
আমরা এক অদ্ভুত সময়ে দাঁড়িয়ে আছি, যেখানে তথাকথিত উন্নয়নের মহাসড়কে কেবল গতি নয়, ঝরে পড়া লাশের সংখ্যাও সমান তালে বাড়ছে। সরকারি বিভিন্ন ব্যবস্থাপনায় গেঁথে থাকা মারাত্মক দুর্নীতি ও প্রশাসনের চরম উদাসীনতা আমাদের অবকাঠামোকে ‘মরণফাঁদ’ এ পরিণত করেছে। আর এই ফাঁদগুলোতে প্রতিদিন প্রাণ হারাচ্ছে অগণিত মানুষ, যাদের মৃত্যু কোনো দুর্ঘটনা নয়, বরং কাঠামোগত দুর্নীতির ফলস্বরূপ এক নির্বাক গণহত্যা।
সংবাদপত্রের প্রতিটি পাতায় এই বিপর্যয়ের কাহিনি ছড়ানো। কিন্তু এই রক্তক্ষয়ী ঘটনাপ্রবাহ দেখেও প্রশাসন ও রাজনীতিবিদদের ঘুম ভাঙে? না। অনুশোচনার সামান্যতম ঝলকও তাদের মাঝে দেখা যায় না। আমাদের আবেগ যেখানে পাহাড় সমান, সেখানে তাদের দায়িত্বের জায়গায় কেবলই শূন্যতা।
এই বিপর্যয়ের চিত্র তুলে ধরতে কয়েকটি ভয়াবহ উদাহরণই যথেষ্ট, যা প্রমাণ করে আমাদের জীবন কত তুচ্ছ হয়ে গেছে।
রানা প্লাজা ট্র্যাজেডি (২০১৩)- এটি ছিল অবকাঠামোগত দুর্নীতির সবচেয়ে বড় প্রতীক, যেখানে ১,১৩৬ জনেরও বেশি শ্রমিকের প্রাণ যায় এবং প্রায় দুই হাজার মানুষ আহত হন। জানা যায়, জলাশয়ের ওপর অনুমোদনহীনভাবে ও নিম্নমানের সামগ্রী দিয়ে ভবন নির্মাণ করা হয়েছিল। এত বছর পরেও এই হত্যা মামলার বিচার শেষ হয়নি। এটা প্রমাণ করে অপরাধীদের দায়মুক্তির সংস্কৃতি কত শক্তিশালী।
সড়কে নীরব গণহত্যা- ‘বাংলাদেশ যাত্রী কল্যাণ সমিতি’র তথ্যমতে, বিগত এক যুগে দেশে লক্ষাধিকের বেশি মানুষ সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত হয়েছেন। এটি ইসরায়েল-ফিলিস্তিন বা ইউক্রেন-রাশিয়া যুদ্ধে নিহতদের মোট সংখ্যার চেয়েও কয়েকগুণ বেশি। প্রতি বছর এই দুর্ঘটনায় দেশের জিডিপির ১.৫% থেকে ২% পর্যন্ত আর্থিক ক্ষতি হয় (যা বছরে প্রায় ৪০ হাজার কোটি টাকারও বেশি)। অদক্ষ চালকের হাতে লাইসেন্স, ত্রুটিপূর্ণ যানবাহনকে ‘ঘুষের বিনিময়ে’ ফিটনেস দেওয়া এবং ওভারলোডেড ট্রাকের অবাধ চলাচল এই মৃত্যুর মিছিলকে দীর্ঘায়িত করছে। অনেক সময় দেখা যায়, দুর্ঘটনার পর সরকারি ক্ষতিপূরণ প্রদানের বিধান থাকলেও ৯৯ শতাংশের বেশি ভুক্তভোগী পরিবার এই সহায়তা থেকে বঞ্চিত হন। কারণ প্রক্রিয়াটি জটিল ও প্রচারের অভাব রয়েছে।
গ্যাস বিস্ফোরণে মৃত্যু- নারায়ণগঞ্জের মসজিদে গ্যাস বিস্ফোরণে একসঙ্গে বহু মানুষের প্রাণহানি ঘটে। এর মূল কারণ ছিল গ্যাস লাইনের পুরোনো ত্রুটি ও তদারকি সংস্থার চরম গাফিলতি। এটি প্রমাণ করে শুধু বড় প্রকল্প নয়, সাধারণ নাগরিক সেবার ক্ষেত্রেও দুর্নীতি ও অব্যবস্থা জীবনের জন্য হুমকি।
নির্মাণাধীন ভবনের ধস- রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের মতো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানেও নির্মাণাধীন ভবনের ছাদ ধসে পড়ার ঘটনা ঘটে, যেখানে ঠিকাদারের নিম্নমানের কাজ ও বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের তদারকির অভাবকে দায়ী করা হয়। বালিশ-কাণ্ডের মতো দুর্নীতির সাথে জড়িত ঠিকাদাররাই বারবার কাজ পাচ্ছে, যার ফলে মানুষের নিরাপত্তা ভূলুণ্ঠিত হচ্ছে।
মেট্রোরেলের রাবার প্যাড দুর্ঘটনা- সবশেষে সাম্প্রতিক সময়ে মেট্রোরেলের রাবার প্যাড খুলে পড়ে মাথায় আঘাত পেয়ে ঘটনাস্থলেই মৃত্যুবরণ করেন এক পথচারী। এটাও দুর্নীতির চরম বাজে উদাহরণ।
দায়মুক্তির বিষাক্ত সংস্কৃতি- কেন তারা অনুতপ্ত হয় না?
এত ভয়াবহতার পরও কেন প্রশাসন ও রাজনীতিবিদরা নির্বিকার? এর মূল কারণ নিহিত আছে সেই ‘দায়মুক্তির সংস্কৃতি’র মধ্যে, যা বছরের পর বছর ধরে তাদের সুরক্ষা দিয়েছে।
দুর্নীতিই যেখানে নিয়ামক শক্তি- অবকাঠামো উন্নয়নে যেখানে হাজার হাজার কোটি টাকা বাজেট থাকে, সেখানে ক্ষমতাসীনদের ছত্রছায়ায় থাকা মাফিয়াতন্ত্রই ঠিকাদারি নিয়ন্ত্রণ করে। তাদের কাছে কাজের গুণগত মান নয়, চুরি ও লুটপাট প্রধান উদ্দেশ্য। তাদের অপরাধের জন্য শাস্তি হয় না, বরং তারা আরও শক্তিশালী হয়।
জবাবদিহিতার নাটক- প্রতিটি দুর্ঘটনার পর দায়সারা গোছের তদন্ত কমিটি গঠিত হয়। এই তদন্ত প্রতিবেদন আলোর মুখ দেখে না, আর দেখলেও তা লোকচক্ষুর আড়ালে চলে যায়। রানা প্লাজার মতো সুস্পষ্ট হত্যা মামলার বিচারও বছরের পর বছর ঝুলে থাকে। এটা স্পষ্ট বার্তা দেয় ক্ষমতাবানদের জন্য আইন শিথিল।
হৃদয়হীনতার রাজনীতি- যখন একটি পরিবার তাদের উপার্জনক্ষম সদস্যকে হারিয়ে সর্বস্বান্ত হয়, তখন নীতিনির্ধারকদের ভাবলেশহীন প্রতিক্রিয়া দেখায় যে, তারা সাধারণ মানুষের জীবনকে কেবল ভোটের বা স্রেফ একটি পরিসংখ্যান হিসেবে বিবেচনা করেন। একজন সংসদ সদস্য যখন দুর্ঘটনায় নিহতদের জন্য ১০ কোটি টাকা ক্ষতিপূরণের দাবি তোলেন, তখন সেই আবেগের চেয়েও প্রশ্ন জাগে- কেন আগে থেকে নিরাপত্তা নিশ্চিত করা হলো না?
সমস্যার মূলে আঘাত- টেকসই সমাধানের পথ
এই মানবিক বিপর্যয় থেকে বেরিয়ে আসার একমাত্র পথ দীর্ঘমেয়াদী ও কঠোর পদক্ষেপ গ্রহণ।
কঠোর আইন প্রয়োগ ও শাস্তি- আইনকে অবশ্যই ক্ষমতাবানদের জন্য নিরপেক্ষ হতে হবে। নির্মাণ কাজ ও পরিবহন খাতের দুর্নীতির সাথে জড়িত উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা, ঠিকাদার ও রাজনৈতিক প্রভাবশালীদের দ্রুত বিচার এবং দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে।
সম্পূর্ণ ডিজিটাল স্বচ্ছতা- সকল সরকারি প্রকল্পকে ই-টেন্ডারিং, ডিজিটাল মনিটরিং ও থার্ড পার্টি অডিটরের মাধ্যমে সম্পূর্ণ স্বচ্ছতার আওতায় আনতে হবে। নিম্নমানের কাজ দেখলেই দ্রুত বিল বাতিল ও ঠিকাদারকে কালো তালিকাভুক্ত করার ব্যবস্থা রাখতে হবে।
সমন্বিত পরিবহন নেটওয়ার্কের পুনর্গঠন- শুধু সড়ক নয়, নৌ ও রেলপথের আধুনিকায়ন ও সম্প্রসারণে জোর দিতে হবে। দুর্বল ও দুর্নীতিগ্রস্ত সংস্থাগুলোকে সংস্কার করে জনগণের জন্য নিরাপদ, সাশ্রয়ী ও সমন্বিত গণপরিবহন ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে।
নাগরিক নজরদারিকে গুরুত্ব দেওয়া- টিআইবি’র মতো সংস্থাগুলোর পরামর্শ অনুযায়ী, স্থানীয় জনগণকে অবকাঠামো প্রকল্পের মনিটরিংয়ে যুক্ত করতে হবে। একটি গণ-শুনানি ও জবাবদিহিতার সংস্কৃতি গড়ে তোলা ছাড়া সুশাসন প্রতিষ্ঠা অসম্ভব।
যতদিন না পর্যন্ত এই দেশের নীতি নির্ধারকদের কাছে ‘একটি জীবনের মূল্য’ কয়েক কোটি টাকার দুর্নীতির চেয়ে বেশি হবে, ততদিন এই লাশ গোনার মিছিল চলতেই থাকবে। এই রক্তে ভেজা অবকাঠামো হয়তো আমাদের উন্নয়নের গল্প বলবে, কিন্তু সেই গল্পের প্রতিটি ছত্রে লেখা থাকবে এক গভীর, ব্যর্থ অনুশোচনার প্রতীক্ষা।
লেখক- ত্বাইরান আবির
লেখক, অনুবাদক, সম্পাদক