েছে ৬৫০ টাকা, কাসা ১,৬৫০ টাকা, পিতল ৪৯০ টাকা। এসব জিনিসের চাহিদা বাজারে খুব একটা না থাকায় আগ্রহ হারাচ্ছেন অনেকেই। আবার অনেকেই অন্য পেশায় চলে যাচ্ছেন সব কিছু গুটিয়ে।
চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির সাবেক সভাপতি আব্দুল ওয়াহেদ বলেন, এ শিল্প থেকেই এসব এলাকার বহু বাসিন্দা তাদের সংসার চালাতেন। তবে বর্তমানে কাঁসার চাহিদা ক্রমাগত হ্রাস পাওয়ায় কারিগর ও ব্যবসায়ীরা সংসার চালাতে হিমশিম খাচ্ছেন। কাঁচামালের দাম হঠাৎ করে বেড়ে যাওয়ায় খুব বিপদে আছি। সরকার বিদেশ থেকে এসব আমদানি করতে উদ্যোগ নিলে দুবেলা দুমুঠো ডাল-ভাত খেয়ে বেঁচে থাকতে পারব। তা না হলে অন্যদের মতো আমাদেরও এই ব্যবসা ছেড়ে দিতে হবে। এতে চাহিদা কমে যাওয়ায় কারিগররা পথে বসেছেন। কাঁসাশিল্প বাঁচিয়ে রাখতে বিশেষ প্রণোদনা অথবা কাঁচামাল আমদানিতে বিভিন্ন সহযোগিতা দিয়ে সংশ্লিষ্টদের প্রতি সরকারকে পাশে দাঁড়ানোর আহ্বান জানান তিনি।