
মুন্সিগঞ্জে অটোরিকশা চালকদের রক্তাক্ত বাস্তবতা
ত্বাইরান আবির
মুন্সিগঞ্জ জেলা দীর্ঘদিন ধরেই অটোরিকশা চালকদের জন্য জীবিকা উপার্জনের অন্যতম ক্ষেত্র। ব্যাটারি-চালিত, সিএনজি-চালিত এবং ইজিবাইকসহ বিভিন্ন ধরনের অটোরিকশা স্থানীয় মানুষের যাতায়াতের পাশাপাশি অসংখ্য পরিবারকে আর্থিকভাবে দায়িত্ববান করেছে। কিন্তু নিরাপত্তার অভাবে দিন দিন অটোরিকশা ছিনতাই, চালক হত্যা ও সম্পদ হাতিয়ে নেওয়ার ঘটনা বেড়ে চলেছে, যা সাধারণ মানুষের মনে ভয় তৈরি করছে এবং পরিবারগুলোকে ভাঙছে।
সাম্প্রতিক এক ঘটনায়, মুন্সিগঞ্জ সদর উপজেলার মেঘনার পাড় রমজানবেগ এলাকায় অটোরিকশা চালক সাকিল খালাসীকে (২৯) পরিকল্পিতভাবে নির্জন স্থানে ডেকে নিয়ে শ্বাসরোধ করে হত্যা করা হয় এবং তার অটোরিকশা ছিনিয়ে নেওয়া হয়। এই ঘটনার মূল অভিযুক্তসহ ৪ জনকে আটক করা হয়েছে পুলিশের অভিযান শেষে। এর আগেই মজিবুর মাঝি (৪৫) নামে আরেক চালককে হত্যার ঘটনায় ৫ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে এবং ওই চালকের অটোরিকশা উদ্ধার করা হয়েছে। এছাড়া ডিএমপি গোয়েন্দা শাখা সম্প্রতি ঢাকা ও মুন্সিগঞ্জে একটি গ্যাংকে গ্রেফতার করেছে, যারা ছিনতাই করার জন্য সিএনজি-চালককে অচেতন করে যানবাহন নিয়ে যেত। অভিযানে ৯ জন সন্দেহভাজনকে আটক করা হয়েছে এবং উদ্ধার হয়েছে প্রায় ১,৯০০ টি সেডেটিভ ট্যাবলেট ও ২টি সিএনজি।
এই ঘটনাগুলো মুন্সিগঞ্জে নিরাপত্তার ক্ষতির মাত্রাই নয়, বরং আইনশৃঙ্খলার ওপর চ্যালেঞ্জও নির্দেশ করছে।
দেশব্যাপী অটোরিকশা-ইজিবাইক চালকদের উপর ছিনতাই ও হত্যার ঘটনায় উল্লেখযোগ্য সংখ্যা দেখা গেছে। পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশনের (পিবিআই) তথ্যে গত এক দশকে শুধু অটোরিকশা ও ইজিবাইক চালকদের খুনের কমপক্ষে ৩০০টিরও বেশি ঘটনা সামনে এসেছে, যেখানে অধিকাংশ মৃত্যু ছিনতাই বা ছিনতাইয়ের চেষ্টার সময় ঘটেছে।এটি শুধু স্থানীয় ঘটনা নয়, ঢাকার আশপাশের অগ্রণী বিভাগগুলোতে বয়স্ক ও দুর্বল চালকদের ছিনতাইকারীরা টার্গেট করছে এবং অনেক ক্ষেত্রেই চালককে মারধর বা হত্যার পর গাড়ি ছিনিয়ে নেয়া হয়েছে।
এখন প্রশ্ন হচ্ছে, কারা কোন কারণে এমন নির্মম পরিণতির শিকার হচ্ছেন? এর জবাবে বিশেষজ্ঞরা বেশকিছু কারণের কথা বলছেন-
অর্থনৈতিক কারণ- সচ্ছল না হওয়া, ঋণ ও জীবিকার তাগিদে অনেকেই অটোরিকশা চালানোর মতো কম মূলধনী পেশায় যুক্ত হচ্ছেন, যার ফলে চালকদের সংখ্যা বৃদ্ধি পেয়েছে।
ছিনতাই চক্রের সক্রিয়তা- কিছু সংগঠিত গ্রুপ ছিনতাই ও গাড়ি হাতিয়ে নেওয়ার উদ্দেশ্য নিয়ে কৌশলীভাবে চালকদের লক্ষ্য করছে, অনেক সময় সেডেটিভ ব্যবহার করে চালককে অচেতন করে ফেলছে।
আইন প্রয়োগ ও নজরদারি- যদিও পুলিশের অভিযান চলছে, ছিনতাই ও হত্যার ঘটনা পুরোপুরি রক্ষণাবেক্ষণ বা প্রতিরোধ করা যাচ্ছে না, যেটি আইনশৃঙ্খলা চ্যালেঞ্জ তৈরি করছে।
এ ধরনের অপরাধের শিকার চালকরা সাধারণত তাদের পরিবারে একমাত্র আয়ের ব্যক্তি হয়ে থাকেন। এ কারণে নির্যাতন বা হত্যার পর পরিবারগুলো আর্থিক ও মানসিক দুশ্চিনতায় পড়ে। অনেক পরিবার এখন ঋণের বোঝা এবং শোকের সঙ্গে সংগ্রাম করছে, বিশেষত যেখানে চালক ছিল পরিবারের মাত্র উপার্জনক্ষম সদস্য।
মুন্সিগঞ্জে ন্যায্য বিচার, দ্রুত তদন্ত ও কঠোর শাস্তির দাবি করে পরিবার/নাগরিক সমাজের পক্ষ থেকে বিভিন্ন অনশন, মানবিক উদ্যোগ এবং নিরাপত্তা বৃদ্ধির জন্য স্থানীয় প্রশাসন ও আইন প্রয়োগকারী সংস্থার প্রতি চাপ সৃষ্টি হয়েছে। সমাজ মনে করছে, অটোরিকশা চালকদের নিরাপত্তা ও সামাজিক মর্যাদা রক্ষার জন্য আরও কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া জরুরী।
মোটের উপর, মুন্সিগঞ্জে অটোরিকশা ছিনতাই ও চালক হত্যা শুধু একক ঘটনা নয়, এটি ব্যাপক সমস্যা ও নিরাপত্তার অভাবের প্রতিফলন, যেখানে নিরাপত্তা ব্যবস্থা, অপরাধ সংস্থা এবং সামাজিক সংহতির মাধ্যমে দ্রুত সমাধান প্রয়োজন।
জয়েন করুন: দৈনিক মুন্সিগঞ্জের বার্তার চ্যানেল