
ইঞ্জি. শাহিদ শাওন
মুন্সিগঞ্জ জেলার সিরাজদিখান উপজেলার খাসমহল বালুচর—এক সময়ের নিভৃত, নিরিবিলি এক গ্রাম। এখানেই জন্ম নজরুল ইসলামের; এক সাধারণ কৃষক পরিবারের সন্তান, যিনি নিজের মেধা, সততা আর অদম্য পরিশ্রমে পৌঁছে গেছেন জাতিসংঘ সদর দপ্তরের মতো মর্যাদাপূর্ণ জায়গায়। তাঁর জীবন যেন এক জীবন্ত গল্প—যা প্রমাণ করে, স্বপ্ন থাকলে গ্রামের ছেলেও জয় করতে পারে বিশ্ব।
শিকড়ের মাটি থেকে যাত্রা
১৯৫৮ সালের ২ মে জন্ম নজরুল ইসলামের। পরিবারের আর্থিক অবস্থা খুব একটা স্বচ্ছল ছিল না, কিন্তু বাবা-মায়ের একটাই স্বপ্ন—ছেলেকে মানুষ করা। গ্রামের স্কুল থেকেই শুরু তাঁর শিক্ষাযাত্রা। অদম্য পরিশ্রম ও মেধার জোরে ১৯৭৩ সালে এসএসসি, ১৯৭৫ সালে এইচএসসি, ১৯৭৭ সালে বিএসসি এবং ১৯৮১ সালে ফলিত গণিত ও কম্পিউটার সায়েন্সে এমএসসি ডিগ্রি অর্জন করেন তিনি। তখনকার সময়ে এমন উচ্চশিক্ষা ছিল গ্রামের এক ছেলের জন্য বিস্ময়কর সাফল্য।
শিক্ষক থেকে প্রযুক্তিবিদ
শিক্ষাজীবন শেষে ১৯৭৮ সালে তিনি নিজের প্রিয় বিদ্যালয়—খাসমহল বালুচর উচ্চ বিদ্যালয়ে শিক্ষকতা শুরু করেন। ছাত্রদের মাঝে ছড়িয়ে দেন জ্ঞানের আলো, শিখিয়ে দেন শৃঙ্খলা ও আত্মবিশ্বাস। এক বছর পর তিনি যোগ দেন বাংলাদেশ মিলিটারি একাডেমিতে শিক্ষক হিসেবে, যেখানে চার বছর ধরে ভবিষ্যৎ সেনা কর্মকর্তাদের তিনি শিক্ষা দিয়েছেন নিষ্ঠা ও আন্তরিকতার সঙ্গে।
সীমা পেরোনোর সাহস
নজরুল ইসলামের তৃষ্ণা ছিল আরও শেখার, আরও এগিয়ে যাওয়ার। ব্যাংককের এশিয়ান ইনস্টিটিউট অব টেকনোলজি (AIT) থেকে তিনি উচ্চতর ডিগ্রি অর্জন করেন। সেই ডিগ্রি তাঁর সামনে খুলে দেয় আন্তর্জাতিক দরজা। কৃষি ব্যাংক, প্রশিকা, এলজিইডি ও কানাডিয়ান হাইকমিশনের মতো প্রতিষ্ঠানে কম্পিউটার বিশেষজ্ঞ হিসেবে কাজ করে তিনি প্রমাণ করেন নিজের দক্ষতা, সততা ও পেশাদারিত্ব।
জাতিসংঘে বাংলাদেশের প্রতিনিধি
১৯৯৮ সালে আন্তর্জাতিক সিভিল সার্ভিস কমিশনে উত্তীর্ণ হয়ে নজরুল ইসলাম যোগ দেন জাতিসংঘে। সেখান থেকেই শুরু হয় তাঁর বৈশ্বিক যাত্রা—জাতিসংঘ সদর দপ্তরসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে তিনি আইসিটি বিশেষজ্ঞ হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন।
দুই দশকেরও বেশি সময়ের আন্তর্জাতিক কর্মজীবনে তিনি দেখেছেন পৃথিবীর নানা দেশ, নানা সংস্কৃতি; কিন্তু মাটির টান তাঁকে কখনো ভোলাতে পারেনি। প্রতিটি পদক্ষেপে তিনি বাংলাদেশকেই প্রতিনিধিত্ব করেছেন সততা ও মর্যাদার সঙ্গে।
সমাজে ফিরে আসা
জাতিসংঘ থেকে অবসর নেওয়ার পরও তিনি থেমে যাননি। বরং নিজ গ্রামের উন্নয়ন, শিক্ষা বিস্তার ও সমাজসেবামূলক কাজের সঙ্গে যুক্ত রয়েছেন। ১৯৯৫ থেকে ১৯৯৯ সাল পর্যন্ত খাসমহল বালুচর উচ্চ বিদ্যালয়ের সভাপতি হিসেবে তিনি বিদ্যালয়টির মানোন্নয়নে অসাধারণ ভূমিকা রাখেন—বিদ্যালয়টি আজও তাঁর অবদানে গর্বিত।
পারিবারিক জীবন
ব্যক্তিগত জীবনে তিনি দুই পুত্রের জনক। বড় ছেলে অর্থনীতিতে এমএসসি করে বর্তমানে কানাডায় স্থায়ীভাবে বসবাস করছেন। ছোট ছেলে কম্পিউটার সায়েন্সে স্নাতক শেষে এখন অস্ট্রেলিয়ার ইউনিভার্সিটি অব টেকনোলজি সিডনিতে এমএস করছেন। সন্তানদের এই অর্জন তাঁর জীবনের আরেক গর্বের অধ্যায়।
জীবনের পাঠ
খাসমহল বালুচরের সেই সাধারণ কৃষক পরিবারের সন্তান নজরুল ইসলাম আজ অনেকের চোখে অনুপ্রেরণার প্রতীক। তাঁর জীবন আমাদের শেখায়—
“জন্ম নয়, কর্মই মানুষকে বড় করে তোলে।”
যে মানুষ গ্রামের স্কুলে শিক্ষকতা দিয়ে শুরু করেছিলেন, সেই মানুষ একদিন জাতিসংঘের মতো প্রতিষ্ঠানে বাংলাদেশের প্রতিনিধিত্ব করেছেন—এমন গল্প শুধু গর্বের নয়, ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য এক আলোকিত দিশা।
তিনি প্রমাণ করেছেন, স্বপ্ন দেখার সাহস থাকলে গ্রামের মাটির পথ ধরেই পৌঁছানো যায় বিশ্বের দরবারে।