
মাওয়ায় বিএনপির দুই পক্ষের সংঘর্ষ, অস্ত্র প্রদর্শনে থমথমে পরিস্থিতি
মো. স্বপন বেপারী
মুন্সীগঞ্জের লৌহজং উপজেলার মেদিনীমণ্ডল ইউনিয়নে বিএনপির দুই পক্ষের মধ্যে আধিপত্য বিস্তার, ড্রেজার ব্যবসা এবং জমি ও পরিবহন খাত থেকে উত্তোলিত চাঁদার টাকা ভাগাভাগি নিয়ে চরম উত্তেজনার সৃষ্টি হয়েছে। এর জের ধরে উভয় পক্ষের মধ্যে ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়া, হাতাহাতি ও প্রকাশ্যে অস্ত্র প্রদর্শনের ঘটনা ঘটেছে। ঘটনার পর এক পক্ষ বিচারে দাবিতে গভীর রাতে থানায় অবস্থান কর্মসূচি পালন করেছে, অন্যদিকে অপর পক্ষ ড্রেজার অপসারণের দাবি জানিয়ে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার (ইউএনও) কাছে লিখিত আবেদন জানিয়েছে। এ ঘটনায় পুরো এলাকা জুড়ে থমথমে পরিস্থিতি বিরাজ করছে এবং যেকোনো সময় বড় ধরনের রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষের আশঙ্কা করছেন স্থানীয়রা।
স্থানীয় ও পুলিশ সূত্রে জানা যায়, গত বুধবার সন্ধ্যায় মাওয়া এলাকায় অবৈধ ড্রেজার ব্যবসার বিরুদ্ধে স্থানীয় বিএনপি নেতা লুৎফর রহমান পাভেল মোল্লার নেতৃত্বে একটি বিক্ষোভ মিছিলের আয়োজন করা হয়। মিছিলটি শুরুর ঠিক আগে স্থানীয় জেলা বিএনপি নেতা আব্দুস সালাম মোল্লার সমর্থকদের সঙ্গে পাভেল মোল্লার অনুসারীদের বাকবিতণ্ডা হয়। একপর্যায়ে উভয় পক্ষ দেশীয় অস্ত্রে সজ্জিত হয়ে ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়া ও হাতাহাতিতে লিপ্ত হয়।
সংঘর্ষের পর রাত আনুমানিক ১টার দিকে সালাম মোল্লার সমর্থকেরা পদ্মা সেতু উত্তর থানায় গিয়ে অবস্থান কর্মসূচি শুরু করেন। তাদের অভিযোগ, পাভেল মোল্লার মিছিল থেকে প্রকাশ্যে দেশীয় অস্ত্র প্রদর্শন করে আতঙ্ক সৃষ্টি করা হয়েছে। তারা অনতিবিলম্বে এসব অবৈধ অস্ত্র উদ্ধার এবং জড়িতদের গ্রেপ্তারের দাবি জানান।
এদিকে, বৃহস্পতিবার (৩ সেপ্টেম্বর) দক্ষিণ মেদিনীমণ্ডল এলাকার বাসিন্দা মাসুদা বেগম নামের এক নারী লৌহজং উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) বরাবর ড্রেজার অপসারণের দাবিতে লিখিত আবেদন জমা দেন। আবেদনে বলা হয়, এলাকায় অবৈধভাবে ড্রেজারের পাইপ বসানোর কারণে পানি নিষ্কাশনের পথ বন্ধ হয়ে গেছে। ফলে প্রায় ২৫টি পরিবার দীর্ঘদিন ধরে মারাত্মক জলাবদ্ধতায় আটকে দুর্ভোগ পোহাচ্ছে। ড্রেজার সরাতে গেলে সংশ্লিষ্ট চক্রটি এলাকাবাসীকে মারধর ও প্রাণনাশের হুমকি দিচ্ছে বলেও অভিযোগে উল্লেখ করা হয়।
ইউএনও কার্যালয়ে দেওয়া আবেদনকে ‘সাজানো নাটক’ বলে দাবি করেছে সালাম মোল্লা গ্রুপ। তাদের পাল্টা দাবি, গত ৫ আগস্টের পর থেকে পাভেল মোল্লা ও তার অনুসারীরা এলাকায় ব্যাপক চাঁদাবাজিতে জড়িয়ে পড়েন। মৌছামানদ্রা ভুয়া ওয়ারিশ তৈরি করে মেদিনী মন্ডলের খান বাড়ি এলাকার একটি জমি ভূয়া ওয়ারিশ সাজিয়ে বিক্রি করে পাওয়া ১ কোটি ৬০ লাখ টাকা পাভেল মোল্লার মাধ্যমে বাটোয়ারা করা হয়। এ নিয়ে গত শুক্রবার স্থানীয় সালিশ বৈঠকে টাকার সুনির্দিষ্ট হিসাব চাওয়া হলে পাভেল মোল্লা কোনো জবাব না দিয়ে উঠে যান। ওই বিশাল অঙ্কের টাকার হিসাব এড়াতেই ড্রেজার ব্যবসাকে অজুহাত বানিয়ে বিশৃঙ্খলা তৈরি করা হচ্ছে।
এ বিষয়ে স্থানীয় ভূমির মালিক তারা মাতবর জানান, কারো জায়গায় ড্রেজারের পানি ফেলা হয়নি। মাওয়া এক্সপ্রেসওয়ের নিচের একটি কালভার্ট রেস্টুরেন্ট দখল করে রাখায় মেদিনীমণ্ডলে স্থায়ী জলাবদ্ধতা তৈরি হয়েছে। মূলত ১ কোটি ৬০ লাখ টাকার চাঁদাবাজির প্রশ্ন থেকে মুখ লুকাতেই ড্রেজারকে হাতিয়ার বানানো হচ্ছে।
অভিযোগ অস্বীকার করে উপজেলা যুবদলের সদস্য সচিব পাভেল মোল্লা জানান, আমার বিরুদ্ধে চাঁদাবাজির অভিযোগ সম্পূর্ণ কাল্পনিক ও ভিত্তিহীন। মূল ড্রেজার ব্যবসা ও নিজেদের চাঁদাবাজি ধামাচাপা দিতেই সালাম মোল্লার লোকজন আমার বিরুদ্ধে মিথ্যা অভিযোগ আনছে।
অন্যদিকে, জেলা বিএনপির আহ্বায়ক কমিটির সদস্য ও সাবেক সদস্য সচিব আব্দুস সালাম মোল্লা বলেন, ঘটনার সময় আমি বাড়িতে ছিলাম। তবে শুনেছি সামান্য হাতাহাতি হয়েছে। পাভেল মোল্লা প্রকাশ্যে অস্ত্র প্রদর্শন করেছেন। আমি কোনো অবৈধ বালু বা চাঁদাবাজির সঙ্গে জড়িত নই; আমার রাজনৈতিক সুনাম ক্ষুণ্ন করতেই প্রতিপক্ষরা অপপ্রচার চালাচ্ছে।
পদ্মা সেতু উত্তর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আখতার হোসেন জানান, ঘটনায় লিখিত অভিযোগ পাওয়া গেছে। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে টহল জোরদার করা হয়েছে। অস্ত্র প্রদর্শনের বিষয়টি খতিয়ে দেখে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
লৌহজং উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) ফারজানা ববি মিতু জানান, জলাবদ্ধতা ও ড্রেজারের বিষয়টি তদন্ত করতে মেদিনীমণ্ডল ইউনিয়ন ভূমি সহকারী কর্মকর্তাকে (নায়েব) নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। তদন্ত প্রতিবেদন পাওয়ার পর প্রয়োজনীয় আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে।