
পদ্মহেম ধাম:
কবির হোসেন (কবির একতারা শাহ্):
২০০৩ সালে পাঠশালায় ফটোসাংবাদিকতায় অনার্সে প্রথম বর্ষে পড়া অবস্থায় ক্লাসের বন্ধুদের সাথে কবির হোসেন শাহ্ সুফি দরবেশ লালন সাঁইজির মাজারে ছেউড়িয়ায় কুষ্টিয়ায় যায় পহেলা কার্তিকে সাঁইজির তিরোধান দিবসে। লালন ফকিরের মাজারের এককোনায় একজন প্রবীণ লালন সাঁইজির-
“ও যার আপন খবর আপনার হয় না,
একবার আপনারে চিনতে পারলে রে যাবে অজানারে জানা”,
এই বাণী পরিবেশন করছেন ভক্তদের মাঝে। সাধকের কণ্ঠে লালন সাঁইজির নিজেকে চিনার এই গান শোনে আমি লালন প্রেমে পড়ে যাই। পরে ওই সাধককে আমি গুরু হিসেবে গ্রহণ করি। গুরু পথ ধরেই লালন সাঁইজির সন্ধান করি।
ফকির লালন সাঁইজির আবির্ভাব হয় কুষ্টিয়ায় নদীয়া অঞ্চলে ১৭৭৪ সালে। সাঁইজি তিরোধান হয় ১৮৯০ সালে পহেলা কার্তিক। ১১৬ বছর লালন সাঁই দেহজীবন যাপন করেন। শহর নগর গ্রাম বন্দরে একতারা ও কোমর ডুগি দিয়ে গান গেয়ে মানুষের মনকে সংস্কার করেছেন।
আমার গুরুর নাম বীরমুক্তিযোদ্ধা শাহ্ সুফি দরবেশ নহির ফকির। আমি ও আমার সঙ্গিনী রুবি কবির লালন পথে নহির ফকিরের কাছে একই দিনে বায়াত গ্রহণ করি। ২০০৩ সালে স্বপ্ন বুনতে থাকি সাঁইজির বিনয়ী অমিয় মানবতা সঙ্গীতের বার্তা মানুষে মানুষে পৌঁছে দেয়ার। লালন বার্তা বাহক গুরু নহির ফকিরের সান্নিধ্যে আমি কবির একতারা শাহ্ নিজের সন্ধান করতে থাকি। পরিকল্পনা করি মুন্সিগঞ্জ তার নিজ গ্রাম দোসরপাড়ায় লালন সাঁইজির মানবতা সঙ্গীতের স্টেশন করার। ২০০৫ সালে আমার নিজ বাড়ি মাদবর বাড়িতে প্রথম লালন সঙ্গীতের আসর করি।
২০০৬ সালে আমার গুরু নহির ফকিরের সভাপতিত্বে পদ্মহেম ধাম লালন সাঁই বটতলায় লালন ফকিরের আদি ঘরের খেলাফতধারি সাধুগুরুদের নিয়ে প্রথম সাধুসঙ্গ শুরু করি। কবির একতারা শাহ্ লালন সাঁইজির একটি গান থেকে “পদ্মহেম” শব্দ নিয়ে এই ধামের নাম রাখি “পদ্মহেম ধাম”। পদ্মহেম ধাম দোসরপাড়ার দক্ষিণ পশ্চিমে ইছামতী নদীর ত্রিবেণীতে প্রতিষ্ঠা করি। ২০০৫ সালে প্রথম আলো ফটোসাংবাদিকতার চাকরি শুরু করি। প্রথম আলোর তিন মাসের বেতনের টাকা দিয়ে লালন সাঁই বটতলা পাকা করি। পুণ্যদমে প্রচার শুরু লালন ফকিরের মানবতার বার্তা। দোসরপাড়া গ্রামের আত্মীয়-স্বজন, পাড়া-পড়শি, ভাই, ভাতিজা বোন, চাচা, চাচি, মামা, মামি ও দেশের অসংখ্য মনের মানুষ আমার লালনকে স্বাদরে গ্রহণ করেন। ”পদ্মহেম ধাম” লালন ফকিরের পৃথিবীর দ্বিতীয় বৃহত্তম লালন সঙ্গীতের আশ্রম।
আমার দাদা গুরু দরবেশ লবান ফকির আসেন ২০০৮ পদ্মহেম ধামের সাধুসঙ্গে। আমার হাত ধরে পদ্মহেম ধামের চারদিকে ঘুরে আর সে বছর আমাকে অনেক আদেশ দিয়ে যান। আমাকে তিনি বলেন, এইটা সেই জায়গা যেখানে সাঁইজির আইন প্রতিষ্ঠা হবে। অনেক ঝড় -তুফান আসবে তোঁর উপর। তোঁকে শক্ত হয়ে দাঁড়িয়ে থাকতে হবে। এখন বুঝি দাদা গুরু যা বলে গেছেন তা এখন সময় সময় সত্যি হচ্ছে। কত ঝড়-তুফান আমার জীবনের উপর দিয়ে গেছে, তা বলা বাহুল্য। আপন পর অনেকেই হুমকি দিয়েছে। আমি আমার দাদা গুরু ও আমার সাঁইজি কথা গুলো ধরে সামনের দিকে এগুচ্ছি। ঝড় -তুফান আসে আবার চলে যায়। তাই সাঁইজির মত নিজেকে খুঁজে বেড়াই। সাঁইজি বলেন,
ক্ষ্যাপা না জেনে তোঁর আপন খবর যাবি কোথায়, আপন ঘরে না খুঁজিয়ে বাইরে খুঁজলে পড়বি ধাঁধায়।।
সাঁইজির আরো বলেন,
“মানুষ ভজলে সোনার মানুষ হবি,
মানুষ ছাড়া ক্ষ্যাপা রে তুই মূল হারাবি”। তাই মানুষের মধ্যেই আমি সর্বপ্রাণকে সন্ধান করি ।
জয় হোক মানবতার।
জয় হোক সর্বপ্রাণের। জয় গুরু।
লেখক : প্রতিষ্ঠাতা, পদ্মহেম ধাম ও প্রধান ফটোসাংবাদিক-ফিচার, প্রথম আলো।